পর্যটন নগরী গড়ার পথে বাধা হতে পারে সিন্ডিকেটের কালো থাবা!
নাটোর জেলা প্রতিনিধি: নাটোরের হালতিবিল। ভরা বর্ষায় পানির উথাল-পাথাল ঢেউ। এই উত্তাল জলরাশিতে পিকনিকের নামে চলছে অশ্লীলতা। বিলে নৌকায় উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে চলছে পিকনিক। এর সঙ্গে নর্তকী দিয়ে চলছে অশ্লীল নৃত্য। ‘মিনি কক্সবাজার’ খ্যাত হালতিবিলে এমন কর্মকাণ্ড নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
নলডাঙ্গা উপজেলার হালতিবিলের ‘মিনি কক্সবাজারে’ চরম অশ্লীলতা নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে দিন দিন ক্ষোভ বাড়ছে। বর্ষায় বিলে পানি বেড়ে কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতের মতো ঢেউ আছড়ে পড়ে। এ সময় ভ্রমণপিপাসু মানুষেরা ছুটে আসেন।
এই সুযোগে প্রেমিক-প্রেমিকারা আপত্তিকর কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হন বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া বিশেষ করে দুপুর ও বিকেলে বখাটেদের আড্ডার জায়গা হয়ে ওঠে এলাকাটি।
হালতিবিলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে বিনোদনপ্রিয় মানুষ নৌকাভ্রমণে আসছেন। কিন্তু বিনোদনের নামে ভাড়া করা ইঞ্জিনচালিত নৌকাগুলোতে চলছে নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ড। নৌকায় প্রেমিক-প্রেমিকাদের জন্য কখনো খোলা, কখনো ছাউনি দেওয়া ব্যবস্থা থাকে। কখনো দু’পাশ কাপড় দিয়ে মুড়িয়ে দেওয়া হয়। ভেতরে চটের বিছানাও থাকে। নির্জনে সময় কাটানোর জন্য এই আবরণের ভেতরে চলে আপত্তিকর কর্মকাণ্ড—এমন অভিযোগ স্থানীয়দের।
প্রিয় মানুষের সঙ্গ পাওয়ার জন্য উঠতি বয়সী অনেকেই এসব নৌকা বেছে নেন। আর এ সুযোগে নৌকার মাঝিরাও অনৈতিক ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। সেখানে মাঝিরা ফেঁদে বসেছেন অন্যরকম ব্যবসা। নৌকা ভাড়া নেওয়া হয় ঘণ্টা হিসেবে। চুক্তি অনুযায়ী ঘণ্টাপ্রতি ভাড়া নির্ধারণ করা হয়। ভাড়ার পাশাপাশি দেওয়া হয় বকশিশও। প্রেমিক যুগল যখন কাপড়ঘেরা বা খোলা নৌকায় সময় কাটান, তখন মাঝিরা নিরাপত্তাকর্মী বা পাহারাদারের ভূমিকা পালন করেন বলে অভিযোগ।
খোলাবাড়িয়া ও নৌকাগুলোতে সকাল থেকেই শুরু হয় জমজমাট আড্ডা, যা চলে সন্ধ্যা পর্যন্ত। বহুদিন ধরেই এ ব্যবসা চলছে বলে স্থানীয়দের অভিযোগ। সহজ-সরল মানুষ পেলেই অনেকেই ফাঁদে পড়ছেন। মাঝিরা ঘাট ছেড়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে জোড়া কোনো ছেলেমেয়ে দেখলেই তাদের পেছনে ছুটে গিয়ে বলেন, ‘আসেন মামা, আমার নৌকায় আসেন।’
হালতিবিলের বিভিন্ন স্থানে নৌকা থামিয়ে এসব কর্মকাণ্ড চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি পিকনিক ও নৌকাভ্রমণের নামে লাউডস্পিকারে অতিরিক্ত উচ্চ শব্দে গান বাজিয়ে শব্দদূষণের মাধ্যমে গণউপদ্রব সৃষ্টি করা হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় ব্যবসায়ীরা বলেন, এসব কর্মকাণ্ড থেমে নেই। অপকর্ম বন্ধে আমাদের চেষ্টা রয়েছে। কিন্তু নৌকার মাঝিরা খুবই চালাক। এসব কর্মকাণ্ড অচিরেই বন্ধ করা প্রয়োজন। এখানে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ বেড়াতে আসেন। কিন্তু কিছু কিছু যুবক-যুবতী আপত্তিকর অবস্থায় অবাধে চলাফেরা করছেন। প্রশাসনের নিষেধাজ্ঞা থাকা সত্ত্বেও দু-একজন সুবিধাবাদী নেতার যোগসাজশে নৌকার মাঝিরা বেশি টাকার লোভে এমন কাজে সহায়তা করছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। চলন্ত নৌযান, খোলাবাড়িয়া পয়েন্টসহ বিভিন্ন স্থানে আপত্তিকর আচরণ করতে দেখা গেছে বলেও তারা জানান।
স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, পরিবার-পরিজন নিয়ে অনেক মানুষ পাটুল ‘মিনি কক্সবাজারে’ বেড়াতে আসেন। নৌভ্রমণ পর্যটকদের অন্যতম আকর্ষণ। কিন্তু নৌযান ও পুরো বিলে শৃঙ্খলা না থাকলে পর্যটন এলাকার পরিবেশ নিয়ে নেতিবাচক ধারণা তৈরি হতে পারে।
নৌভ্রমণের সময় পর্যাপ্ত নজরদারি না থাকায় কেউ কেউ অসামাজিক কর্মকাণ্ডের সুযোগ নিচ্ছেন। এতে পর্যটনকেন্দ্রটির পরিবেশ এবং স্থানীয়দের মধ্যে অসন্তোষ তৈরি হচ্ছে।
স্থানীয়রা পর্যটনকেন্দ্রটিতে প্রশাসনের নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন। একই সঙ্গে নৌযান পরিচালনাকারীদের জন্য আচরণবিধি প্রণয়ন ও শৃঙ্খলা নিশ্চিত করার ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানান তাঁরা।
এদিকে, লক্ষ লক্ষ টাকা লুটে নেওয়ার অভিযোগ উঠেছে পাটুলের সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের কাছে প্রশাসন ও জনগণ অসহায়। সম্প্রতি হালতিবিল পরিদর্শন করে গেছেন পর্যটনমন্ত্রী আফরোজা খানম রিতা এবং হালতিবিলকে পর্যটন নগরী হিসেবে গড়ে তোলার ঘোষণা দিয়েছেন তিনি। এ সময় উপস্থিত ছিলেন জাতীয় সংসদের হুইপ ও নাটোর-২ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট রুহুল কুদ্দুস তালুকদার দুলু, পর্যটন করপোরেশনের চেয়ারম্যান মো. শামমিউজ্জামানসহ বিএনপির নেতৃবৃন্দ।
গত ৩০ জুলাই ‘হালতিবিল সংরক্ষণ ও পর্যটন বিকাশ’ কমিটির সভার সিদ্ধান্তক্রমে হালতিবিলে ঘুরতে আসা পর্যটকদের সুবিধার্থে নৌকার ভাড়া নির্ধারণ করে দেয় উপজেলা প্রশাসন।
কিন্তু হালতিবিলে ভয়াবহ সিন্ডিকেটের কবলে পড়ছেন পর্যটক ও দর্শনার্থীরা- এমন অভিযোগ উঠেছে। সিন্ডিকেটে জড়িত রাঘববোয়ালরা পর্যটক ও দর্শনার্থীদের পকেট থেকে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নিচ্ছেন বলে অভিযোগ স্থানীয়দের।
তাদের অভিযোগ, সিন্ডিকেটের সদস্যরা প্রশাসনসহ কাউকেই তোয়াক্কা করেন না। তারা নিজেদের একটি আলাদা ‘রাজ্য’ গড়ে তুলেছেন। এই সিন্ডিকেট ধীরে ধীরে নষ্ট করে দিচ্ছে দর্শনীয় স্থানটি। প্রতিদিন ক্ষোভ নিয়ে হালতিবিল থেকে ফিরে যাচ্ছেন ভ্রমণপিপাসুরা।
স্থানীয়দের দাবি, এই সিন্ডিকেট বন্ধ করা না গেলে অচিরেই পর্যটক হারাবে হালতিবিল।
এ বিষয়ে নলডাঙ্গা থানার ওসি (তদন্ত) ইব্রাহিম খলিল জানান, হালতিবিলে আমরা পরিচ্ছন্ন পরিবেশ চাই। এ জন্য আমাদের নিয়মিত অভিযান চলছে এবং চলবে।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. আল এমরান খাঁন বলেন, হালতিবিলে অশ্লীলতা বন্ধে প্রশাসন কঠোর অবস্থানে আছে।
নাটোর জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শরীফুল হক বলেন, হালতিবিলে উচ্চস্বরে সাউন্ডবক্স বাজানো ও অশ্লীলতা বন্ধে পুলিশ কঠোর অবস্থানে আছে।

