‘মেম্বার প্রার্থিতা নিয়ে পারভেজ মিয়ার প্রতিহিংসা ও ষড়যন্ত্রের শিকার আমি ও আমার পরিবার’
মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার উছমানপুর ইউনিয়নের খৈলাজুরী গ্রামের মৃত রমজান আলীর ছেলে সৌদি প্রবাসী মো. কাদির মিয়া তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে প্রকাশিত ও প্রচারিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেছেন।
সৌদি আরব থেকে মুঠোফোনে মো. কাদির মিয়া জানান, গত ১৮ অক্টোবর ২০২৬ খ্রিষ্টাব্দ, রোববার বিকেল ৫টা ৩৭ মিনিটে অনলাইন নিউজ পোর্টাল শাপলা নিউজে (saplanews24.com) ‘প্রকাশিত সংবাদের প্রতিবাদে সংবাদ সম্মেলন’ শিরোনামসহ বিভিন্ন শিরোনামে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকের বিভিন্ন পেজে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে যেসব সংবাদ ও ভিডিও প্রচার ও প্রকাশ করা হয়েছে, তা তাঁর দৃষ্টিগোচর হয়েছে।
এসব সংবাদে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে যেসব অভিযোগ করা হয়েছে, সেগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন কাদির মিয়া। তিনি বলেন, আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ডে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী একই গ্রামের ইউসুফ আলীর ছেলে ও কুলিয়ারচর বাজারের মোবাইল ফোন ব্যবসায়ী পারভেজ মিয়া (৩৪) তাঁকে নির্বাচনী মাঠ থেকে সরাতে না পেরে প্রতিহিংসাপরায়ণ হয়ে উঠেছেন। তাই সৌদি আরবে লোক পাঠানোর বিষয়টিকে ইস্যু করে ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে একটি প্রভাবশালী মহলের সহযোগিতায় এলাকার কয়েকটি প্রবাসী পরিবারের সরলতাকে কাজে লাগিয়ে তাঁদের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করে পারভেজ মিয়া তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছেন।
কাদির মিয়ার দাবি, দেশের বাড়ি পুরুষশূন্য থাকায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে এবং তাঁর বৃদ্ধ মাকে জেল খাটানো হয়েছে। প্রতিপক্ষের লোকজন তাঁর স্ত্রী ও সন্তানদের প্রাণনাশের হুমকি-ধমকি দিয়ে ভিটেমাটি ছাড়তে বাধ্য করেছেন। বর্তমানে তাঁর ৯ বছর বয়সী শিশু আদিবা তাবাসসুম ও ১৩ বছর বয়সী মাহমুদুল হাসান ওরফে রাফির শিক্ষাজীবন নিয়ে চরম অনিশ্চয়তা দেখা দিয়েছে। আদিবা তাবাসসুম নাজিরদিঘী সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্রী এবং মাহমুদুল হাসান রাফি কুলিয়ারচর উদয়ন কিন্ডারগার্টেনের ষষ্ঠ শ্রেণির ছাত্র।
শুধু তা-ই নয়, পারভেজ মিয়ার সহযোগী মো. কাইয়ুম মিয়া রাতের আঁধারে তাঁর পুরুষশূন্য বাড়িতে গিয়ে তাঁর মা ও স্ত্রীকে ভয়ভীতি দেখিয়ে তাঁদের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছেন বলে অভিযোগ করেন কাদির মিয়া। এ ঘটনার ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
গত ১৮ অক্টোবর, রোববার বিকেলে প্রতিপক্ষের মেম্বার প্রার্থী মো. পারভেজ মিয়া স্থানীয় নাজিরদিঘী বাজারে সাংবাদিকদের নিয়ে সংবাদ সম্মেলন করে কাদির মিয়া ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করেছেন বলে দাবি করেন কাদির মিয়া। তিনি বলেন, সংবাদ সম্মেলনে পারভেজ মিয়ার সহযোগী মো. কাইয়ুম মিয়া তাঁর বৃদ্ধ মা আতর বানু ও স্ত্রীকে নিয়ে অশালীন বক্তব্য দিয়েছেন এবং হুমকি দিয়েছেন। আতর বানু একাধারে ১৪ বছর উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদের সংরক্ষিত নারী সদস্য হিসেবে সৎ ও নিষ্ঠার সঙ্গে দায়িত্ব পালন করেছেন বলে জানান তিনি। এ ঘটনার একটি ভিডিও ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও দাবি করেন কাদির মিয়া।
কাদির মিয়া আরও বলেন, সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে আসার পর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেম্বার পদপ্রার্থী পারভেজ মিয়ার চাচা মো. জাকির মিয়াসহ তাঁদের এলাকা ও পার্শ্ববর্তী এলাকার মো. ইয়াছিন মিয়া, মো. মামুন মিয়া, মো. মহসিন মিয়া, মো. জুনাইদ মিয়া, মো. আরমান মিয়া, মো. তরিকুল, মো. কাজল মিয়া, মো. তারেক মিয়া, মো. নাছির মিয়া, মো. মুন্না মিয়া, মো. ইকবাল মিয়া, মো. ইসাদ মিয়া, মো. মোস্তাকিম ও মো. আরমানসহ অন্তত ১৫ জন বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সৌদি আরব যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান।
পরে তাঁর সহযোগিতায় তাঁরা ঢাকার বনানীতে অবস্থিত সরকার অনুমোদিত একটি এজেন্সির (ফাদার ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ লিমিটেড, লাইসেন্স নম্বর-২০৫১) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা এজেন্সি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিজেরা কথা বলে নিজ নিজ দায়িত্বে টাকা-পয়সার লেনদেন করেন। নিয়ম মেনে ও শর্ত সাপেক্ষে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিন ধাপে ওই এজেন্সির মাধ্যমে তাঁরা সৌদি আরব যান। পরে তিনি জানতে পারেন, সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী নির্ধারিত সময়ের মধ্যেই তাঁরা ফিউচার মেকার্স লিমিটেড কোম্পানির নামে আকামা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনের আকামার মেয়াদ ১৭ অক্টোবর শেষ হয়েছে এবং একজনের আকামার মেয়াদ আগামী ২৪ অক্টোবর শেষ হবে বলে দাবি করেন তিনি।
কাদির মিয়ার দাবি, সৌদি আরবে যাওয়ার পর আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মো. তরিকুল, মো. কাজল মিয়া, মো. তারেক মিয়া, মো. নাছির মিয়া, মো. মুন্না মিয়া, মো. ইকবাল মিয়া, মো. ইসাদ মিয়া, মো. মোস্তাকিম ও মো. আরমানসহ নয়জন বেশি আয়ের আশায় কোম্পানির কাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
কাদির মিয়া বলেন, আমি কোনো দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগী নই। কারও টাকা আত্মসাতের প্রশ্নই ওঠে না। প্রতিপক্ষের দাবি অনুযায়ী, ২৫ থেকে ৩০ জনকে সৌদি আরব পাঠিয়ে তাঁদের কাছ থেকে প্রায় দেড় কোটি টাকা আত্মসাৎ করেছি- এ অভিযোগ সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন।
তিনি চ্যালেঞ্জ জানিয়ে বলেন, ওই ২৫ থেকে ৩০ জন প্রবাসীকে একই সময়ে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরিয়ে আনার প্রস্তাব দিচ্ছেন। তিনি নিজেও একই সময়ে ছুটি নিয়ে দেশে আসবেন। তাঁরা দেশে এসে তাঁর সঙ্গে টাকা লেনদেনের কোনো প্রমাণ দিতে পারলে তিনি সব টাকা ফেরত দেবেন। আর যদি এমন কোনো প্রমাণ দিতে না পারেন, তাহলে তাঁকে ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের নির্যাতন, হয়রানি ও মানহানির ঘটনায় এলাকার সুশীল সমাজ কী পদক্ষেপ নেয়, তা দেখার বিষয়। সঠিক ঘটনা না জেনে অনেকেই তাঁদের অহেতুক অপরাধী হিসেবে আখ্যায়িত করছেন বলেও অভিযোগ করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, মেম্বার প্রার্থী হওয়াকে কেন্দ্র করে গত ২৩ আগস্ট দুপুর ১টা ৩৭ মিনিটে পারভেজ মিয়ার পক্ষের ফুল নাহার ও অজুফা বেগম লাঠি নিয়ে তাঁর বসতবাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করে অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করেন এবং তাঁর দুই শিশুসন্তানকে হত্যার হুমকি দেন। এ সময় তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বসরির হাত থেকে আনুমানিক দেড় লাখ টাকা মূল্যের একটি আইফোন কেড়ে নিয়ে ফুল নাহার ভেঙে ফেলেন বলে অভিযোগ করেন তিনি। ঘটনার সম্পূর্ণ চিত্র সিসিটিভি ক্যামেরায় ধারণ করা রয়েছে বলেও জানান কাদির মিয়া।
এখানেই শেষ নয়, স্কুলে যাওয়া-আসার পথে তাঁর দুই শিশুসন্তানকে নিয়মিত পথরোধ করে হত্যা ও গুম করার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেন তিনি। তাঁর দাবি, পারভেজ, সেতু মিয়া, ফুল নাহার ও অজুফা বেগম এ হুমকি দিচ্ছেন। ফলে আতঙ্কে শিশুরা স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।
অব্যাহত হুমকি-ধমকির কারণে তাঁর স্ত্রী রাবেয়া বসরি বাদী হয়ে গত ৭ অক্টোবর আফজাল মিয়া (২৮), শিপা বেগম (২৩) ও মোছা. জোসনা বেগম (২৮) নামের তিনজনের বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেন। জিডি নম্বর-৩১৫।
এর আগে রাবেয়া বসরি বাদী হয়ে গত ২২ অক্টোবর কিশোরগঞ্জের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট আদালত-১-এ ফৌজদারি কার্যবিধির ১০৭/১১৪/১১৭(সি) ধারায় পারভেজ মিয়া, সেতু মিয়া, কাইয়ুম মিয়া, ফুল নাহার, অজুফা বেগম ও সেলিনা বেগমের বিরুদ্ধে একটি মামলা দায়ের করেন। মামলার নম্বর-৫৬১।
নিজেদের দোষ আড়াল করতে পারভেজ মিয়া মিথ্যা অপপ্রচার চালানোর উদ্দেশ্যে সংবাদ সম্মেলন করে সাংবাদিকদের কাছে বিভ্রান্তিকর তথ্য দিয়েছেন এবং এর ভিত্তিতে মিথ্যা সংবাদ প্রচার করিয়েছেন বলে দাবি করেন সৌদি প্রবাসী মো. কাদির মিয়া। তিনি প্রকাশিত সংবাদগুলোর তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানান।
অন্যদিকে, ঘটনার অনুসন্ধানে পাওয়া ভুক্তভোগী প্রবাসীদের মধ্যে তরিকুল ইসলাম, তারেক মিয়া, কাজল মিয়া, নাছির মিয়া, ইকবাল মিয়া ও মুন্না মিয়ার পাঠানো ভিডিও বার্তায় ভিন্ন চিত্র দেখা গেছে বলে উল্লেখ করা হয়েছে। ভিডিও বার্তায় তাঁরা ফিউচার মেকার্স লিমিটেড কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করলেও প্রবাসী কাদির মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলেননি। প্রবাসী মুন্না মিয়া যে ব্যক্তির বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁর নাম ‘রানা’- তিনি কাদির মিয়া নন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া মেম্বার প্রার্থী পারভেজ মিয়ার চাচা মো. জাকির মিয়াও বর্তমানে বৈধ আকামা নিয়ে সৌদি আরবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
প্রবাসী ও স্থানীয় সূত্র বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত কাদির মিয়ার বিরুদ্ধে আনা আর্থিক লেনদেন ও প্রতারণার অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হয়নি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

