দোহার (ঢাকা): ঢাকার দোহার উপজেলার বিলাশপুর ইউনিয়নের রাধানগর গ্রামে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে দগ্ধ হয়ে স্বামী-স্ত্রীর মর্মান্তিক মৃত্যু হয়েছে। নিজেরা আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্মীভূত হওয়ার আগে এই দম্পতি তাদের তিন সন্তানকে নিশ্চিত মৃত্যুর হাত থেকে রক্ষা করেন। শুক্রবার (৮ মে) দিবাগত রাত আনুমানিক দেড়টার দিকে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে।
স্থানীয় বাসিন্দা ও প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা যায়, শুক্রবার দিবাগত রাত প্রায় দেড়টার দিকে রাধানগর গ্রামের আবদুস সালাম শিকদারের টিনশেড ও কাঠের তৈরি ঘরে আগুনের সূত্রপাত হয়। কাঠ ও টিনের ঘর হওয়ায় মুহূর্তের মধ্যেই আগুনের তীব্রতা বেড়ে যায় এবং পুরো বাড়িতে ছড়িয়ে পড়ে।
বেঁচে থাকা এক কন্যা জানায় প্রথমে আমি ঘুমে ছিলাম, পরে জেগে দেখি আব্বু মোবাইল দেখছে। তখনই দরজা দিয়ে আগুন ঢুকতে দেখা যায়। আব্বু জানালা দিয়ে দেখে যে কেউ একজন দৌড়ে পালাচ্ছে। তখন আব্বু কাকাকে ডাক দেয় কিন্তু কেউ আসার আগেই আগুন ভয়াবহ রূপ নেয়। ঘরের ভেতর নিঃশ্বাস নিতে পারছিলাম না। আম্মু আর আব্বু মিলে আমাদের জানালার গ্রিল ভেঙে বাইরে বের করে দেয়। কিন্তু আব্বু আর আম্মু আর বের হতে পারেনি।
হঠাৎ আগুনের তাপে ঘুম ভেঙে গেলে সালাম ও তার স্ত্রী নাসিমা বেগম দেখতে পান, তাদের পালানোর পথ প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। প্রাণের মায়া ত্যাগ করে এই দম্পতি প্রথমে তাদের তিন সন্তানকে আগুনের ভেতর থেকে বের করে নিরাপদ স্থানে পৌঁছে দেন। সন্তানদের বাইরে পাঠাতে সক্ষম হলেও ততক্ষণে আগুনের লেলিহান শিখা দরজাকে গ্রাস করে ফেলে। ঘরের আসবাবপত্র ও কাঠের কাঠামোয় আগুন ধরে যাওয়ায় তারা আর বাইরে বের হওয়ার সুযোগ পাননি।
প্রতিবেশীরা ছুটে এসে আগুন নেভানোর আপ্রাণ চেষ্টা চালালেও ভেতরের প্রচণ্ড উত্তাপের কারণে দম্পতির কাছে পৌঁছাতে ব্যর্থ হন। আর্তচিৎকার করতে করতে ঘরের ভেতরেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়েন তারা।
খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের একাধিক ইউনিট দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে যায়। প্রায় আড়াই ঘণ্টার নিরলস প্রচেষ্টার পর ভোর রাত ৪টার দিকে আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসে। তবে ততক্ষণে দম্পতির সাজানো বসতঘরটি পুড়ে ছাই হয়ে যায়। ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা ভস্মীভূত ঘরের ভেতর থেকে সালাম ও নাসিমার দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করেন।
অগ্নিদগ্ধ হয়ে নিহত সালাম শিকদার দম্পতির মৃত্যুতে গভীর শোক ও সমবেদনা প্রকাশ করেছেন ঢাকা-১ আসনের সংসদ সদস্য খন্দকার আবু আশফাক। তিনি দ্রুত ঘটনাস্থল পরিদর্শন করে স্থানীয় প্রশাসন কে ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারের পাশে থেকে সব ধরনের সহযোগিতা করার নির্দেশ দিয়েছেন।
দোহার থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবু বকর সিদ্দিক সংবাদমাধ্যমকে জানান, নিহতদের মরদেহ উদ্ধার করে থানায় নেওয়া হয়েছে এবং ময়নাতদন্তের প্রক্রিয়া চলছে। ঘটনার ভয়াবহতা বর্ণনা করতে গিয়ে তিনি বলেন, প্রাথমিকভাবে এটি অগ্নিকাণ্ড বলেই মনে হচ্ছে। তবে এর পেছনে কোনো নাশকতা বা শর্ট সার্কিটের বিষয় আছে কি না, তা গুরুত্বের সঙ্গে তদন্ত করা হচ্ছে। এই দম্পতির মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক।
এদিকে বাবা-মাকে হারিয়ে তিন শিশু সন্তান এখন দিশেহারা। সন্তানদের বাঁচাতে নিজেরা পুড়ে মৃত্যুবরণ করার এই ঘটনা রাধানগর গ্রামসহ পুরো দোহার উপজেলায় গভীর শোকের ছায়া নামিয়ে এনেছে। শোকস্তব্ধ গ্রামবাসী এই অকাল মৃত্যুতে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়েছেন।

