সর্বশেষ :
20 Oct 2026, Tue

প্রবাস জীবনের কষ্টে উপার্জিত কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে অন্যত্র বিয়ে বসার অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে

প্রবাস জীবনের কষ্টে উপার্জিত কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে অন্যত্র বিয়ে বসার অভিযোগ স্ত্রীর বিরুদ্ধে

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রবাস জীবনের কষ্টে উপার্জিত নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে ১৪ বছরের সংসার ছেড়ে স্ত্রী অন্যত্র বিয়ে করায় স্থানীয় চেয়ারম্যান, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ ও সালিশানদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরেও কোনো বিচার না পাওয়ায় থামছে না দুবাইপ্রবাসী আবু কালামের কান্না। একদিকে স্ত্রী হারানোর বেদনা, অন্যদিকে টাকা-পয়সাসহ সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব হওয়ার শোকে তিনি ভেঙে পড়েছেন।

প্রবাসী মো. আবু কালাম (৪৪) কিশোরগঞ্জ জেলার কুলিয়ারচর উপজেলার ভাটি জগৎচর গ্রামের মৃত চান্দু মিয়া ও মৃত মোছা. জামেনা বেগম দম্পতির ছেলে।

আবু কালাম গত ১৩ মে বুধবার দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের কাছে কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ২০০৭ সালে আর্থিক স্বচ্ছলতার আশায় তিনি দুবাইয়ে পাড়ি জমান। প্রবাসে যাওয়ার আগে পার্শ্ববর্তী জাফরাবাদ গ্রামের মো. মেরাজ আলী শাহের কন্যা মোছা. তানজিনা আক্তারের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে। পরে দেশে ফিরে পারিবারিকভাবে ২০১৩ সালের ৪ অক্টোবর রেজিস্ট্রি কাবিনমূলে বিয়ে করেন তারা।

প্রবাসী আবু কালামের দাবি, বিয়ের পর প্রায় ১০ বছর তাদের দাম্পত্য জীবন স্বাভাবিক ছিল। এই ১০ বছরে তাদের কোনো সন্তান হয়নি। তিনি অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন প্রবাসে থেকে উপার্জিত অর্থ স্ত্রী তানজিনা আক্তারের কাছে বিশ্বাসের ভিত্তিতে সংরক্ষণ করে রেখেছিলেন।

তার ভাষ্য অনুযায়ী, স্থানীয় জাফরাবাদ মোড়ে একটি জায়গা কেনার জন্য তিনি প্রায় ২৬ লাখ টাকা এবং রেজিস্ট্রিসহ আনুষঙ্গিক খরচের জন্য আরও ৪ লাখ টাকা স্ত্রী তানজিনা আক্তারের কাছে পাঠান। জায়গাটি তার নামে রেজিস্ট্রি হওয়ার কথা থাকলেও পরে সেটি প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে তানজিনা আক্তার নিজের নামে রেজিস্ট্রি করে নেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। এছাড়া ওই জায়গায় মাটি ভরাট ও দোকান নির্মাণের জন্য আরও প্রায় ৩০ লাখ টাকা কয়েক দফায় পাঠানো হয়েছে বলেও দাবি তার। অপরদিকে, তিনি আরও বলেন, প্রবাস জীবনের উপার্জিত অর্থ দিয়ে স্ত্রীর জন্য প্রায় ১৫ ভরি স্বর্ণালংকার কিনে দেন।

এছাড়া পারিবারিক প্রয়োজনের কথা বলে তার কাছ থেকে স্ত্রীর বাবা মো. মেরাজ আলী শাহ ও বড় ভাই সুজন ৬ থেকে ৭ লাখ টাকা নিয়েছেন বলেও জানান আবু কালাম।

প্রবাসী আবু কালামের অভিযোগ, প্রায় এক বছর আগে তার হোয়াটসঅ্যাপে এফিডেভিটের মাধ্যমে ডিভোর্সের এক সেট কাগজ পাঠান স্ত্রী তানজিনা আক্তার। যদিও এফিডেভিটটি এরও প্রায় এক বছর আগে করা হয়েছিল। এতদিন তা গোপন রেখে সাংসারিক প্রয়োজনে তার কাছ থেকে খরচ বাবদ নিয়মিত টাকা নিয়েছেন তানজিনা। এফিডেভিটের কাগজ পেয়ে ছুটিতে দুবাই থেকে বাড়ি আসার পর তিনি জানতে পারেন, দীর্ঘ ১৯ বছরের প্রবাস জীবনের কষ্টে উপার্জিত নগদ টাকা, স্বর্ণালংকার ও স্থাবর-অস্থাবর সম্পদসহ প্রায় এক কোটি টাকার সম্পদ আত্মসাৎ করে ১৪ বছরের সংসার ছেড়ে স্ত্রী তানজিনা আক্তার অন্যত্র বিয়ে করেছেন। বর্তমানে তানজিনা আক্তার অন্তঃসত্ত্বা বলেও জানতে পারেন। স্থানীয় ইউনিয়ন পরিষদের প্যানেল চেয়ারম্যান বরাবর অভিযোগ করে এবং বিভিন্নজনের দ্বারস্থ হয়েও এর কোনো বিচার পাননি বলে দাবি তার।

সবকিছু হারিয়ে নিঃস্ব এতিম আবু কালাম তারেক রহমান, স্থানীয় সংসদ সদস্য এবং বাংলাদেশ পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়-এর প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমসহ প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেছেন। একই সঙ্গে তার সহায়-সম্পত্তি ও টাকা-পয়সা উদ্ধার করে দেওয়ার জন্য আবেদন জানান এবং প্রবাসী ভাইদের কাছে সহযোগিতার হাত বাড়ান।

অন্যদিকে, গত ১৩ মে বুধবার দুপুরে মোছা. তানজিনা আক্তার (৩৩) এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এ প্রতিনিধিকে বলেন, আমার বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ আনা হয়েছে, সেগুলো সত্য নয়। আমার সঙ্গে ওর কোনো মনোমালিন্য ছিল না। ওর শারীরিক সমস্যার কারণে ১৪ বছরের সংসার জীবনে আমাদের কোনো সন্তান হয়নি। এ বিষয়ে ওর ডাক্তারি পরীক্ষার কাগজপত্র আছে। ওকে বারবার বলার পরও ও বিদেশ থেকে আসেনি। তো সারাবছর আমি কি বাবার বাড়িতে পড়ে থাকব? এই চিন্তা-ভাবনা করেই আমি তাকে ডিভোর্স দিয়েছি।

তিনি আরও বলেন, আমার বড় বড় রোগ আছে। আমার লিভারে সমস্যা, চর্বি ও পানি জমেছে। আমার বাবা চিকিৎসা করান। সারাবছর কি আমার বাবা চিকিৎসা করাবেন? আমার সন্তান হয় না, এছাড়া ও আমার খোঁজখবর নেয় না, এই দুটি কারণেই আমি তাকে ডিভোর্স দিয়েছি।

তানজিনা আক্তার আরও দাবি করেন, ওর টাকা দিয়ে তিনটি দলিলের মাধ্যমে ওর নামে জায়গা কিনে দিয়েছি। এছাড়া আমার জমানো টাকা, স্বর্ণালংকার বিক্রি করে ও আমার বাবার দেওয়া টাকা দিয়ে জাফরাবাদ মোড়ে আমার নামে একটি জায়গা কিনেছি। ওকে তালাক দিয়ে প্রায় এক বছর আগে ঢাকার গোলাপবাগ এলাকার সুব্রতের ছেলে সুমন (৩৫)-কে আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে সংসার করছি। আমি বর্তমানে ৮ মাসের অন্তঃসত্ত্বা। ও যদি বেশি বাড়াবাড়ি করে, তাহলে ওর নামে আমি মামলা করতে বাধ্য হব।

অপরদিকে, ২০২৪ সালের ২৭ জুন তারিখে ক্রমিক নং ১৬৫৮ মূলে Notary Public of Bangladesh-এর মাধ্যমে স্ত্রী কর্তৃক স্বামীকে তালাক সংক্রান্ত এফিডেভিটে মোছা. তানজিনা আক্তার উল্লেখ করেন, মো. আবু কালামকে বিবাহ করার পর স্বামী-স্ত্রী হিসেবে সংসার করার সময় তাদের মধ্যে মনের মিল ছিল না এবং প্রায়ই ঝগড়া-বিবাদ হতো। অনেক চেষ্টা করেও মিলমিশ না হওয়ায় ভবিষ্যতে সুখ-শান্তির জন্য তিনি স্বামী আবু কালামের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করার সিদ্ধান্ত নিয়ে তাকে তালাক দেন। তবে স্বামী আবু কালামকে নিয়ে তানজিনা আক্তারের দুই ধরনের বক্তব্যে বিষয়টি নিয়ে বিভ্রান্তির সৃষ্টি হয়েছে।

জানা যায়, সরকারি আইন অনুযায়ী একজন স্ত্রী শুধুমাত্র তখনই স্বামীকে তালাক দিতে পারেন, যখন কাবিননামার (নিকাহনামা) ১৮ নম্বর কলামে স্বামী স্ত্রীকে তালাক প্রদানের ক্ষমতা অর্পণ করে থাকেন। এফিডেভিট কেবল তালাকের প্রামাণ্য দলিল হিসেবে কাজ করতে পারে, তবে আইন অনুযায়ী নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক নিবন্ধন করা বৈধ নয়। কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামে স্ত্রী তালাকের অধিকার পেলে, তিনি স্বামীর মতোই তালাক দিতে পারেন; অন্যথায় নয়। তালাকের নোটিশ স্বামী ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় চেয়ারম্যান বরাবর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পাঠাতে হয়। নোটিশ প্রাপ্তির ৯০ দিন পর তালাক কার্যকর হয়। শুধু এফিডেভিট করেই কাজ শেষ নয়; আইন অনুযায়ী নিকাহ রেজিস্ট্রি অফিসে তালাক নিবন্ধনও বাধ্যতামূলক।

যেহেতু আইন অনুযায়ী নোটারি পাবলিকের মাধ্যমে বিয়ে বা তালাক নিবন্ধন করা নিষিদ্ধ, সে হিসেবে তাদের বৈবাহিক কাবিননামার ১৮ নম্বর কলামের তথ্য অনুসরণ না করে নিয়মবহির্ভূত এফিডেভিটের মাধ্যমে তানজিনা আক্তারের দেওয়া তালাকের নোটিশ যদি স্বামী আবু কালাম ও সংশ্লিষ্ট স্থানীয় চেয়ারম্যান বরাবর রেজিস্ট্রি ডাকযোগে পৌঁছেনি, তাহলে এ তালাক বা পরবর্তী দ্বিতীয় বিয়ে কতটুকু বৈধ- সেটিই এখন প্রশ্ন।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *