সর্বশেষ :
24 Oct 2026, Sat

গাইবান্ধায় সার ডিলারশিপে দুর্নীতির অভিযোগ: ১৩ জনের ১২ জনই বিএনপি, ১ জন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী

গাইবান্ধায় সার ডিলারশিপে দুর্নীতির অভিযোগ: ১৩ জনের ১২ জনই বিএনপি, ১ জন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী

বায়েজিদ, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা): গাইবান্ধা সদর উপজেলায় নতুন করে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত ১৩ জনের মধ্যে ১২ জনই বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী। অন্যদিকে, একজন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী মনোনীত হয়েছেন। তাঁদের আগে সার ব্যবসার অভিজ্ঞতা ছিল না বলে অভিযোগ উঠেছে। অন্যদিকে, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকেও ডিলার হতে পারেননি বলে অভিযোগ করেছেন কয়েকজন আবেদনকারী। তাঁরাও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের নেতা-কর্মী।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত তালিকায় মনোনীত ব্যক্তিদের রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতা ও ব্যবসায়িক অভিজ্ঞতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। যদিও ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ অস্বীকার করেছেন বিএনপির নেতারা। মনোনীত ব্যক্তিদের কয়েকজন বলেছেন, তাঁরা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিয়ে যোগ্যতার ভিত্তিতে ডিলার হয়েছেন।

জেলা সদরের ১৩টি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়েছিল। পরে কৃষি মন্ত্রণালয়ের সার ব্যবস্থাপনা ও মনিটরিং শাখার এক চিঠিতে ১৩ জনকে ডিলার হিসেবে মনোনীত করে পরবর্তী কার্যক্রম গ্রহণের জন্য জেলা প্রশাসককে নির্দেশ দেওয়া হয়।

চূড়ান্ত তালিকা বিশ্লেষণে দেখা যায়, মনোনীত ব্যক্তিদের মধ্যে ১২ জন বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত। তাঁদের মধ্যে বিএনপি, যুবদল, কৃষকদল ও স্বেচ্ছাসেবক দলের বিভিন্ন পর্যায়ের নেতা-কর্মী রয়েছেন। এ ছাড়া একজন আওয়ামী লীগ নেতার স্ত্রী রয়েছেন। কয়েকজনের সঙ্গে স্থানীয় দলীয় নেতাদের পারিবারিক সম্পর্কও রয়েছে। তবে বাদ পড়া আবেদনকারীদের মধ্যেও বিএনপি ও এর সহযোগী সংগঠনের রাজনীতির সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিরা রয়েছেন।

সার ডিলার নিয়োগের নীতিমালা অনুযায়ী, সংশ্লিষ্ট ইউনিয়ন বা পৌরসভায় আবেদনকারীর নিজস্ব অথবা ভাড়া করা কমপক্ষে ২৫ মেট্রিক টন ধারণক্ষমতার গুদাম থাকতে হবে। গুদামের মেঝে পাকা এবং স্বাভাবিক বন্যার পানির স্তরের ওপরে হতে হবে। আবেদনকারীকে আর্থিকভাবে সচ্ছল হতে হবে এবং ব্যাংকের অন্তত পাঁচ লাখ টাকার সাম্প্রতিক সচ্ছলতার সনদ জমা দিতে হবে। আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত আবেদনকারীদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথাও রয়েছে নীতিমালায়।

উপজেলার ঘাগোয়া ইউনিয়নে সার ডিলার হিসেবে মনোনীত হয়েছেন স্থানীয় বিএনপির সাধারণ সম্পাদক সাকোয়াত হোসেন। তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম ভাই ভাই ট্রেডার্স। তিনি একজন ওষুধ ব্যবসায়ী। স্থানীয় বাসিন্দাদের সূত্রে জানা গেছে, এর আগে তিনি সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন না।

এদিকে, একই ইউনিয়নের বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। এবার ডিলার হওয়ার জন্য আবেদন করলেও চূড়ান্ত তালিকায় তাঁর নাম নেই।

জাহাঙ্গীর আলম বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত থেকেও তিনি ডিলারশিপ পাননি। সব নিয়ম মেনে আবেদন করার পরও বাদ পড়েছেন। নীতিমালায় আগে থেকে সার ব্যবসার সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা থাকলেও তাঁকে মনোনীত করা হয়নি। অথচ এমন একজনকে ডিলার করা হয়েছে, যিনি আগে সার ব্যবসা করেননি। বিষয়টি তাঁর কাছে হতাশাজনক। এসব কিছু টাকার বিনিময়ে করা হয়েছে বলেও তিনি অভিযোগ করেন।

এদিকে, ঘাগোয়া ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগ ও গুদাম অনুমোদন প্রক্রিয়ায় অনিয়ম, জালিয়াতি এবং দুর্নীতির অভিযোগ তুলে সুষ্ঠু তদন্ত করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন মনোনয়নবঞ্চিত ইউনিয়ন বিএনপির জ্যেষ্ঠ সহসভাপতি জাহাঙ্গীর আলম।

বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) দুপুর ২টায় গাইবান্ধায় বাংলাদেশ তৃণমূল কল্যাণ সোসাইটির জেলা কার্যালয়ে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এর আগে অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও প্রতিকার চেয়ে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসক বরাবর লিখিত আবেদনও জমা দেন তিনি।

সংবাদ সম্মেলনে উপস্থাপিত লিখিত বক্তব্য ও অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, ঘাগোয়া ইউনিয়নে বিসিআইসি সার ডিলার হিসেবে নিয়োগপ্রাপ্ত ‘ভাই ভাই ট্রেডার্স’-এর স্বত্বাধিকারী মো. সাকোয়াত হোসেনকে সরকারি নীতিমালা যথাযথভাবে অনুসরণ না করেই একটি গুদাম ব্যবহারের অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, গুদামটির আয়তন মাত্র ৪৫২ বর্গফুট। এ ছাড়া গুদামটির মেঝেতে বড় ধরনের ফাটল রয়েছে এবং মেঝে দেবে গেছে। এ গুদামঘর রাসায়নিক সার সংরক্ষণের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ বলেও অভিযোগ করা হয়।

সংবাদ সম্মেলনে আরও অভিযোগ করা হয়, ডিলারশিপের জন্য দাখিল করা ট্রেড লাইসেন্স ও আয়কর রিটার্নের কাগজপত্র জালিয়াতির মাধ্যমে তৈরি করা হয়েছে। গাইবান্ধা সদর কার্যালয়ের জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের উপসহকারী প্রকৌশলী মো. আজমির হোসেন অনৈতিক সুবিধার বিনিময়ে গুদামটিকে উপযুক্ত হিসেবে উল্লেখ করে প্রতিবেদন জমা দিয়েছেন বলেও অভিযোগ করেন জাহাঙ্গীর আলম।

জাহাঙ্গীর আলম আরও দাবি করেন, যথাযথভাবে সরেজমিনে তদন্ত ও প্রয়োজনীয় যাচাই-বাছাই না করায় প্রকৃত ও যোগ্য ব্যবসায়ীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। এ কারণে ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা জরুরি।

সংবাদ সম্মেলন থেকে সংশ্লিষ্ট গুদামটি সরেজমিনে পুনরায় পরিদর্শন, দাখিল করা নথিপত্র পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই এবং সার ডিলার নিয়োগের পুরো প্রক্রিয়া নিরপেক্ষভাবে তদন্তের জন্য জেলা প্রশাসকের প্রতি জোর দাবি জানান তিনি। একই সঙ্গে তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট ডিলারের লাইসেন্স বাতিলসহ দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের আহ্বান জানানো হয়।

অন্যদিকে, কৃষকদের জীবন-জীবিকা ও গ্রামীণ অর্থনীতির সঙ্গে জড়িত এই স্পর্শকাতর বিষয়ে জেলা প্রশাসনের চূড়ান্ত পদক্ষেপ কী হবে, তা জানতে গাইবান্ধার জেলা প্রশাসকের (ডিসি) কার্যালয়ে যোগাযোগ করা হলে দায়িত্বশীল মহলের পক্ষ থেকে ব্যস্ততার অজুহাত দেখিয়ে এ মুহূর্তে কোনো আনুষ্ঠানিক বক্তব্য বা মন্তব্য দেওয়া হয়নি।

উল্লেখ্য, লিখিত আবেদনের অনুলিপি অবগতি ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ের সচিব, গাইবান্ধা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা, জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এবং জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলীর কাছেও পাঠানো হয়েছে বলে জানানো হয়।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *