সর্বশেষ :
20 Oct 2026, Tue

যে কাকের ডাকে ভাঙত ঘুম, সেই কাক আজ কোথায়? শহর-গ্রামে কমছে আনাগোনা

যে কাকের ডাকে ভাঙত ঘুম, সেই কাক আজ কোথায়? শহর-গ্রামে কমছে আনাগোনা

নিজস্ব প্রতিবেদক: একসময় ভোরের আলো ফুটতেই চারপাশ মুখর হয়ে উঠত কাকের কা কা শব্দে। বাড়ির উঠান, গাছের ডাল, পুকুরপাড়, হাটবাজার কিংবা শহরের অলিগলি- সবখানেই ছিল চিরচেনা কালো পাখিটির অবাধ বিচরণ। কখনো দল বেঁধে গাছের ডালে বসে থাকা, কখনো খাবারের সন্ধানে বাড়ির আঙিনায় ঘুরে বেড়ানো, আবার কখনো ভোরবেলা মানুষের ঘুম ভাঙানো- কাক ছিল আমাদের প্রতিদিনের জীবনের এক পরিচিত অংশ।

কিন্তু সময়ের সঙ্গে যেন বদলে যাচ্ছে সেই চেনা দৃশ্যপট। আগের মতো অনেক জায়গায় চোখে পড়ে না কাকের আনাগোনা, শোনা যায় না তার পরিচিত ডাক। শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে গ্রামের নিরিবিলি জনপদ- কোথাও কোথাও কাকের উপস্থিতি কমে যাওয়ার কথা বলছেন স্থানীয় বাসিন্দারা। আর এ থেকেই প্রশ্ন উঠছে- কোথায় হারিয়ে গেল চিরচেনা কাক? সত্যিই কি কমে যাচ্ছে কাকের সংখ্যা, নাকি বদলে যাওয়া পরিবেশের কারণে তাদের দেখা মিলছে কম?

কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার বিষয়টি নিয়ে উদ্বেগ থাকলেও বাংলাদেশে এ বিষয়ে সাম্প্রতিক জাতীয় পর্যায়ের নির্ভরযোগ্য জরিপ ছাড়া বিলুপ্তির আশঙ্কা নিশ্চিত করে বলা যায় না। তবে আবাসস্থল সংকুচিত হওয়া, গাছপালা কমে যাওয়া, নগরায়ণ ও পরিবেশদূষণের মতো বিষয়গুলো পাখিটির জীবনযাপনে কী প্রভাব ফেলছে, তা খতিয়ে দেখা জরুরি।

বদলে যাচ্ছে চেনা পরিবেশ:

কাক বাংলাদেশের অতি পরিচিত ও মানুষের বসতির সঙ্গে সহজে মানিয়ে নিতে সক্ষম পাখিগুলোর একটি। গ্রামাঞ্চলে বাড়ির উঠান, বাঁশঝাড়, বড় গাছ কিংবা পুকুরপাড়ে যেমন কাকের দেখা মিলত, তেমনি শহরে বাজার, পার্ক, আবাসিক এলাকা ও খাবারের দোকানের আশপাশেও ছিল এর বিচরণ।

কিন্তু অপরিকল্পিত নগরায়ণ, বসতি সম্প্রসারণ ও গাছপালা কমে যাওয়ার কারণে অনেক এলাকায় পাখিদের স্বাভাবিক আবাসস্থল সংকুচিত হচ্ছে। পুরোনো গাছ কেটে বহুতল ভবন নির্মাণ, খোলা জায়গা কমে যাওয়া এবং সবুজ পরিবেশের পরিবর্তন কাকের বাসা তৈরি ও নিরাপদ আশ্রয়ের সুযোগ সীমিত করতে পারে।

বিশেষ করে বড় গাছ কেটে ফেলা হলে কাকের বাসা বাঁধার উপযোগী জায়গা কমে যায়। ফলে কোনো কোনো এলাকায় তাদের আগের মতো দেখা না যাওয়ার পেছনে আবাসস্থলের পরিবর্তন ভূমিকা রাখতে পারে।

খাবারের সন্ধানে কি বদলাচ্ছে কাকের বিচরণ?

কাক সর্বভুক পাখি। খাবারের উচ্ছিষ্ট, পোকামাকড়, ফলমূলসহ বিভিন্ন ধরনের খাবার খেয়ে বেঁচে থাকে। মানুষের বসতির আশপাশে সহজে খাবার পাওয়ার কারণেই দীর্ঘদিন ধরে কাক গ্রাম ও শহরের পরিবেশের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে মিশে রয়েছে।

তবে বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিবর্তন, খাবারের উচ্ছিষ্ট ফেলার স্থান বদলে যাওয়া এবং নগর পরিবেশের রূপান্তরের কারণে কোনো কোনো এলাকায় কাকের খাদ্যসংস্থানের ধরন বদলে যেতে পারে। অন্যদিকে, ময়লার সঙ্গে মিশে থাকা প্লাস্টিক, রাসায়নিক পদার্থ ও বিষাক্ত বর্জ্য পাখির স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে।

যদিও এসব কারণে বাংলাদেশে কাকের সংখ্যা কতটা কমেছে, তা নিশ্চিতভাবে বলার মতো পর্যাপ্ত তথ্য নেই। এ বিষয়ে বৈজ্ঞানিক পর্যবেক্ষণ ও গবেষণা প্রয়োজন।

জলবায়ু পরিবর্তন ও পরিবেশদূষণের প্রভাব:

জলবায়ু পরিবর্তন, তীব্র তাপপ্রবাহ, অনিয়মিত বৃষ্টিপাত ও ঝড়ের মতো চরম আবহাওয়া পাখির জীবনযাত্রায় প্রভাব ফেলতে পারে। বিশেষ করে শহরে গাছপালা ও সবুজ জায়গা কমে গেলে তাপের তীব্রতা বাড়ে, যা পাখির আশ্রয় ও প্রজননের পরিবেশকে প্রভাবিত করতে পারে।

এ ছাড়া কীটনাশক ও অন্যান্য রাসায়নিকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার খাদ্যশৃঙ্খলের মাধ্যমে পাখিদের জন্য ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। তবে কাকের সংখ্যা কমে যাওয়ার ক্ষেত্রে এসব কারণের পৃথক প্রভাব নির্ধারণ করতে স্থানীয় পর্যায়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা জরুরি।

পরিবেশের পরিচ্ছন্নতায় কাকের ভূমিকা:

কাককে অনেকেই বিরক্তিকর পাখি মনে করেন। অথচ পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। পচনশীল জৈব বর্জ্য ও মৃত প্রাণীর দেহাবশেষ খাওয়ার মাধ্যমে কাক প্রাকৃতিক পরিচ্ছন্নতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। পাশাপাশি পোকামাকড় ও বিভিন্ন ছোট প্রাণী খেয়ে খাদ্যশৃঙ্খলের অংশ হিসেবে পরিবেশে ভূমিকা রাখে।

তাই কাকের উপস্থিতি কমে গেলে স্থানীয় বাস্তুতন্ত্রে কী ধরনের প্রভাব পড়তে পারে, সেটিও পর্যবেক্ষণ করা প্রয়োজন। কারণ পাখির সংখ্যা ও বিচরণে পরিবর্তন অনেক সময় পরিবেশের সামগ্রিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিতে পারে।

কাক রক্ষায় প্রয়োজন সচেতনতা ও গবেষণা:

কাকসহ দেশীয় পাখির আবাসস্থল রক্ষায় পরিকল্পিতভাবে গাছ লাগানো, পুরোনো গাছ সংরক্ষণ, জলাভূমি ও সবুজ জায়গা রক্ষা এবং বর্জ্যের সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা জরুরি। পাশাপাশি বিষাক্ত রাসায়নিক ও কীটনাশকের অনিয়ন্ত্রিত ব্যবহার কমানো এবং পাখির বাসা ও ছানা ধ্বংস করা থেকে বিরত থাকতে হবে।

একই সঙ্গে শহর ও গ্রামাঞ্চলে কাকসহ পরিচিত পাখিদের সংখ্যা, বিচরণক্ষেত্র ও প্রজনন পরিস্থিতি নিয়ে নিয়মিত জরিপ পরিচালনা করা প্রয়োজন। পরিবেশবিদ, পাখি বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্ট সরকারি প্রতিষ্ঠান সমন্বিতভাবে কাজ করলে কাকের বর্তমান অবস্থা এবং সম্ভাব্য সংকট সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণা পাওয়া সম্ভব হবে।

শেষ কথা:

কাকের কা কা শব্দ, বাড়ির উঠানে খাবারের সন্ধানে ঘুরে বেড়ানো কিংবা গাছের ডালে দল বেঁধে বসে থাকার দৃশ্য- এসবই আমাদের চেনা প্রকৃতির অংশ। সেই পরিচিত দৃশ্য কোথাও কোথাও কমে যাওয়ার অনুভূতি হয়তো নিছক স্মৃতির সঙ্গে বর্তমানের তুলনা; আবার এর পেছনে পরিবেশগত পরিবর্তনের বাস্তব প্রভাবও থাকতে পারে।

কাক সত্যিই কমে যাচ্ছে কি না, তা জানতে প্রয়োজন নির্ভরযোগ্য তথ্য। তবে কাকের আবাসস্থল ও প্রাকৃতিক পরিবেশ রক্ষা করা যে জরুরি, তা নিয়ে সন্দেহ নেই। চিরচেনা এই পাখিটির উপস্থিতি ধরে রাখতে হলে গাছপালা সংরক্ষণ, দূষণ নিয়ন্ত্রণ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষায় এখনই সচেতন হতে হবে। কারণ প্রকৃতির ছোট-বড় প্রতিটি প্রাণীই পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষায় কোনো না কোনো ভূমিকা পালন করে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *