আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): শুধু দাপ্তরিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নন, শিক্ষা, খেলাধুলা, সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডসহ উপজেলার সার্বিক উন্নয়নেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখে চলেছেন শ্রীমঙ্গল উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. জিয়াউর রহমান।
প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের বই পড়ায় আগ্রহী করে তোলা, শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করা, তরুণদের মাদক থেকে দূরে রাখা এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগের মাধ্যমে তাঁদের সমস্যা ও প্রত্যাশার কথা শোনার চেষ্টা করছেন তিনি।
তাঁর এসব উদ্যোগের মধ্যে বিশেষভাবে আলোচনায় এসেছে প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে বই পড়ার উৎসব আয়োজন, চা-বাগানের শিশুদের ফুটবল খেলার জন্য জার্সি ও ফুটবল উপহার এবং গভীর রাতে বাইরে থাকা শিক্ষার্থীদের প্রতি মানবিক আচরণ। এসব কর্মকাণ্ডের মধ্য দিয়ে একজন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি মানুষের পাশে দাঁড়ানোর আগ্রহও প্রকাশ পাচ্ছে।
২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে নিয়ে বই পড়ার উৎসব, শ্রীমঙ্গলে সৃষ্টি হয় আলোড়ন
শিক্ষার্থীদের পাঠ্যবইয়ের বাইরের জগৎ সম্পর্কে জানার সুযোগ তৈরি এবং বই পড়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে শ্রীমঙ্গলে ব্যতিক্রমী বই পড়ার উৎসবের আয়োজন করেন ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান। উপজেলার ২৮টি মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রায় ২৫ হাজার শিক্ষার্থীকে এ উদ্যোগের আওতায় আনা হয়।
গত ২১ জুলাই শুরু হওয়া এ উৎসবকে ঘিরে শিক্ষার্থীদের মধ্যে ব্যাপক আগ্রহ তৈরি হয়। উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে প্রতিটি বিদ্যালয়ে বই সরবরাহ করা হয়। শুধু বই বিতরণ করেই দায়িত্ব শেষ করেননি ইউএনও। তিনি নিজে বিভিন্ন বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে কথা বলেন, তাঁদের বই পড়তে উৎসাহিত করেন এবং নিয়মিত পড়াশোনার পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনের জন্য বইয়ের সঙ্গে বন্ধুত্ব গড়ে তোলার পরামর্শ দেন।
প্রায় দুই মাস ধরে তিনটি পর্যায়ে এ কার্যক্রম পরিচালিত হয়। পরে ১৯ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত হয় উৎসবের চূড়ান্ত মূল্যায়ন পরীক্ষা। এর ফলাফলের ভিত্তিতে ১০ অক্টোবর পুরস্কার বিতরণ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন জাতীয় সংসদ সদস্য মুজিবুর রহমান চৌধুরী। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন জেলা প্রশাসক তৌহিদুজ্জামান পাভেল। বিজয়ী শিক্ষার্থীদের হাতে ল্যাপটপসহ বিভিন্ন পুরস্কার তুলে দেওয়া হয়।
এত বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থীকে সম্পৃক্ত করে বই পড়ার এমন আয়োজন শ্রীমঙ্গলে ব্যাপক সাড়া ফেলে। শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়ার আগ্রহ সৃষ্টি এবং বিদ্যালয়কেন্দ্রিক ইতিবাচক পরিবেশ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে উদ্যোগটি বিশেষ গুরুত্ব পায়।
শিক্ষার্থীদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাড়তি ভাবনা
শিক্ষার মানোন্নয়ন, বিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি নিশ্চিত করা এবং পড়াশোনার প্রতি তাঁদের মনোযোগ বাড়ানোর বিষয়েও গুরুত্ব দিচ্ছেন ইউএনও জিয়াউর রহমান। তাঁর ভাবনায় রয়েছে, শিক্ষার্থীদের শুধু পরীক্ষায় ভালো ফল করলেই হবে না; তাঁদের জ্ঞান, মূল্যবোধ ও সৃজনশীলতারও বিকাশ ঘটাতে হবে।
বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মকে মাদক থেকে দূরে রেখে পড়াশোনা, খেলাধুলা ও সুস্থ সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করার জন্য তিনি বিভিন্ন উদ্যোগ নিচ্ছেন। তাঁর মতে, শিশু-কিশোরদের সুন্দর ভবিষ্যৎ গড়তে পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, সমাজ ও প্রশাসনকে সম্মিলিতভাবে কাজ করতে হবে।
গভীর রাতে পরিচ্ছন্নতা পরিদর্শন, শিক্ষার্থীদের দিলেন ভালো পরামর্শ
প্রশাসনিক দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গল পৌর এলাকার পরিচ্ছন্নতা পরিস্থিতি দেখতেও গভীর রাতে মাঠে নেমেছিলেন পৌর প্রশাসক ও ইউএনও জিয়াউর রহমান। প্রায় এক মাস আগে রাত ১১টার দিকে কয়েকজন উপজেলা পর্যায়ের সরকারি কর্মকর্তাকে সঙ্গে নিয়ে তিনি শহরের বিভিন্ন এলাকা পরিদর্শন করেন।
পরিদর্শনের একপর্যায়ে ভিক্টোরিয়া স্কুল মাঠে কয়েকজন শিক্ষার্থীকে বসে আড্ডা দিতে দেখেন তাঁরা। গভীর রাতে সেখানে অবস্থানের কারণ জানতে চাইলে শিক্ষার্থীরা কোনো স্পষ্ট উত্তর দিতে পারেনি।
এ অবস্থায় তিনি তাদের বিরুদ্ধে কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা না নিয়ে বরং আন্তরিকভাবে বুঝিয়ে বলেন। গভীর রাতে বাইরে না থেকে বাড়ি ফিরে যেতে এবং পড়াশোনায় মনোযোগী হতে পরামর্শ দেন। পরে শিক্ষার্থীরা বাড়ির উদ্দেশে রওনা হয়।
একজন প্রশাসকের দায়িত্ব শুধু নিয়ম প্রয়োগের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়, তরুণদের ভুল থেকে ফিরিয়ে এনে সঠিক পথে চলতে উৎসাহিত করাও যে গুরুত্বপূর্ণ—এ ঘটনাটি তারই একটি দৃষ্টান্ত।
চা-বাগানের শিশুদের হাতে জার্সি, মাঠ সংস্কারের আশ্বাস
শিশু-কিশোরদের খেলাধুলায় উৎসাহিত করার উদ্যোগের অংশ হিসেবে ৮ নভেম্বর বিকেল ৪টার দিকে সাতগাঁও চা-বাগানের লছনা মাঠে যান ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান। এ সময় তাঁর সঙ্গে ছিলেন পৌরসভার নির্বাহী প্রকৌশলী জহিরুল ইসলাম, উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা প্লাবন পাল এবং যুব উন্নয়ন কর্মকর্তা অনীম কুমার কর।
সেখানে ছেলে ও মেয়ে উভয় দলের মোট ৬০ জন খুদে ফুটবল খেলোয়াড়ের মধ্যে ৬০ সেট জার্সি বিতরণ করেন তিনি। এর প্রায় দেড় মাস আগেও একই মাঠে শিশুদের ফুটবল খেলার জন্য আটটি ফুটবল উপহার দিয়েছিলেন ইউএনও।
শুধু ক্রীড়াসামগ্রী বিতরণ নয়, শিশুদের নিয়মিত খেলাধুলার সুযোগ তৈরি করতেও উদ্যোগী হয়েছেন তিনি। এ জন্য লছনা মাঠটি ফুটবল খেলার উপযোগী করে সংস্কারের আশ্বাস দেন।
সাতগাঁওয়ের ফুটবলপ্রেমী খলিলুর রহমান চঞ্চল জানান, এ মাঠে প্রতিদিন ৪৬ জন মেয়ে শিশু ফুটবল খেলে। চা-বাগানের শিশুদের মধ্যে মেয়েদের এমন নিয়মিত ফুটবল খেলার বিষয়টি নিঃসন্দেহে উৎসাহব্যঞ্জক। তাদের খেলাধুলার প্রতি আগ্রহ ধরে রাখতে প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা গেলে এদের মধ্য থেকেই ভবিষ্যতে ভালো খেলোয়াড় তৈরি হতে পারে।
চা-বাগানের শিশুদের হাতে জার্সি তুলে দেওয়া এবং মাঠ সংস্কারের আশ্বাসের মধ্য দিয়ে খেলাধুলার সুযোগ সবার জন্য উন্মুক্ত করার একটি ইতিবাচক বার্তা দিয়েছেন ইউএনও।
প্রশাসনের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের কাছে
উপজেলার বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষের সঙ্গে যোগাযোগ রাখা এবং তাঁদের কথা শোনার বিষয়টিও গুরুত্ব দেন ইউএনও জিয়াউর রহমান। প্রশাসনের সঙ্গে সাধারণ মানুষের দূরত্ব কমিয়ে উন্নয়ন কর্মকাণ্ডে জনসম্পৃক্ততা বাড়ানোর চেষ্টা করছেন তিনি।
শিক্ষা, খেলাধুলা, সামাজিক সচেতনতা, সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড কিংবা পরিচ্ছন্নতা—বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাঁর এসব উদ্যোগের মূল লক্ষ্য শ্রীমঙ্গলের মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নত করা। তিনি মনে করেন, একটি উপজেলার উন্নয়ন শুধু অবকাঠামো নির্মাণের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; মানুষের চিন্তা, মনন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জীবনবোধের উন্নয়নও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ।
স্বপ্ন একটি সুন্দর, শিক্ষিত ও মানবিক শ্রীমঙ্গল
একটি বই একজন শিক্ষার্থীর চিন্তার জগৎ বদলে দিতে পারে। একটি ফুটবল শিশুর মধ্যে শৃঙ্খলা, দলগত চেতনা ও আত্মবিশ্বাস তৈরি করতে পারে। আবার একজন প্রশাসকের আন্তরিক পরামর্শ একজন কিশোরকে ভুল পথ থেকে ফিরিয়ে আনতে পারে। শ্রীমঙ্গলে ইউএনও মো. জিয়াউর রহমানের বিভিন্ন উদ্যোগে এসব বিষয়ই যেন একসূত্রে গাঁথা।
প্রশাসনিক দায়িত্বের পাশাপাশি শিক্ষা, খেলাধুলা ও মানবিক উদ্যোগে তাঁর সক্রিয় অংশগ্রহণ শ্রীমঙ্গলে নতুন আশার সঞ্চার করছে। এসব উদ্যোগ ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হলে শিক্ষার্থী ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে—এমন প্রত্যাশা স্থানীয় মানুষের।
একজন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কাজ কেবল দাপ্তরিক ফাইল, সভা কিংবা সরকারি নির্দেশনা বাস্তবায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। মানুষের প্রয়োজন বোঝা, নতুন সম্ভাবনা তৈরি করা এবং আগামী প্রজন্মের জন্য সুন্দর পরিবেশ গড়ে তোলাও তাঁর দায়িত্বের অংশ। বই, ফুটবল ও মানবিক উদ্যোগের মধ্য দিয়ে শ্রীমঙ্গলে সেই দায়িত্ব পালনেরই একটি পরিচয় তুলে ধরছেন ইউএনও মো. জিয়াউর রহমান।

