আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): শারদীয় দুর্গাপূজার টানা পাঁচ দিনের ছুটি শেষে নিজ নিজ কর্মস্থলে ফিরতে শুরু করেছেন পর্যটকেরা। ছুটির শেষ দিন গতকাল শনিবার শ্রীমঙ্গল থেকে বিভিন্ন গন্তব্যে ফেরা মানুষের ভিড় ছিল বাস ও ট্রেনে। অনেকে আগাম টিকিট সংগ্রহ করলেও টিকিট না পেয়ে কিছু যাত্রীকে দাঁড়িয়ে ট্রেনে ভ্রমণ করতে হয়েছে। আজ রোববার থেকে অফিস-আদালত খুলছে। ফলে ছুটি কাটিয়ে কর্মজীবী মানুষের কর্মস্থলে ফেরার ব্যস্ততা বেড়েছে।
অন্যদিকে, ছুটির পাঁচ দিন পর্যটকদের পদচারণে মুখর ছিল চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গল। প্রকৃতির সান্নিধ্যে অবসর কাটাতে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে এখানে ছুটে আসেন ভ্রমণপিপাসু মানুষ। সবুজ চা-বাগান, পাহাড়ি টিলা, বনাঞ্চল, লেক ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির টানে পর্যটকদের উপস্থিতিতে শহরের পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে ছিল উৎসবমুখর পরিবেশ। এ সময়ে শুধু লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যান থেকেই ৫ লাখ ৫২ হাজার ১৭২ টাকা রাজস্ব আয় হয়েছে।
গত ২০ অক্টোবর থেকে পর্যটকদের আগমন বাড়তে থাকায় শ্রীমঙ্গলের হোটেল, রিসোর্ট, কটেজ, বাংলো ও গেস্টহাউসগুলোতে ছিল ব্যস্ততা। ছুটি শুরুর আগেই অনেক আবাসন প্রতিষ্ঠানের কক্ষ অগ্রিম বুকিং হয়ে যায়। স্থানীয় হোটেল মালিক সমিতির কয়েকজন সদস্য জানান, ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন জেলার পরিবারগুলো ছুটি কাটানোর জন্য শ্রীমঙ্গলকে বেছে নেয়। চা-বাগানের সবুজ বিস্তৃতি, পাহাড়ি টিলার নৈসর্গিক সৌন্দর্য এবং শান্ত-স্নিগ্ধ পরিবেশ এ অঞ্চলের পর্যটনের প্রধান আকর্ষণ।
চা-বাগান ও বনাঞ্চলে পর্যটকদের ভিড়:
ছুটির দিনগুলোতে শ্রীমঙ্গলের বিস্তীর্ণ চা-বাগান ছিল পর্যটকদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ। সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বাগানের আঁকাবাঁকা পথে দেখা গেছে ভ্রমণপিপাসু মানুষের আনাগোনা। কেউ পরিবার-পরিজন নিয়ে ঘুরেছেন চা-বাগানের ভেতরের পথে, কেউ সবুজ প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করেছেন, আবার কেউ ছবি তুলে ছুটির স্মৃতি ধরে রেখেছেন।
প্রকৃতির কাছাকাছি সময় কাটানোর জন্য পর্যটকদের বড় একটি অংশ ছুটে যান লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে। বনের জীববৈচিত্র্য, সবুজ গাছপালা ও প্রাকৃতিক পরিবেশ উপভোগ করতে সেখানে ভিড় করেন দেশি পর্যটকেরা। লাউয়াছড়ার পাশাপাশি আশপাশের চা-বাগানেও ছিল দর্শনার্থীদের আনাগোনা।
শুধু চা-বাগান ও বনাঞ্চল নয়, শ্রীমঙ্গলের অন্যান্য দর্শনীয় স্থানেও পর্যটকদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। বাংলাদেশ চা গবেষণা ইনস্টিটিউট, চা জাদুঘর ও মিনি চিড়িয়াখানা ঘুরে দেখেছেন অনেকে। বিকেলের দিকে বিভিন্ন চা-বাগানের লেকের পাড়েও পর্যটকদের ভিড় দেখা গেছে। এ ছাড়া ঐতিহাসিক ডিনস্টন সিমেট্রি, লাল টিলা এবং মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতিবিজড়িত বধ্যভূমি-৭১ দেখতে যান অনেক দর্শনার্থী।
লাউয়াছড়ায় চার দিনে রাজস্ব আয় ৫ লাখ ৫২ হাজার টাকা:
দুর্গাপূজার ছুটিতে লাউয়াছড়া জাতীয় উদ্যানে পর্যটকদের উপস্থিতির পাশাপাশি রাজস্ব আয়ও ছিল উল্লেখযোগ্য। বন বিভাগের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ২০ থেকে ২৩ অক্টোবর পর্যন্ত চার দিনে উদ্যানে ৫ হাজার ৩২২ জন পর্যটক ভ্রমণ করেছেন। তাঁদের কাছ থেকে এ সময়ে রাজস্ব আয় হয়েছে ৫ লাখ ৫২ হাজার ১৭২ টাকা।
প্রকৃতির প্রতি মানুষের আগ্রহ এবং ছুটির সময়ে বনাঞ্চলভিত্তিক পর্যটনের চাহিদা লাউয়াছড়ায় দর্শনার্থীদের এই উপস্থিতিতে প্রতিফলিত হয়েছে। তবে ২৪ অক্টোবরের পর্যটক ও রাজস্বের হিসাব এ পরিসংখ্যানের অন্তর্ভুক্ত নয়।
নৃগোষ্ঠীর সংস্কৃতিও পর্যটকদের আকর্ষণ:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের পাশাপাশি শ্রীমঙ্গলের বিভিন্ন নৃগোষ্ঠীর জীবনযাত্রা ও সংস্কৃতিও পর্যটকদের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিল। স্থানীয় বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী পোশাক, ঘরবাড়ি, খাবার, হস্তশিল্প ও সাংস্কৃতিক বৈশিষ্ট্য পর্যটকদের সামনে ভিন্নধর্মী অভিজ্ঞতার সুযোগ তৈরি করে। ছুটির সময়ে এসব জনপদ ঘুরে দেখতে আগ্রহ দেখিয়েছেন অনেক ভ্রমণকারী।
শ্রীমঙ্গলের পর্যটনের বিশেষত্ব হলো, এখানে একই ভ্রমণে চা-বাগান, বনাঞ্চল, পাহাড়ি টিলা, ঐতিহাসিক স্থান এবং বিভিন্ন জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতির সঙ্গে পরিচিত হওয়ার সুযোগ রয়েছে। এ বৈচিত্র্যই ভ্রমণপিপাসু মানুষের কাছে অঞ্চলটিকে আকর্ষণীয় করে তুলেছে।
পর্যটকদের আগমনে স্থানীয় ব্যবসায় প্রাণচাঞ্চল্য:
টানা পাঁচ দিনের ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যে ইতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। হোটেল-রিসোর্ট ব্যবসায়ীদের ভাষ্য, এ সময়ে পর্যটকদের আনাগোনা বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের ব্যবসা মোটামুটি ভালো হয়েছে। আবাসন প্রতিষ্ঠানের পাশাপাশি রেস্তোরাঁ, খাবারের দোকান ও অন্যান্য ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও বেড়েছে ব্যস্ততা।
পর্যটকদের যাতায়াতকে কেন্দ্র করে স্থানীয় রিকশা ও অটোরিকশাচালক, চাঁদের গাড়ির চালক, দোকানি এবং রেস্তোরাঁর মালিকেরাও বাড়তি আয়ের সুযোগ পেয়েছেন। পর্যটন খাতের সঙ্গে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যুক্ত এসব মানুষের জীবিকায় ছুটির মৌসুমি পর্যটন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে।
ব্যবসায়ীদের মতে, বড় ছুটি ও উৎসবের সময়ে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লে স্থানীয় অর্থনীতিতে তার প্রভাব পড়ে। আবাসন, পরিবহন, খাবার ও কেনাকাটাসহ বিভিন্ন খাতে অর্থের প্রবাহ বাড়ে। দুর্গাপূজার ছুটিতেও শ্রীমঙ্গলে তার প্রতিফলন দেখা গেছে।
নিরাপত্তায় ছিল বিশেষ ব্যবস্থা:
ছুটিতে পর্যটকদের নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা নিশ্চিত করতে শ্রীমঙ্গল থানা-পুলিশ, পর্যটন পুলিশ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে বিশেষ নিরাপত্তাব্যবস্থা নেওয়া হয়। গুরুত্বপূর্ণ পর্যটনকেন্দ্র ও জনসমাগমপূর্ণ এলাকায় পুলিশি টহল ছিল। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় তৎপরতা অব্যাহত রাখা হয়।
প্রকৃতির অপার সৌন্দর্য, বিস্তীর্ণ চা-বাগান, বনাঞ্চল, পাহাড়ি টিলা ও বৈচিত্র্যময় সংস্কৃতির কারণে শ্রীমঙ্গল দীর্ঘদিন ধরেই দেশের অন্যতম আকর্ষণীয় পর্যটন গন্তব্য। দুর্গাপূজার ছুটিতে পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতি আবারও সেই আকর্ষণের চিত্র তুলে ধরেছে। তাঁদের পদচারণে পাঁচ দিন প্রাণচাঞ্চল্য ছিল শহর ও পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে। ছুটি শেষে পর্যটকেরা ফিরতে শুরু করলেও শ্রীমঙ্গলের প্রকৃতি ও পর্যটননির্ভর জনজীবনে রেখে গেছেন ব্যস্ত সময়ের ছাপ।

