আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল): প্রকৃতির এক অনন্য সৃষ্টি ফুল। রং, রূপ আর সৌন্দর্যের ভিন্নতায় প্রতিটি ফুলের রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য। কোনো ফুল তার উজ্জ্বল রঙে, কোনোটি সুবাসে, আবার কোনোটি সরল সৌন্দর্যে মানুষের মন জয় করে। তেমনই একটি পরিচিত ও আকর্ষণীয় ফুল নয়নতারা। সাদা ও গোলাপি- দুই রঙের ফুলেই রয়েছে আলাদা মাধুর্য। সবুজ পাতার মাঝে ফুটে থাকা পাঁচ পাপড়ির এই ফুল দেখতে যেমন সুন্দর, তেমনি উদ্ভিদবিজ্ঞানের দিক থেকেও বেশ গুরুত্বপূর্ণ।
মৌলভীবাজার শহরের ফরেস্ট অফিস রোডের বাসিন্দা কল্লোল দেবের ছাদবাগানে দেখা মিলেছে নয়নতারার সাদা ও গোলাপি রঙের ফুলের। সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা সাদা ফুলগুলো যেন শুভ্রতার প্রতীক। অন্যদিকে গোলাপি ফুলগুলোতে রয়েছে ভিন্ন এক আকর্ষণ। ফুলের মাঝখানে গাঢ় রঙের আভা এবং পাঁচটি পাপড়ির বিন্যাস গাছটিকে দিয়েছে বিশেষ সৌন্দর্য। বৃষ্টির পানির ছোট ছোট ফোঁটা পাপড়িতে জমে থাকলে ফুলের সৌন্দর্য আরও বেড়ে যায়।
নয়নতারা একটি বহুবর্ষজীবী গুল্মজাতীয় উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Catharanthus roseus। এটি অ্যাপোসাইনেসি (Apocynaceae) পরিবারের উদ্ভিদ। ইংরেজিতে একে ম্যাডাগাস্কার পেরিউইঙ্কল (Madagascar Periwinkle) বা রোজি পেরিউইঙ্কল বলা হয়। উদ্ভিদটির আদি নিবাস আফ্রিকার মাদাগাস্কার দ্বীপে। সেখান থেকে পৃথিবীর বিভিন্ন উষ্ণ ও উপক্রান্তীয় অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের অনেক দেশে এটি শোভাবর্ধক ফুলগাছ হিসেবে পরিচিত।
নয়নতারা গাছ সাধারণত ৩০ সেন্টিমিটার থেকে এক মিটার পর্যন্ত উঁচু হতে পারে। এর কাণ্ড নরম এবং শাখা-প্রশাখা বিস্তৃত। পাতাগুলো ডিম্বাকৃতির, চকচকে সবুজ এবং মাঝখানে স্পষ্ট সাদা বা হালকা রঙের শিরা দেখা যায়। ফুলে সাধারণত পাঁচটি পাপড়ি থাকে। সাদা, গোলাপি, গাঢ় গোলাপি ও লালচে বর্ণের বিভিন্ন জাতের নয়নতারা দেখা যায়। ফুলের মাঝখানে অনেক সময় গাঢ় গোলাপি বা লালচে রঙের চোখের মতো একটি অংশ থাকে। এ বৈশিষ্ট্য থেকেই ফুলটির বাংলা নাম নয়নতারা হয়েছে বলে ধারণা করা হয়।
নয়নতারার সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো দীর্ঘ সময় ধরে ফুল ফোটানোর ক্ষমতা। অনুকূল পরিবেশে বছরের অধিকাংশ সময়ই গাছে ফুল দেখা যায়। বিশেষ করে উষ্ণ আবহাওয়ায় গাছটি ভালো বেড়ে ওঠে। এ কারণে বাড়ির আঙিনা, বাগান, পার্ক, রাস্তার পাশ এবং ছাদবাগানে নয়নতারা বেশ জনপ্রিয়।
নয়নতারা চাষ করাও তুলনামূলক সহজ। বীজ ও কাণ্ডের কাটিং- দুই পদ্ধতিতেই এর বংশবিস্তার করা যায়। পর্যাপ্ত সূর্যালোক পেলে গাছে বেশি ফুল ফোটে। তবে আংশিক ছায়াতেও গাছটি বেঁচে থাকতে পারে। পানি নিষ্কাশনের সুবিধাযুক্ত ঝুরঝুরে মাটি এ ফুলগাছের জন্য উপযোগী। টবে চাষের ক্ষেত্রে অতিরিক্ত পানি জমতে দেওয়া যাবে না। নিয়মিত পরিমিত পানি দেওয়া, প্রয়োজনমতো জৈব সার প্রয়োগ এবং শুকনো ডালপালা পরিষ্কার রাখলে গাছ সতেজ থাকে।
নয়নতারা শুধু সৌন্দর্যের জন্যই গুরুত্বপূর্ণ নয়, আধুনিক চিকিৎসাবিজ্ঞানের গবেষণায়ও উদ্ভিদটির বিশেষ ভূমিকা রয়েছে। এ গাছের বিভিন্ন অংশে ভিনক্রিস্টিন (Vincristine) ও ভিনব্লাস্টিন (Vinblastine) নামের গুরুত্বপূর্ণ অ্যালকালয়েড পাওয়া যায়। এসব উপাদান থেকে তৈরি ওষুধ নির্দিষ্ট ধরনের ক্যানসার, বিশেষ করে লিউকেমিয়া ও লিম্ফোমার চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়। উদ্ভিদবিজ্ঞান ও ওষুধশিল্পে নয়নতারার গুরুত্ব এখানেই।
তবে একটি বিষয় মনে রাখা জরুরি, নয়নতারা গাছের সব অংশেই বিষাক্ত উপাদান রয়েছে। তাই প্রচলিত ভেষজ চিকিৎসার নামে গাছের পাতা, ফুল বা অন্য কোনো অংশ সরাসরি খাওয়া কিংবা ব্যবহার করা বিপজ্জনক। চিকিৎসায় ব্যবহৃত উপাদান বিশেষ প্রক্রিয়ায় পৃথক করে নিয়ন্ত্রিতভাবে ওষুধ তৈরি করা হয়। চিকিৎসকের পরামর্শ ছাড়া এর কোনো অংশ ব্যবহার করা উচিত নয়।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে বড় কোনো বাগানের প্রয়োজন নেই। একটু যত্ন, ভালোবাসা আর পরিকল্পনা থাকলে বাড়ির ছাদেই গড়ে তোলা যায় ফুলের ছোট্ট এক পৃথিবী। কল্লোল দেবের ছাদবাগানের সাদা ও গোলাপি নয়নতারা যেন সেই কথাই মনে করিয়ে দেয়। সবুজের মাঝে রঙিন ফুলের এই আয়োজন শুধু বাড়ির সৌন্দর্য বাড়ায় না, মানুষের মনেও তৈরি করে প্রশান্তি।

