বিয়ে, পারিবারিক অনুষ্ঠান কিংবা আত্মীয়-স্বজনের বাসায় দাওয়াত খেতে গিয়ে খাবার শেষে আয়োজককে টাকা দেওয়া নিয়ে অনেকের মনেই দ্বিধা তৈরি হয়। কেউ এটিকে সৌজন্য ও সহযোগিতা মনে করেন, আবার কেউ মনে করেন, দাওয়াত খেয়ে টাকা দেওয়া ঠিক নয়। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে ‘গিফট’ বা নগদ অর্থ দেওয়ার প্রচলন এখন অনেক পরিবারেই দেখা যায়। তবে ইসলামের দৃষ্টিতে বিষয়টি নির্ভর করে অর্থ দেওয়ার উদ্দেশ্য, পারস্পরিক সম্মতি ও আয়োজনের ধরন অনুযায়ী।
দাওয়াত কি খাবারের বিনিময়ে অর্থ দেওয়ার চুক্তি?
ইসলামে অতিথিকে সম্মান করা ও আপ্যায়ন করাকে উত্তম নৈতিক আচরণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহ ও পরকালের প্রতি বিশ্বাস রাখে, সে যেন তার অতিথিকে সম্মান করে।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস ৬১৩৫)
অর্থাৎ, সাধারণ দাওয়াত মূলত আতিথেয়তা ও আন্তরিকতার প্রকাশ। এখানে অতিথিকে খাবারের বিনিময়ে অর্থ দিতে হবে- এমন কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। আয়োজক স্বেচ্ছায় আপ্যায়ন করলে অতিথির ওপর খাবারের মূল্য পরিশোধের দায়িত্ব বর্তায় না।
উপহার বা সহযোগিতা হিসেবে টাকা দেওয়া
ইসলামে উপহার দেওয়া ও গ্রহণের বিষয়টি উৎসাহিত করা হয়েছে। হজরত আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) উপহার গ্রহণ করতেন এবং এর প্রতিদানও দিতেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস ২৫৮৫)
তাই দাওয়াত খেয়ে খুশি হয়ে কিংবা আয়োজকের খরচে সহযোগিতার উদ্দেশ্যে স্বেচ্ছায় টাকা দেওয়া বা উপহার দেওয়া জায়েজ। এটি খাবারের মূল্য নয়, বরং সৌজন্য ও আন্তরিকতার বহিঃপ্রকাশ।
সামাজিক বাস্তবতায় তৈরি হচ্ছে নতুন প্রশ্ন
বাংলাদেশের সামাজিক বাস্তবতায় বিয়ে কিংবা বড় পারিবারিক অনুষ্ঠানে নগদ অর্থ উপহার দেওয়ার প্রচলন দীর্ঘদিনের। অনেকেই নবদম্পতির নতুন জীবন শুরুতে সহযোগিতা করার জন্য টাকা দেন। আবার কেউ আত্মীয়ের বাড়িতে দাওয়াত খেয়ে ফেরার সময় সামর্থ্য অনুযায়ী কিছু অর্থ বা উপহার দিয়ে থাকেন।
তবে অনেক ক্ষেত্রে এই সৌজন্যবোধ সামাজিক চাপে পরিণত হচ্ছে। বিশেষ করে বিয়ের অনুষ্ঠানে কে কত টাকা দিলেন, তা হিসাব রাখা কিংবা পরবর্তী অনুষ্ঠানে সমপরিমাণ অর্থ ফেরত দেওয়ার প্রত্যাশা তৈরি হচ্ছে। ফলে উপহার আর নিছক ভালোবাসার প্রকাশ থাকছে না; কোথাও কোথাও এটি সামাজিক দেনা-পাওনার হিসাবেও পরিণত হচ্ছে।
এমনকি নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের অনেকেই সামাজিক মর্যাদা রক্ষার জন্য নিজের সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে উপহার দিতে বাধ্য বোধ করেন। অথচ উপহারের প্রকৃত মূল্য অর্থের পরিমাণে নয়, বরং আন্তরিকতায়।
কোন পরিস্থিতিতে কী বিধান?
দাওয়াতের আগে যদি আয়োজক স্পষ্টভাবে জানান যে প্রত্যেক অতিথিকে নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ দিয়ে খাবারের খরচ ভাগাভাগি করতে হবে এবং অতিথিরা তাতে সম্মত হন, তাহলে সেটি যৌথ আয়োজন হিসেবে বিবেচিত হতে পারে।
অন্যদিকে, সাধারণ দাওয়াতের পর আগে থেকে কোনো সমঝোতা না থাকলে আয়োজকের পক্ষে অতিথির কাছে খাবারের মূল্য দাবি করার সুযোগ নেই। একইভাবে সামাজিক চাপ, লোকলজ্জা কিংবা বাধ্যবাধকতার কারণে অর্থ দেওয়া প্রকৃত স্বেচ্ছা উপহার নয়।
ধর্মীয় নির্দেশনা ও সামাজিক শিষ্টাচারের সমন্বয়
পবিত্র কোরআনের সুরা আন-নিসার ২৯ নম্বর আয়াতে পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে লেনদেনের বৈধতার কথা বলা হয়েছে। এ নীতির আলোকে অর্থ দেওয়া কিংবা গ্রহণের ক্ষেত্রে উভয় পক্ষের সম্মতি ও উদ্দেশ্য গুরুত্বপূর্ণ।
সব মিলিয়ে বলা যায়, দাওয়াত খেয়ে আয়োজককে স্বেচ্ছায় টাকা বা উপহার দেওয়া ইসলামের দৃষ্টিতে জায়েজ। তবে সাধারণ দাওয়াতকে অর্থ আদায়ের উপলক্ষ বানানো কিংবা অতিথির ওপর আর্থিক চাপ সৃষ্টি করা উচিত নয়। একইভাবে উপহার দেওয়ার সামর্থ্য না থাকলে কাউকে ছোট করে দেখারও সুযোগ নেই।
কারণ, দাওয়াতের মূল সৌন্দর্য অর্থের লেনদেনে নয়; বরং আন্তরিকতা, ভালোবাসা ও পারস্পরিক সম্মানে। উপহার হওয়া উচিত স্বতঃস্ফূর্ত, সামাজিক বাধ্যবাধকতা নয়।

