সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

কুলিয়ারচর ইউএনওর দ্বিমুখী আচরণ: সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ নাকি পূর্বশত্রুতা?

কুলিয়ারচর ইউএনওর দ্বিমুখী আচরণ: সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ নাকি পূর্বশত্রুতা?

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে নবযোগদানকৃত উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও কুলিয়ারচর পৌরসভার প্রশাসক সাফফাত আরা সাঈদের একটি সিদ্ধান্তকে কেন্দ্র করে স্থানীয় সুশীল সমাজ ও গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষের সৃষ্টি হয়েছে। তাঁর এই অবস্থানকে ‘দ্বিমুখী নীতি ও বৈষম্য’ হিসেবে আখ্যায়িত করে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় সাংবাদিকরা- এটি কি সাংবাদিকদের প্রতি কোনো ক্ষোভ, নাকি পূর্বশত্রুতার প্রতিফলন?

জানা যায়, সরকারি আদেশে বদলি হয়ে গত রোববার বিকেলে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয়ে যোগদান করেন ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন উপজেলার ১ নম্বর গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নতুন ইউএনওকে তাঁর কার্যালয়ে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে যান। এ সময় ইউএনওর কার্যালয়ে স্থানীয় ছয়জন পেশাদার সাংবাদিক উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রতিনিধিরা ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে চাইলে ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে ছবি তোলার বিষয়ে আপত্তি জানান। তিনি জানান, ছবি তোলা হলে তিনি জনপ্রতিনিধিদের ফুলের তোড়া গ্রহণ করবেন না। পরে উপস্থিত সাংবাদিকরা জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া ফুলেল শুভেচ্ছার ছবি না তুলে ইউএনওর কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান।

অপরদিকে, যোগদানের দুই দিন পর মঙ্গলবার ভিন্ন চিত্র দেখা যায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর বেশ কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবিতে দেখা যায়, তিনি অন্যদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করছেন এবং ক্যামেরাবন্দী হচ্ছেন।

এছাড়াও মঙ্গলবার দুপুরে আরও একটি ঘটনা ঘটে। উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির প্রতিনিধি হিসেবে সাক্ষাৎ করতে যাওয়া এক সদস্য, যিনি পেশায় একজন সাংবাদিক, জানান, তিনি ও কমিটির অপর এক সদস্য- তিনিও পেশায় সাংবাদিক- ইউএনওর কার্যালয়ে অবস্থানকালে উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বি.এম. কলেজের শিক্ষকরা তাঁদের কলেজের সভাপতি নবযোগদানকৃত ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে আসেন।

সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে সেখানেও ছবি তুলতে নিষেধ করা হয় বলে ওই দুই সাংবাদিক জানান। পরবর্তীতে উপজেলা প্রশাসন চত্বরে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক পরিচালিত উপজেলা প্রশাসন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে এলে তাঁদের ক্ষেত্রেও ছবি তোলায় একই নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তারা।

উপস্থিত দুই সাংবাদিক ইউএনওর কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার প্রায় এক মিনিটের মাথায় ফুলের তোড়া নিয়ে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ইউএনওর কার্যালয়ে গেলে চিত্র বদলে যায়। তখন কোনো ধরনের আপত্তি ছাড়াই ইউএনওকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে ওই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়।

এরপর স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মধ্যে হতাশা ও অসন্তোষ দেখা দেয়। তারা প্রশ্ন তোলেন- দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি তুলতে ইউএনও কর্তৃক বাধা দেওয়ার কারণ কী? একই স্থানে সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি এবং সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পরপরই ছবি তোলার সুযোগ দেওয়ার কারণ কী? সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ছবি তোলার ক্ষেত্রে ইউএনওর অনীহার কারণই বা কী?

স্থানীয় সাংবাদিকদের কেউ কেউ প্রশ্ন তুলেছেন, কুলিয়ারচরের সাংবাদিকদের প্রতি ইউএনওর কোনো ব্যক্তিগত ক্ষোভ রয়েছে কি না, কিংবা তাঁদের সঙ্গে পূর্বের কোনো বিরোধের প্রভাব এ আচরণে রয়েছে কি না।

একজন সরকারি কর্মকর্তা ব্যক্তিগতভাবে ছবি তুলতে পছন্দ করবেন কি না, সেটি তাঁর ব্যক্তিগত বিষয়। তবে একই ধরনের ফুলেল শুভেচ্ছার ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছবি তুলতে নিষেধ করা এবং সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পরপরই ছবি তোলায় আপত্তি না থাকার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে। ফলে প্রশ্ন উঠছে- আপত্তি কি ছবি তোলায়, নাকি সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ছবি তোলায়?

সাংবাদিকদের দাবি, একজন দায়িত্বশীল সরকারি কর্মকর্তার সঙ্গে গণমাধ্যমকর্মীদের এমন দূরত্ব তৈরি হলে তথ্য সংগ্রহ ও সংবাদ পরিবেশনের ক্ষেত্রে জটিলতা সৃষ্টি হতে পারে। স্থানীয় সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরাও বিষয়টি উপজেলা প্রশাসনের স্বচ্ছতা ও গণমাধ্যমের সঙ্গে প্রশাসনের সম্পর্কের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখছেন।

স্থানীয় সংবাদকর্মীরা মনে করেন, জনপ্রতিনিধি ও সাংবাদিকদের সঙ্গে উপজেলা প্রশাসনের সুসম্পর্ক থাকা জরুরি। এ ধরনের পরিস্থিতি তৈরি হয়ে থাকলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অবস্থান পরিষ্কার করা প্রয়োজন বলে দাবি করেছেন কুলিয়ারচরে কর্মরত গণমাধ্যমকর্মীরা।

ছবি: সাংবাদিকরা না থাকার সময় কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) সাফফাত আরা সাঈদকে পৌরসভার পক্ষ থেকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর ছবি ক্যামেরাবন্দী করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। ছবি: ফেসবুক থেকে সংগৃহীত।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *