বেলাল আহমদ, লামা (বান্দরবান): সাম্প্রতিক সময়ে স্মরণকালের ভয়াবহ বন্যার কবলে পড়ে বান্দরবানের লামা উপজেলা ও পৌর এলাকা। চারদিকে থৈথৈ পানি, পানিবন্দি হাজারো মানুষের হাহাকার আর আর্তনাদে ভারী হয়ে উঠেছিল পুরো জনপদ। দুর্যোগের এমন কঠিন মুহূর্তে অসহায় ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের পাশে আশার আলো হয়ে দাঁড়িয়েছেন লামা পৌর প্রশাসক ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন।
উদ্ধারকাজ থেকে শুরু করে ত্রাণ বিতরণ এবং বন্যা-পরবর্তী পুনর্বাসনে তাঁর দিনরাতের অক্লান্ত পরিশ্রম ও মাঠপর্যায়ের সক্রিয় ভূমিকা এখন স্থানীয়দের মুখে মুখে।
বন্যার পানি দ্রুত বৃদ্ধি পেয়ে যখন পুরো লামা শহর ও আশপাশের গ্রামগুলো প্লাবিত হতে শুরু করে, তখনই পৌর প্রশাসনের পক্ষ থেকে দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়া হয়। পানিবন্দি অসহায় মানুষকে নিরাপদ আশ্রয়ে সরিয়ে নিতে তাৎক্ষণিকভাবে মাঠে নামানো হয় ছয়টি উদ্ধারকারী নৌকা। পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন নিজে উপস্থিত থেকে উদ্ধার কার্যক্রম তদারকি করেন। তাঁর সরাসরি নির্দেশনায় শত শত পরিবারকে নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়। শুধু উদ্ধারকাজই নয়, আশ্রয়কেন্দ্রগুলোতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ সুপেয় পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতেও তিনি দিনরাত কাজ করেন।
দুর্যোগের পুরো সময়জুড়ে লামা পৌরসভার ১ থেকে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিটি এলাকায় ছুটে গেছেন পৌর প্রশাসক। পৌরসভার নয়াপাড়া, চেয়ারম্যানপাড়া, হাসপাতালপাড়া, কলিঙ্গাবিল, ছাগলখাইয়া, হরিণঝিরি ও শিলেরতুয়াসহ উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের ক্ষতিগ্রস্ত এলাকায় তিনি নিজে উপস্থিত হয়ে দুর্গত মানুষের হাতে চাল, ডাল, তেলসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় খাদ্যসামগ্রী তুলে দেন।
দুর্গম পথ পাড়ি দিয়ে প্রশাসনের সর্বোচ্চ কর্মকর্তার এভাবে সাধারণ মানুষের দুয়ারে দুয়ারে ত্রাণ পৌঁছে দেওয়ার ঘটনা স্থানীয় বাসিন্দাদের কাছে এক মানবিক ও ইতিবাচক দৃষ্টান্ত হিসেবে বিবেচিত হয়েছে।
ভয়াবহ এই বন্যায় ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতির মুখে পড়েন লামা বাজারের ব্যবসায়ীরা। ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে পানি ঢুকে কোটি কোটি টাকার মালামাল নষ্ট হয়ে যায়। দুর্যোগের এ সংকটময় সময়ে ব্যবসায়ীদের পাশে গিয়ে দাঁড়ান পৌর প্রশাসক। লামা বাজারের ব্যবসায়ীরা জানান, বন্যায় যখন তারা সবকিছু হারিয়ে দিশেহারা, তখন প্রশাসকের সরাসরি উপস্থিতি, সান্ত্বনা এবং সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস তাঁদের মনে নতুন করে বেঁচে থাকার সাহস ও আস্থা জুগিয়েছে।
বন্যার পানি নেমে যাওয়ার পর লামা বাজারজুড়ে জমে টন টন কাঁদামাটি এবং উজান থেকে ভেসে আসা ময়লা-আবর্জনা। এতে বাজারের স্বাভাবিক পরিবেশ নষ্ট হওয়ার পাশাপাশি ক্রেতা ও বিক্রেতাদের চলাচলও ব্যাহত হয়। পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিনের নির্দেশে দ্রুত বাজার পরিষ্কারের বিশেষ ক্র্যাশ প্রোগ্রাম শুরু করা হয়। অল্প সময়ের মধ্যেই বাজারের কাঁদামাটি ও আবর্জনা অপসারণ করে লামা বাজারের স্বাভাবিক সৌন্দর্য ও ব্যবসায়িক পরিবেশ ফিরিয়ে আনা হয়। এ জন্য দূরদূরান্ত থেকে আসা ক্রেতা ও স্থানীয় ব্যবসায়ীরা পৌর প্রশাসকের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন।
জনজীবন স্বাভাবিক করতে সমন্বিত উদ্যোগ:
বন্যা-পরবর্তী ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ এবং জনজীবন দ্রুত স্বাভাবিক করতে যুদ্ধকালীন তৎপরতায় কাজ করছে পৌর প্রশাসন। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত সড়ক যোগাযোগ মেরামত এবং ভেঙে পড়া বিদ্যুৎব্যবস্থা দ্রুত সচল করতে বিদ্যুৎ বিভাগ ও প্রকৌশল বিভাগের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নিয়ে সমন্বিতভাবে কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন মো. মঈন উদ্দিন।
পৌর প্রশাসক মো. মঈন উদ্দিন বলেন, লামা পৌরসভার প্রতিটি নাগরিক আমার নিজের পরিবারের সদস্যের মতো। দুর্যোগের সময় অসহায় মানুষের পাশে থাকা শুধু আমার পেশাগত দায়িত্বই নয়, এটি আমার নৈতিক কর্তব্য। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী মানুষের দুর্ভোগ লাঘবে পৌর প্রশাসন সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে কাজ করছে। যতদিন না পরিস্থিতি পুরোপুরি স্বাভাবিক হচ্ছে, ততদিন আমাদের মানবিক কার্যক্রম ও পুনর্বাসন প্রক্রিয়া অব্যাহত থাকবে।
লামার স্থানীয় সচেতন ও সুশীল মহলের মতে, দুর্যোগকালে প্রশাসনের এমন দ্রুত, সক্রিয় ও মানবিক উদ্যোগ ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের মধ্যে সরকারের প্রতি আস্থা বহুগুণে বাড়িয়ে দিয়েছে। একজন সরকারি কর্মকর্তা হয়েও যেভাবে তিনি সাধারণ মানুষের সঙ্গে মিশে গিয়ে সংকট মোকাবিলা করেছেন, তা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

