মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে দিনের বেলায় প্রকাশ্যে দুর্বৃত্তদের হামলায় নির্মমভাবে নিহত জুয়েল মিয়ার বাড়িতে গিয়ে শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের খোঁজখবর নিয়েছেন কুলিয়ারচর উপজেলা বিএনপির প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি সৈয়দ জহিরুল ইসলাম মনি মিয়ার সুযোগ্য সন্তান, উপজেলা ছাত্রদলের প্রতিষ্ঠাকালীন সভাপতি, কিশোরগঞ্জ জেলা ছাত্রদলের সাবেক যুগ্ম আহ্বায়ক, কেন্দ্রীয় ছাত্রদলের সাবেক সদস্য এবং আসন্ন কুলিয়ারচর উপজেলা পরিষদ নির্বাচনে সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সৈয়দ রফিকুল ইসলাম মামুন।
রোববার (১২ জুলাই) বেলা আড়াইটার দিকে তিনি কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে বৃষ্টিতে ভিজে উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামে যান। সেখানে নিহত জুয়েলের কবর জিয়ারত করেন এবং জুয়েলের শোকে কান্নায় ভেঙে পড়া পিতা মো. কুদ্দুস মিয়াকে সান্ত্বনা দেন।
এ সময় তিনি বলেন, “আমাদের প্রিয় নেতা, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরিফুল আলম এমপি মহোদয়ের সঙ্গে কথা বলে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির ব্যবস্থা করা হবে।”
ছেলের শোকে কাতর অটোরিকশাচালক মো. কুদ্দুস মিয়া কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, আমি চাই না, আমার ছেলের মতো কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি হয়রানির শিকার হোক। কারা আমার নিরপরাধ ছেলেকে নির্মমভাবে হত্যা করেছে, তাদের নিশ্চিতভাবে শনাক্ত করেই মামলা দায়ের করা হবে। কারও প্ররোচনায় বা প্রভাবিত হয়ে কোনো নির্দোষ ব্যক্তিকে জড়াব না। যদি কোনো কারণে কুলিয়ারচর থানায় মামলা করতে না পারি, তবে কিশোরগঞ্জ আদালতে মামলা দায়ের করব।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, গত ১০ জুলাই শুক্রবার বিকেলে জুয়েল মিয়া তার এক বন্ধুর ডিমবাহী গাড়িতে চড়ে আগরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে যাচ্ছিলেন। গাড়িটি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের ১০০ গজ পশ্চিমে পৌঁছালে একদল ওত পেতে থাকা দুর্বৃত্ত গাড়ির গতি রোধ করে। তারা জুয়েলকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় এলোপাতাড়ি মারধর শুরু করে। হামলায় জুয়েল গুরুতর আহত হয়ে মাটিতে লুটিয়ে পড়লে দুর্বৃত্তরা পালিয়ে যায়। পরে পথচারীরা তাকে আশঙ্কাজনক অবস্থায় উদ্ধার করে ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসীর তথ্যমতে, লক্ষ্মীপুর ও বড়চারা এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তবে নিহত জুয়েল সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন এবং ওই বিরোধের সঙ্গে তার কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা ছিল না। কেবল পরিস্থিতির শিকার হয়ে অকালে প্রাণ হারাতে হয়েছে এই যুবককে।
হত্যাকাণ্ডের পর প্রকৃত অপরাধীদের দ্রুত গ্রেপ্তার ও ফাঁসির দাবিতে উত্তাল হয়ে ওঠে কুলিয়ারচর। গত ১১ জুলাই শনিবার সন্ধ্যার পর নিহতের জানাজা শেষে এক অভূতপূর্ব বিক্ষোভের সৃষ্টি হয়। লাশ দাফনের আগে ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী খাটিয়া কাঁধে নিয়ে বিক্ষোভ মিছিল বের করেন। মিছিলটি লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয় মাঠ থেকে শুরু হয়ে নিহতের নিজ বাড়িতে গিয়ে শেষ হয়। শত শত মানুষের স্বতঃস্ফূর্ত অংশগ্রহণে মিছিলে খুনিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবিতে স্লোগান দেওয়া হয়। পরে অশ্রুসিক্ত নয়নে জুয়েলের মরদেহ দাফন করা হয়।
হত্যাকাণ্ডের ১২ ঘণ্টা পার হতে না হতেই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে জুয়েল হত্যার সঙ্গে জড়িত বলে উল্লেখ করে উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা গ্রামের সাকিব, শাউন, সোহান, রনি, আসিফ ও জিদনীসহ বেশ কয়েকজন যুবকের নাম ও ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এত দ্রুত কীভাবে সবার ছবি সংগ্রহ করা হলো এবং পোস্টকারীরা ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী কি না, তা নিয়ে জনমনে নানা প্রশ্ন ও নতুন করে ধোঁয়াশার সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের দাবি, এই সুযোগে ব্যক্তিগত বা সামাজিক শত্রুতার জেরে কোনো নিরপরাধ ব্যক্তি যেন হয়রানির শিকার না হন। আবার কোনো প্রকৃত অপরাধী যেন রাজনৈতিক ছত্রচ্ছায়ায় কিংবা মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে পার পেয়ে না যায়।
এ বিষয়ে বড়চারা গ্রামের যুবক মো. নাঈম আনোয়ার ফেসবুকে ক্ষোভ প্রকাশ করে লেখেন, আমাদের যুবসমাজের কাছে অন্তত এমন সহিংস আচরণ কখনো আশা করিনি। গুটি কয়েক ছেলের জন্য আজ সমগ্র এলাকাবাসী বর্বরতার তকমা মাথায় নিয়ে ঘুরছে। সেই সঙ্গে নিরপরাধ কিছু ছেলের নামও শোনা যাচ্ছে। প্রকৃত দোষীরা শাস্তির আওতায় আসুক, সমাজে আবার শান্তি ফিরে আসুক- এটাই প্রত্যাশা।
হত্যাকাণ্ডের পর থেকেই এলাকায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীন বলেন, হত্যার কারণ উদঘাটন এবং দোষীদের গ্রেপ্তার করে আইনের আওতায় আনতে পুলিশ মাঠে কাজ করছে। নিহতের পরিবারের পক্ষ থেকে মামলার প্রস্তুতি চলছে।
একটি নিরীহ যুবকের এমন নৃশংস হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দ্রুত প্রকৃত অপরাধীদের গ্রেপ্তারের মাধ্যমে এলাকায় শান্তি ফিরিয়ে আনার জোর দাবি জানিয়েছেন কুলিয়ারচরের সর্বস্তরের সাধারণ মানুষ।
তবে ঘটনার দুই দিন পেরিয়ে গেলেও রোববার বিকেল ৪টা পর্যন্ত থানায় কোনো আনুষ্ঠানিক মামলা রুজু হয়নি বলে জানা গেছে।

