মৃত্যুবার্ষিকীতে বিচারের দাবিতে কান্নায় ভেঙে পড়লেন শোকার্ত বাবা
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): “আমার ছেলে তো আর ফিরে আসবে না, কিন্তু তার হত্যাকারীদের বিচার হলে অন্তত বুকের ভেতরের কষ্টটা কিছুটা হলেও কমবে।” তিন বছর ধরে সন্তানের হত্যার বিচারের আশায় মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরে বেড়ানো এক হতভাগ্য পিতার কণ্ঠে আজও ঝরে পড়ছে এই আকুতি।
গত ৩১ অক্টোবর শনিবার ছিল রেফায়েত উল্লাহর তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী। দেখতে দেখতে তিনটি বছর পার হয়ে গেলেও আজও সন্তানের হত্যার বিচার পাননি তাঁর বাবা। ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন বিএনপির অবরোধ কর্মসূচি চলাকালে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ছাত্রদল নেতা রেফায়েত উল্লাহ ও কৃষক দল নেতা বিল্লাল হোসেন।
তাঁদের তৃতীয় মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষে গত ৩১ অক্টোবর শনিবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার ছয়সূতী ইউনিয়নের বড় ছয়সূতী গ্রামের কবরস্থানে স্থানীয় বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের যৌথ উদ্যোগে শহীদদের কবর জিয়ারত ও আত্মার মাগফিরাত কামনায় বিশেষ মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয়।
এতে উপস্থিত ছিলেন কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি মো. ছিদ্দিক মিয়া, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট মুহাম্মদ শাহ আলম, ছয়সূতী ইউনিয়ন বিএনপির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মো. মিজানুর রহমান মিজান, উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক আজাহার উদ্দিন লিটন, উপজেলা শ্রমিক দলের সাধারণ সম্পাদক তৌহিদুল ইসলাম বিপ্লব, ছয়সূতী ইউনিয়ন ছাত্রদলের সভাপতি মশিউর রহমান সজীব ও সাধারণ সম্পাদক মো. রবিন মিয়াসহ বিএনপি ও অঙ্গসংগঠনের নেতাকর্মী এবং স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিরা। কবর জিয়ারত শেষে বিশেষ মোনাজাত পরিচালনা করেন বড় ছয়সূতীর আরব আলী খান ফুরকানিয়া ও হাফিজিয়া মাদ্রাসার অধ্যক্ষ মাওলানা মাহমুদ হাসান।
কবর জিয়ারতের আগে শহীদ রেফায়েত উল্লাহর বাবা মো. কাউসার মিয়া এবং দলীয় নেতৃবৃন্দ দ্রুত বিচার দাবি করেন। রেফায়েত উল্লাহর বাবা জানান, ছেলেকে হারানোর পর তাঁর মরদেহ দাফন করতেও চরম দুর্ভোগের মুখে পড়তে হয়েছিল পরিবারকে। সে সময় পরিবার ও স্বজনদের ওপর দিয়ে বয়ে যাওয়া সেই ঝড়ের স্মৃতি এখনো তাঁদের তাড়িয়ে বেড়ায়। এমনকি পুলিশি বাধার কারণে আত্মীয়স্বজন ও বিএনপির নেতাকর্মীদের স্বাভাবিক চলাফেরাও কঠিন হয়ে পড়েছিল।
দলীয় নেতাকর্মীরা জানান, ২০২৩ সালের ৩১ অক্টোবর তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের পদত্যাগের দাবিতে বিএনপির কেন্দ্রীয় কর্মসূচির অংশ হিসেবে ছয়সূতী বাসস্ট্যান্ডে অবরোধ কর্মসূচি পালনকালে পুলিশ নেতাকর্মীদের ওপর গুলি চালায়। এ ঘটনায় তৎকালীন কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) গোলাম মোস্তফার ভূমিকা নিয়েও গুরুতর অভিযোগ তোলেন নিহতদের পরিবার ও স্থানীয় বিএনপি নেতৃবৃন্দ।
সম্প্রতি এই হত্যাকাণ্ডকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন মহলে অর্থ লেনদেন ও স্বার্থ হাসিলের গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এমনকি শোকাহত পরিবারটির বিরুদ্ধেও আওয়ামী লীগের লোকজনের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অসত্য অভিযোগ তোলা হচ্ছে বলে দাবি করেছে নিহতের পরিবার।
এ প্রসঙ্গে ক্ষোভ প্রকাশ করে শোকার্ত বাবা মো. কাউসার মিয়া বলেন, একজন বাবা কি এতটাই লোভী হতে পারে যে নিজের সন্তানের লাশের বিনিময়ে টাকা নেবে? আমি স্পষ্ট করে বলতে চাই, আমার সন্তানের হত্যাকাণ্ড নিয়ে যদি কেউ কোনো ধরনের অর্থ লেনদেন করে থাকে, তবে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য বের করা হোক।
বর্তমানে রাষ্ট্রক্ষমতায় বিএনপি। নিহত রেফায়েত উল্লাহ ছিলেন ছাত্রদলের একজন সক্রিয় কর্মী। অথচ তিন বছর পেরিয়ে গেলেও বিচার না পাওয়ায় প্রশ্ন তুলেছে তাঁর পরিবার। পরিবারের আক্ষেপ, কেন আজও আমাদের মানুষের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হচ্ছে? আমার ছেলের হত্যার বিচার কি আমি জীবিত থাকতেও দেখে যেতে পারব না?
ছেলের শোকে অসুস্থ ও শয্যাশায়ী মায়ের বুকফাটা আর্তনাদ আর একজন পিতার নিঃসঙ্গ লড়াই যেন থামছেই না। এ পরিস্থিতিতে বস্ত্র ও পাট প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপির কাছে আকুল আবেদন জানিয়ে কাউসার মিয়া বলেন, “দয়া করে আমার সন্তানের হত্যার বিষয়টি গুরুত্ব দিয়ে দেখুন। সুষ্ঠু তদন্ত করে দোষীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার ব্যবস্থা করুন। আমি একজন অসহায় বাবা হিসেবে আপনার কাছে ন্যায়বিচার চাই।”
শহীদ রেফায়েত উল্লাহ ও বিল্লাল হোসেনের আত্মার মাগফিরাত কামনা এবং শোকসন্তপ্ত পরিবারগুলোর প্রতি সমবেদনা জানিয়ে এই হত্যাকাণ্ডের দ্রুত ও সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী ও দলীয় নেতাকর্মীরা।

