সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী: এক আজন্ম সংগ্রামীর মহাকাব্য

মজলুম জননেতা মাওলানা ভাসানী: এক আজন্ম সংগ্রামীর মহাকাব্য

বাংলার আকাশ-বাতাস, নদী-মাটি আর প্রান্তিক মানুষের অধিকার আদায়ের লড়াইয়ে যে নামটি চিরস্মরণীয়, তিনি হলেন মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী। ব্রিটিশবিরোধী আন্দোলন থেকে শুরু করে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামের প্রাক্কাল, প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে তিনি ছিলেন শোষিত মানুষের বজ্রকণ্ঠ। আজ আমরা ফিরে দেখি এই মহান নেতার বর্ণাঢ্য জীবনের নানা দিক।

মাওলানা ভাসানী ১৮৮০ সালের ১২ ডিসেম্বর সিরাজগঞ্জ জেলার ধানগড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার পিতার নাম হাজী শরাফত আলী খান এবং মাতার নাম মোসাম্মৎ বেগম। অল্প বয়সেই তিনি এতিম হন, প্রায় ছয় বছর বয়সে পিতাকে এবং বারো বছর বয়সে মাতাকে হারান। পরে আত্মীয়-স্বজনের তত্ত্বাবধানে তার প্রাথমিক শিক্ষা শুরু হয়।

প্রাথমিকভাবে স্থানীয় মাদ্রাসায় পড়াশোনার পর তিনি ভারতের দেওবন্দ-এর দারুল উলুমে উচ্চতর শিক্ষা গ্রহণ করেন। সেখানে তিনি মাওলানা মাহমুদুল হাসান-এর সান্নিধ্যে আসেন, যা তার রাজনৈতিক ও দেশপ্রেমিক চেতনার বিকাশে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। ধর্মীয় শিক্ষার পাশাপাশি তিনি সাম্রাজ্যবাদবিরোধী আন্দোলনের আদর্শে দীক্ষিত হন।

আসামে কৃষক আন্দোলনের সময় ব্রহ্মপুত্র নদের চরে (ভাসান চর) বসবাস ও আন্দোলন পরিচালনার কারণে তিনি ‘ভাসানী’ নামে পরিচিতি লাভ করেন। এটি কোনো আনুষ্ঠানিক উপাধি নয়, বরং জনগণের দেওয়া পরিচয়।

তিনি ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস-এ যোগ দিয়ে খেলাফত ও অসহযোগ আন্দোলনে অংশগ্রহণ করেন। আসামে ‘লাইন প্রথা’র বিরুদ্ধে তার নেতৃত্ব ছিল ঐতিহাসিক।
১৯৪৯ সালের ২৩ জুন ঢাকার রোজ গার্ডেনে তার সভাপতিত্বে প্রতিষ্ঠিত হয় আওয়ামী মুসলিম লীগ, যার তিনি প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি।

১৯৫৭ সালে টাঙ্গাইলের কাগমারীতে অনুষ্ঠিত ঐতিহাসিক সম্মেলনে তিনি পশ্চিম পাকিস্তানের প্রতি ‘আসসালামু আলাইকুম’ উচ্চারণের মাধ্যমে রাজনৈতিক বিচ্ছেদের ইঙ্গিত দেন, যা পরবর্তীকালে বাঙালির স্বাধিকার আন্দোলনে গুরুত্বপূর্ণ প্রতীক হয়ে ওঠে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ভারতে অবস্থান করেন এবং প্রবাসী সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করেন। যদিও আনুষ্ঠানিকভাবে “উপদেষ্টা পরিষদের চেয়ারম্যান” পদে ছিলেন না, তবুও তিনি আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে বাংলাদেশের পক্ষে জনমত গঠনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখেন।

তার প্রাপ্তি ছিল জনগণের ভালোবাসা। উল্লেখযোগ্য অবদানসমূহ:

  • কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব ও শোষণের বিরুদ্ধে সংগ্রাম
  • ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি (ন্যাপ) প্রতিষ্ঠা
  • ১৯৭৬ সালের ঐতিহাসিক ফারাক্কা লং মার্চের নেতৃত্ব
  • শিক্ষা বিস্তারে ভূমিকা (উল্লেখ্য, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় তার নামে প্রতিষ্ঠিত, তিনি নিজে এটি প্রতিষ্ঠা করেননি)

তিনি ছিলেন অত্যন্ত সাদাসিধে জীবনযাপনের প্রতীক। লুঙ্গি-পাঞ্জাবি ছিল তার নিত্য পোশাক, এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে তার নিবিড় সম্পর্কই তাকে “মজলুম জননেতা” উপাধিতে ভূষিত করে।

১৯৭৬ সালের ১৭ নভেম্বর তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাকে টাঙ্গাইলের সন্তোষে সমাহিত করা হয়। তার মৃত্যুতে সারাদেশে শোকের ছায়া নেমে আসে।

মাওলানা ভাসানী ছিলেন নিপীড়িত মানুষের প্রতীক। তার আপসহীন সংগ্রাম, মানবিকতা এবং রাজনৈতিক সততা আজও তাকে মানুষের হৃদয়ে অম্লান করে রেখেছে।

মাওলানা ভাসানী কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি আদর্শ, একটি সংগ্রামের নাম। তার জীবন ও দর্শন আজও প্রাসঙ্গিক, বিশেষ করে সামাজিক ন্যায়বিচার ও গণমানুষের অধিকারের প্রশ্নে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *