সর্বশেষ :
24 Oct 2026, Sat

বিলুপ্তির পথে তালগাছ, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ

বিলুপ্তির পথে তালগাছ, হারিয়ে যাচ্ছে গ্রামবাংলার চিরচেনা রূপ

আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): একসময় গ্রামবাংলার পথঘাট, বাড়ির আঙিনা, পুকুরপাড় ও ফসলের মাঠের পাশে সারি সারি তালগাছ চোখে পড়ত। উঁচু মাথা তুলে দাঁড়িয়ে থাকা এসব তালগাছ ছিল বাংলার প্রকৃতির এক চিরচেনা অনুষঙ্গ। তালগাছে বাসা বাঁধত বাবুই পাখি। তাদের নিপুণ হাতে তৈরি ঝুলন্ত বাসা ছিল গ্রামীণ প্রকৃতির অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে ক্রমেই কমে যাচ্ছে তালগাছ।

গ্রামগঞ্জের পাশাপাশি শহরাঞ্চলেও এখন আগের মতো তালগাছ চোখে পড়ে না।

একসময় তালপাতার পাখার ব্যাপক কদর ছিল। হাতপাখা হিসেবে তালপাতার তৈরি দুই ধরনের পাখা- ডাঁটিওয়ালা ও ভাঁজ করা বা ফোল্ডিং পাখা- ব্যবহৃত হতো। গরমের দিনে বাতাস পাওয়ার সহজ উপায় হিসেবে এসব পাখা ছিল মানুষের নিত্যদিনের সঙ্গী। আধুনিক বৈদ্যুতিক পাখার প্রচলন বাড়লেও তালপাতার পাখা বাংলার ঐতিহ্য ও গ্রামীণ জীবনের স্মৃতি বহন করে চলেছে।

তালগাছের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক শুধু ঐতিহ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এর রয়েছে অর্থনৈতিক ও খাদ্যগত গুরুত্বও। তালের রস, পাকা তালের শাঁস ও তালগুড় এখনো মানুষের কাছে সমানভাবে আদৃত। তাল দিয়ে তৈরি হয় নানা ধরনের পিঠা ও সুস্বাদু খাবার। গ্রামবাংলার খাদ্যসংস্কৃতিতে তাল একটি পরিচিত নাম।

তালগাছের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিচয় হলো, এটি বাবুই পাখির প্রিয় বাসস্থানগুলোর একটি। তালগাছের পাতায় ঝুলে থাকা বাবুই পাখির নান্দনিক বাসা গ্রামবাংলার চিরায়ত সৌন্দর্যের প্রতীক। তালগাছ কমে গেলে এসব পাখির উপযুক্ত বাসা তৈরির স্থানও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তালগাছ কমে যাওয়ার পেছনে অপরিকল্পিত উন্নয়ন ও নগরায়ণকে অন্যতম কারণ হিসেবে দেখছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। রাস্তা বড় করতে গিয়ে গাছ কাটা, জমির ভাগবাটোয়ারা, বসতবাড়ি নির্মাণ এবং গ্রামাঞ্চলকে ক্রমে আধা-শহরে রূপান্তরের ফলে গাছপালার স্বাভাবিক পরিবেশ বদলে যাচ্ছে। উন্নয়নের নামে নির্বিচারে গাছ ধ্বংস হলে প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এ বিষয়ে ছড়াকার ও সিলেটের বালাগঞ্জ সরকারি কলেজের সহকারী অধ্যাপক অবিনাশ আচার্য বলেন, একসময় তালপাতার পাখার কদর ছিল। হাতপাখা হিসেবে দুই ধরনের তালপাতার পাখা হতো- ডাঁটিওয়ালা ও ফোল্ডিং। তালের রস, তালের শাঁস ও তালগুড় এখনো সমানভাবে আদৃত। তালগাছে বাবুই পাখির নান্দনিক বাসা গ্রামবাংলার চিরায়ত রূপ। তালগাছ বজ্রপাত প্রতিরোধ করে। কিন্তু নানা কারণে তালগাছ দিনে দিনে কমে যাচ্ছে। রাস্তা বড় করা, জমির ভাগবাটোয়ারা এবং গ্রামকে আধা-শহরে রূপান্তরের ফলে গাছপালা হারিয়ে যাচ্ছে। মোটকথা, অপরিকল্পিত নগরায়ণ ও উন্নয়নের নামে গাছ ধ্বংস হচ্ছে। নতুন করে তালগাছ না লাগালে একসময় এ গাছ বিপন্ন হয়ে পড়বে।

তালগাছ সংরক্ষণে এখনই কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া প্রয়োজন। রাস্তার পাশে, পুকুরপাড়ে, বাড়ির আঙিনায় ও উপযুক্ত খালি জায়গায় পরিকল্পিতভাবে তালবীজ রোপণ করা যেতে পারে। তবে শুধু বীজ বপন করলেই হবে না, নতুন চারা বেড়ে ওঠা পর্যন্ত নিয়মিত পরিচর্যা ও সুরক্ষার ব্যবস্থাও করতে হবে। পাশাপাশি স্থানীয় মানুষকে তালগাছ রোপণ ও সংরক্ষণে উৎসাহিত করা প্রয়োজন।

তালগাছ হারিয়ে গেলে শুধু গ্রামবাংলার চিরচেনা সৌন্দর্যই ম্লান হবে না, হারিয়ে যেতে পারে ঐতিহ্যের একটি অংশ। এ গাছ পাখিদের আবাসস্থল এবং প্রকৃতির গুরুত্বপূর্ণ একটি উপাদান। তাই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য তালগাছ টিকিয়ে রাখতে অপরিকল্পিতভাবে গাছ কাটা বন্ধের পাশাপাশি ব্যাপকভাবে নতুন তালগাছ রোপণ করতে হবে। সময়মতো উদ্যোগ নেওয়া না হলে গ্রামবাংলার পরিচিত এই বৃক্ষ একদিন সত্যিই দুর্লভ হয়ে উঠতে পারে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *