সর্বশেষ :
2 Nov 2026, Mon

পদ্মফুলের কুঁড়িতে হাইল হাওরের গল্প

পদ্মফুলের কুঁড়িতে হাইল হাওরের গল্প

জীববৈচিত্র্য, জলজসম্পদ ও হাওরপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার এক অনন্য চিত্র

আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): প্রকৃতির অপার সৌন্দর্যের প্রতীক পদ্মফুল। জলাশয়ের বুকে সবুজ পাতার ফাঁকে ফুটে থাকা গোলাপি পদ্মের সৌন্দর্য যে কাউকে মুগ্ধ করে। সেই পদ্মফুলের কুঁড়ি নিয়ে শ্রীমঙ্গলের চৌমোহনায় বসেছেন মনা মিয়া। সাজিয়ে রেখেছেন গোলাপি, হালকা সবুজ ও হলদেটে আভাযুক্ত পদ্মের কুঁড়ি। পথচারীদের কেউ কৌতূহল নিয়ে দেখছেন, কেউবা কিনছেন পছন্দের ফুল।

মনা মিয়া জানান, তিনি নিজে হাওর থেকে পদ্মফুল সংগ্রহ করেন না। শ্রীমঙ্গলের হাইল হাওর থেকে যাঁরা পদ্মফুল তুলে আনেন, তাঁদের কাছ থেকে কিনে এনে চৌমোহনায় বিক্রি করেন।

একজন ক্রেতা জানান, তিনি ৮০ টাকায় দুইটি পদ্মফুলের কুঁড়ি কিনেছেন। তাঁর ভাষ্য, লক্ষ্মীপূজায় পদ্মফুলের প্রয়োজন হয়।

মনা মিয়ার এই ছোট্ট ব্যবসার সঙ্গে জড়িয়ে আছে হাইল হাওরের প্রকৃতি, জলজসম্পদ এবং হাওরপাড়ের মানুষের জীবন-জীবিকার গল্প। হাওর থেকে সংগ্রহ করা পদ্মফুল স্থানীয় বাজারে পৌঁছানোর মধ্য দিয়ে প্রকৃতি ও মানুষের পারস্পরিক নির্ভরতার একটি চিত্র ফুটে ওঠে।

কুঁড়ি থেকে ফুল, প্রকৃতির অনন্য সৃষ্টি

পদ্ম একটি বহুবর্ষজীবী জলজ উদ্ভিদ। এর বৈজ্ঞানিক নাম Nelumbo nucifera Gaertn.। এটি Nelumbonaceae পরিবারের উদ্ভিদ। বাংলাদেশের বিভিন্ন হাওর, বিল, পুকুর ও প্রাকৃতিক জলাশয়ে পদ্ম জন্মে।

পদ্মের পাতা বড়, গোলাকার ও সবুজ। লম্বা ডাঁটার ওপর ফুটে থাকে আকর্ষণীয় গোলাপি বা সাদা ফুল। অসংখ্য কোমল পাপড়ির সমন্বয়ে তৈরি হয় পদ্মফুল। কুঁড়ি ধীরে ধীরে প্রস্ফুটিত হয়ে পাপড়ি মেলে ধরে। ফুলের মাঝখানে থাকে বীজধারী অংশ। পাপড়ি ঝরে যাওয়ার পর সেটি ধীরে ধীরে ফলে পরিণত হয়।

পদ্মের ভূগর্ভস্থ কাণ্ড কাদামাটির মধ্যে বিস্তৃত থাকে। সেখান থেকে নতুন গাছ জন্মায়। বর্ষা ও শরৎকালে জলাশয়ে পদ্মফুলের সৌন্দর্য বিশেষভাবে চোখে পড়ে।

পদ্ম শুধু ফুল নয়, ফল ও খাদ্যও

পদ্মের ফল স্থানীয়ভাবে পদ্মটুনা নামে পরিচিত। এর ভেতরে থাকে বীজ। হাওরপাড়ের মানুষ পদ্মটুনা থেকে বীজ বের করে খেয়ে থাকেন। পদ্মের বীজ বিভিন্ন অঞ্চলে খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ ছাড়া কিছু অঞ্চলে পদ্মের কচি ডাঁটা ও ভূগর্ভস্থ কাণ্ড বা রাইজোমও সবজি হিসেবে খাওয়া হয়।

হাওরের জলজসম্পদ, মানুষের খাদ্য ও জীবিকা

হাইল হাওর শুধু মাছের ভান্ডার নয়, নানা ধরনের জলজ উদ্ভিদ ও প্রাকৃতিক সম্পদেও সমৃদ্ধ। পদ্মফুল, পদ্মটুনা, শাপলা, শালুক, কলমিশাক ও সিংড়াসহ বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ ও ফল হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের অংশ।

হাওরপাড়ের মানুষ এসব জলজসম্পদ পরিবারের খাবারের জন্য সংগ্রহ করেন। আবার কেউ কেউ বাজারে বিক্রি করে সংসার চালান। বিশেষ করে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশের খাদ্য ও আয়ের সঙ্গে এসব সম্পদ সরাসরি জড়িত। শাপলা, শালুক, কলমিশাক কিংবা সিংড়া- এসব অনেক পরিবারের কাছে শুধু খাবার নয়, জীবিকারও অবলম্বন।

হাইল হাওরের চারপাশের কয়েকটি ইউনিয়ন ও অসংখ্য গ্রাম মিলিয়ে প্রায় দেড় লাখ মানুষের বসবাস। তাঁদের পেশা ও জীবিকার ধরন ভিন্ন। তবে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর একটি অংশ প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। হাওর থেকে জলজ উদ্ভিদ ও শাকসবজি সংগ্রহ করে বিক্রির মাধ্যমে তাঁরা আয় করেন। আবার এসবের অনেক কিছু নিজেরাও খাবার হিসেবে ব্যবহার করেন।

তাই হাইল হাওরের জলজসম্পদ শুধু প্রকৃতির সৌন্দর্য কিংবা পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষার উপাদান নয়, বহু মানুষের জীবনধারণেরও অবলম্বন।

জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রয়োজন সংরক্ষণ

হাওরে পদ্মফুল, শাপলা, শালুকসহ নানা জলজ উদ্ভিদের উপস্থিতি সেখানকার প্রাকৃতিক জীববৈচিত্র্যের পরিচয় বহন করে। এসব উদ্ভিদ জলজ পরিবেশের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। জলাশয়ের স্বাভাবিক পরিবেশ ও প্রাকৃতিক সম্পদ টিকে থাকলে হাওরের জীববৈচিত্র্যও সমৃদ্ধ থাকে।

হাইল হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় একটি বেসরকারি সংস্থা কাজ করছে। হাওরের প্রাকৃতিক সম্পদ সংরক্ষণ এবং জলজ পরিবেশের গুরুত্ব তুলে ধরতে এ ধরনের উদ্যোগ প্রয়োজন। কারণ, হাওরের জীববৈচিত্র্য রক্ষার পাশাপাশি এর ওপর নির্ভরশীল মানুষের জীবন-জীবিকাও বিবেচনায় রাখা জরুরি। প্রাকৃতিক সম্পদ কমে গেলে সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়তে পারে দরিদ্র হাওরনির্ভর পরিবারগুলোর ওপর।

প্রকৃতি ও মানুষের মেলবন্ধন

শ্রীমঙ্গলের চৌমোহনায় মনা মিয়ার পদ্মফুল বিক্রির দৃশ্যটি আপাতদৃষ্টিতে সাধারণ। কিন্তু এর পেছনে রয়েছে হাইল হাওরের বিস্তৃত প্রকৃতি, পদ্ম সংগ্রহকারী মানুষের শ্রম, স্থানীয় বাজারের চাহিদা এবং ধর্মীয় ঐতিহ্যের গল্প।

সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে পদ্ম অত্যন্ত পবিত্র ফুল। শারদীয় দুর্গাপূজা ও লক্ষ্মীপূজাসহ বিভিন্ন ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানে পদ্মফুলের ব্যবহার রয়েছে। দেবী লক্ষ্মীর সঙ্গে পদ্মের সম্পর্কও সুপরিচিত। অন্যদিকে, পদ্মের ফল ও বীজ হাওরপাড়ের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের অংশ।

একটি পদ্মফুল তাই একই সঙ্গে প্রকৃতির সৌন্দর্য, ধর্মীয় বিশ্বাস, খাদ্য ও মানুষের জীবিকার প্রতিনিধিত্ব করছে। হাইল হাওরের বুক থেকে সংগ্রহ করা সেই পদ্মের কুঁড়ি যখন শ্রীমঙ্গলের চৌমোহনায় বিক্রি হয়, তখন প্রকৃতি ও মানুষের নিবিড় সম্পর্ক আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

হাইল হাওরের পদ্মফুল শুধু জলাশয়ের সৌন্দর্য বাড়ায় না; এটি মনে করিয়ে দেয়, প্রকৃতির প্রতিটি সম্পদের সঙ্গে জড়িয়ে থাকতে পারে মানুষের বেঁচে থাকার গল্প। সেই গল্প ও প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা করা তাই আমাদের সবার দায়িত্ব।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *