সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

বোয়ালমারীতে কলেজ শিক্ষকের অভিনব জালিয়াতি ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ আত্মগোপনে থেকে জমা দিলেন ভুয়া চিকিৎসা সনদ!

বোয়ালমারীতে কলেজ শিক্ষকের অভিনব জালিয়াতি ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’-এ আত্মগোপনে থেকে জমা দিলেন ভুয়া চিকিৎসা সনদ!

ফরিদপুর জেলা প্রতিনিধি: ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে ‘অপারেশন ডেভিল হান্ট’ শুরু হলে গ্রেপ্তার এড়াতে আত্মগোপনে ছিলেন কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বোয়ালমারী উপজেলা কমিটির ৭৯ নম্বর সদস্য ও বোয়ালমারী কাজী সিরাজুল ইসলাম মহিলা কলেজের ইতিহাস বিভাগের সহকারী অধ্যাপক মোহাম্মদ মজনু মিয়া।

অভিযোগ রয়েছে, তিনি কলেজে ছুটির আবেদনপত্রের সঙ্গে একটি চিকিৎসা সনদ জমা দেন, যেখানে ২০০৮ সালে অবসরে যাওয়া স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক শাহজাহান বিশ্বাসের নাম ও পদবি ব্যবহার করে সিল-স্বাক্ষর দেওয়া হয়েছে। ওই সনদে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি অজ্ঞাত রোগে ভুগছিলেন। চিকিৎসা সনদটিতে বাংলা ও ইংরেজিতে ভিন্ন ভিন্ন তারিখ লেখা রয়েছে।

আরও জানা যায়, ‘মেডিসিন’ বিভাগের চিকিৎসা সনদ ব্যবহার করা হলেও রোগের প্রমাণ হিসেবে সংযুক্ত করা হয়েছে চক্ষু পরীক্ষার কয়েকটি কাগজ। এমনকি যে ছুটির আবেদনপত্রের সঙ্গে এসব সংযুক্তি দেওয়া হয়েছে, সেই আবেদনপত্রেও কোনো তারিখ উল্লেখ করা হয়নি।

চিকিৎসা সনদের প্যাডে উল্লেখিত ঢাকার মিরপুর-১-এর ১/ডি, ৩-৩৫, ‘বিসমিল্লাহ ফার্মেসি’ ঠিকানায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, ওই চিকিৎসা সনদ তাদের দেওয়া নয়। প্রতিষ্ঠানটির পক্ষ থেকে আরও জানানো হয়, কোনো অবসরপ্রাপ্ত মেডিকেল অফিসার চিকিৎসা সনদ প্রদান করতে পারেন না।

অভিযোগ রয়েছে, কর্মস্থলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে না জানিয়ে এক মাসেরও বেশি সময় অনুপস্থিত থাকলেও মজনু মিয়া ১৮ জানুয়ারি থেকে ২৬ জানুয়ারি পর্যন্ত মাত্র ৯ দিনের ছুটির আবেদন কলেজে জমা দেন। পাশাপাশি হাজিরা খাতার ফাঁকা স্থানে স্বাক্ষর জালিয়াতির আশ্রয় নেন বলেও জানা গেছে।

সবচেয়ে বিস্ময়কর বিষয় হলো, প্রায় এক মাসের বেশি সময় কলেজে অনুপস্থিত থাকার ঘটনাকে বৈধতা দিতে ছয় মাস পর, গত ১ জুলাই তিনি ওই চিকিৎসা সনদসহ ছুটির আবেদন কলেজে জমা দেন। ঘটনার সত্যতা জানতে সংবাদকর্মীরা গত সোমবার (১৩ জুলাই) কলেজে গেলে তিনি তড়িঘড়ি করে ছুটির আবেদনপত্রে উল্লেখিত সময়ের আগে ও পরের তারিখে হাজিরা খাতার ফাঁকা ঘরগুলোতে স্বাক্ষর করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

অনুসন্ধানে আরও জানা গেছে, মোহাম্মদ মজনু মিয়া কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের বোয়ালমারী উপজেলা কমিটির ৭৯ নম্বর সদস্য। সরকারি বেতনভুক্ত চাকরিজীবী হয়েও তিনি উপজেলার বড়গা বাজারে কীটনাশক ও সারের পরিবেশক এবং ওয়াপদা মোড়ে যমুনা ইলেকট্রনিকসের পরিবেশক হিসেবে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। সরকারি নীতিমালা অনুযায়ী কোনো এমপিওভুক্ত শিক্ষক আর্থিক সুবিধাভোগী ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকতে পারেন না।

জানা যায়, ১৯৯৭ সালে তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিএ (পাস কোর্স) সম্পন্ন করে প্রিলিমিনারি মাস্টার্স করার পর দলীয় প্রভাব খাটিয়ে তৎকালীন ছাত্রলীগ নেতা মজনু মিয়া ওই প্রতিষ্ঠানে প্রভাষক হিসেবে যোগ দেন। স্থানীয়দের অভিযোগ, চাকরি জীবনের শুরু থেকেই কলেজের দায়িত্ব পালনের চেয়ে দলীয় সভা-সমাবেশ এবং ব্যবসা-বাণিজ্যেই তিনি বেশি সময় ব্যয় করতেন। কলেজে নিয়মিত উপস্থিত না থাকলেও প্রভাব খাটিয়ে মাঝে মধ্যে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যেতেন। এ কাজে দুর্নীতির অভিযোগে (৫ আগস্ট-পরবর্তী সময়ে) সাময়িক বরখাস্ত হওয়া কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ এবং বাকশিসের কেন্দ্রীয় কমিটির কোষাধ্যক্ষ মো. ফরিদ আহমেদের সহযোগিতা ছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

২০১৫-১৬ সালে মজনু মিয়ার বিরুদ্ধে কলেজের প্রায় সাত লাখ টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে। অভিযোগের তদন্তে সত্যতা পাওয়ার পর তিনি ওই অর্থ কলেজ তহবিলে ফেরত দেন বলে জানা গেছে।

এ ছাড়া দলীয় প্রভাব খাটিয়ে মুজিব শতবর্ষ উপলক্ষে অধ্যক্ষের কার্যালয়ে ১০২ পাউন্ড ওজনের কেক কাটা, জেলা আওয়ামী লীগের নতুন কমিটিকে গাড়িবহরসহ সংবর্ধনা দেওয়া এবং পদ্মা সেতুর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের নামে কলেজের বিপুল অর্থ অপচয়েরও অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে।

এসব আর্থিক অনিয়ম ও অব্যবস্থাপনার কারণে কলেজটি তীব্র আর্থিক সংকটে পড়ে। একপর্যায়ে নন-এমপিও শিক্ষকদের বেতন-ভাতা সম্পূর্ণ বন্ধ হয়ে যায়। ওই আর্থিক সংকটের মধ্যে ২৭ এপ্রিল ২০২২ সালে মানসিক ও অর্থনৈতিক চাপে পড়ে কলেজের শিক্ষক রণজিৎ কুমার মণ্ডল স্ট্রোক করেন। সে সময় বিষয়টি বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

একাধিক সূত্রের দাবি, স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী ও আর্থিকভাবে সক্ষম হওয়ায় তার বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে কলেজ কর্তৃপক্ষ সাহস পায় না। স্থানীয় প্রভাব খাটিয়ে তিনি এখনো কলেজে অস্থিতিশীল পরিবেশ সৃষ্টি করছেন, যার ফলে শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *