সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

প্রবাসীর লড়াই, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাক

প্রবাসীর লড়াই, প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির ফারাক

আমাদের দেশের অর্থনীতির অন্যতম স্তম্ভ হলেন প্রবাসীরা। মাথার ঘাম পায়ে ফেলে, শত প্রতিকূলতার মধ্যেও নিরন্তর কাজ করে তারা দেশের অর্থনীতিকে সচল রাখেন। কিন্তু জীবনের শেষবেলায় এসে যখন তারা দেশে ফেরেন, তখন তাদের প্রত্যাশা আর প্রাপ্তির মধ্যে এক বিশাল ফারাক দেখতে পাওয়া যায়। প্রশ্ন হলো, প্রবাস জীবন দিয়ে তারা আসলে কী চান? পরিবার ও সমাজের কাছে তাদের পাওনাটা কি শুধু অবহেলা আর অপমান?

 

একজন প্রবাসী যখন দিনের পর দিন পরিবার-পরিজন থেকে দূরে থাকেন, তখন তার একমাত্র লক্ষ্য থাকে তাদের মুখে হাসি ফোটানো। তিনি বিদেশে থেকে যে অর্থ উপার্জন করেন, তা দিয়ে পরিবারের প্রয়োজন মেটান, সন্তানদের ভবিষ্যৎ গড়েন, ভাই-বোনের বিয়ে দেন, বাবা-মায়ের চিকিৎসা করান। এই ত্যাগ ও ভালোবাসার বিনিময়ে একজন প্রবাসী মূলত কিছু জিনিস প্রত্যাশা করেন:

  • সম্মান ও স্বীকৃতি: তিনি আশা করেন তার পরিবার, আত্মীয়স্বজন এবং সমাজ তার এই কঠোর পরিশ্রম এবং ত্যাগের জন্য তাকে সম্মান করবে। তার উপার্জিত অর্থ দিয়ে গড়ে তোলা বাড়ি, গাড়ি বা ব্যবসার চেয়েও তিনি বেশি চান তার অবদানকে স্বীকৃতি দেওয়া হোক।
  • ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন: জীবনের মূল্যবান সময় দেশের বাইরে কাটানোর পর তিনি পরিবারে ফিরে ভালোবাসা ও মানসিক সমর্থন চান। তিনি চান তার পরিবার তার ত্যাগকে বুঝবে এবং তাকে মানসিকভাবে আগলে রাখবে।
  • নিরাপত্তা ও ভরসা: অনেকেই প্রবাসে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠিয়ে প্রতারণার শিকার হন। তারা চান তাদের উপার্জিত অর্থ যেন সুরক্ষিত থাকে এবং পরিবার তাদের সঙ্গে বিশ্বাসভঙ্গ না করে।

 

দুর্ভাগ্যবশত, অনেক ক্ষেত্রেই দেখা যায় যে প্রবাসীর জীবনভর সংগ্রামের পর তার প্রাপ্য সম্মান জোটে না। বরং উল্টো তাকে অনেক সময় অবহেলা ও অপমানের শিকার হতে হয়। তার পাঠানো টাকায় গড়ে ওঠা সংসারেই তার মতামতকে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। অনেক ক্ষেত্রে পরিবার তার উপার্জনের উৎসকে ‘এটিএম মেশিন’ হিসেবে দেখে। টাকা পাঠানো বন্ধ হলেই শুরু হয় অবহেলা।

 

এর পেছনে বেশ কিছু কারণ রয়েছে। কিছু ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রবাসীর অনুপস্থিতিতে পরিবারের অন্য সদস্যরা তার উপার্জিত অর্থে নিজেদের একচ্ছত্র অধিকার প্রতিষ্ঠা করে ফেলে। আবার অনেকে প্রবাস জীবনের কষ্টকে সেভাবে মূল্যায়ন করতে পারেন না। তারা মনে করেন, প্রবাস জীবন মানেই কেবল টাকা উপার্জন। কিন্তু এর পেছনে লুকিয়ে থাকা একাকিত্ব, শারীরিক ও মানসিক চাপ, রোগ-শোক—এসব বিষয় তারা উপলব্ধি করতে পারেন না।

 

যদি শেষ পর্যন্ত অবহেলা আর অপমানই প্রাপ্য হয়, তাহলে একজন প্রবাসী কেন দিনের পর দিন নিজের সব আনন্দ বিসর্জন দিয়ে দেশের বাইরে পড়ে থাকেন? এর প্রধান কারণ, তাদের মনের গভীরে লুকিয়ে থাকা এক প্রবল ভালোবাসা—পরিবারের প্রতি ভালোবাসা, প্রিয়জনের প্রতি ভালোবাসা। এই ভালোবাসা তাদের সামনে এগিয়ে যাওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়।

আমাদের সমাজ এবং পরিবারের উচিত, প্রবাসীদের এই নীরব ত্যাগকে সম্মান জানানো। তাদের পাঠানো অর্থের চেয়েও বেশি গুরুত্ব দেওয়া উচিত তাদের মানসিক সুস্থতা এবং সম্মানকে। তাদের বুঝতে দেওয়া উচিত যে তারা একা নন, তাদের পরিশ্রমকে আমরা মূল্য দেই। একটি সুন্দর সমাজের জন্য এই সম্মান ও স্বীকৃতি অপরিহার্য।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *