মো. শাহাদাত হোসেন: পবিত্র ঈদুল আজহা (কোরবানির ঈদ) যত ঘনিয়ে আসছে, ততই বাড়ছে ব্যস্ততা। ঢাকার দোহার ও নবাবগঞ্জ উপজেলার কামারপাড়াগুলো এখন টুংটাং শব্দে মুখর। দিন-রাত সমান করে লোহার তৈরি ধারালো সরঞ্জাম তৈরিতে ব্যস্ত সময় পার করছেন স্থানীয় কামার শিল্পীরা। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত জ্বলছে কয়লার আগুন, আর বাতাসে ভাসছে হাতুড়ি পেটানোর চেনা শব্দ।
কোরবানির পশুর চামড়া ছাড়ানো, মাংস কাটা ও হাড় সাইজ করার জন্য দা, ছুরি, চাপাতি ও বঁটি অপরিহার্য। আর এই প্রয়োজনীয় সরঞ্জামের জোগান দিতেই এখন নাওয়া-খাওয়া ভুলেছেন দোহার ও নবাবগঞ্জের শত শত কর্মকার পরিবার।
নবাবগঞ্জের বাঘমারা, শোল্লা, বান্দুরা, আগলা, গালিমপুর এবং দোহারের জয়পাড়া, কার্তিকপুর, মেঘুলা ও লটাখোলাসহ বিভিন্ন বাজার ও গ্রাম ঘুরে দেখা গেছে, কামারদের ঘরে এখন উপচে পড়া ভিড়। প্রতিটি দোকানেই জ্বলছে লাল-টকটকে আগুনের কুণ্ডলী।
একদিকে চলছে নতুন লোহা পিটিয়ে ধারালো সরঞ্জাম তৈরির কাজ, অন্যদিকে পুরোনো সরঞ্জাম শান দিয়ে ধারালো করার জন্য ভিড় করছেন সাধারণ মানুষ ও কসাইরা। কয়লার ধোঁয়া আর আগুনের উত্তাপের মধ্যে ঘাম ঝরানো পরিশ্রম করছেন কারিগররা। প্রচণ্ড গরমেও থেমে নেই হাতুড়ির আঘাত।
বাজারে লোহার মান ও আকারভেদে বিভিন্ন দামে বিক্রি হচ্ছে এসব সরঞ্জাম। স্প্রিংয়ের লোহা (পাকা লোহা) ও সাধারণ লোহার ওপর ভিত্তি করে দামের তারতম্য দেখা যাচ্ছে।
| সরঞ্জামের নাম | বর্তমান বাজার দর (আনুমানিক) | ব্যবহার |
|---|---|---|
| নতুন দা | ৪০০ থেকে ৮০০ টাকা | মাংস ও হাড় কাটার জন্য |
| চাপাতি (ওজনভেদে) | ৬০০ থেকে ১৫০০ টাকা | শক্ত হাড় কাটার কাজে |
| ছোট ছুরি | ৮০ থেকে ২০০ টাকা | চামড়া ছাড়ানো ও কাটার কাজে |
| পশু জবাইয়ের বড় ছুরি | ১০০০ থেকে ২৫০০ টাকা | পশু জবাইয়ের জন্য |
| বঁটি | ৩০০ থেকে ৮০০ টাকা | মাংস সাইজ করার জন্য |
| পুরোনো সরঞ্জাম শান দেওয়া | ৮০ থেকে ২৫০ টাকা | হাত বা মেশিন শান অনুযায়ী |
নবাবগঞ্জের বাঘমারা বাজারের প্রবীণ কামার শিল্পী নিখিল কর্মকার বলেন, কোরবানির ঈদ এলে আমাদের ঘুম হারাম হয়ে যায়। খদ্দেরের চাপ সামলানোই দায়। সারা বছর টুকটাক কাজ থাকলেও এই এক মাসই আমাদের আসল আয়ের সময়। দিন-রাত পরিশ্রম করলেও যখন হাতে কিছু টাকা আসে, তখন সব কষ্ট ভুলে যাই।
তবে আনন্দের মাঝেও রয়েছে উদ্বেগ। কারিগরদের অভিযোগ, বর্তমানে কয়লা, লোহা ও ইস্পাতের দাম অনেক বেড়ে গেছে। জয়পাড়া বাজারের এক কারিগর জানান, আগে যে কয়লা ৩০০ টাকায় পাওয়া যেত, এখন তা কিনতে প্রায় দ্বিগুণ টাকা গুনতে হচ্ছে। অথচ সেই তুলনায় মজুরি বা পণ্যের দাম খুব বেশি বাড়ানো সম্ভব হয়নি। ফলে কাঙ্ক্ষিত লাভ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন তারা।
দোহারের লটাখোলা গ্রামের ক্রেতা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ঈদের আর মাত্র কয়েকদিন বাকি। কসাই আগেই ঠিক করেছি। এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি হিসেবে দা আর চাপাতি শান দিতে এসেছি। সঙ্গে নতুন একটি ছোট ছুরিও কিনলাম। ঈদের ঠিক আগে কামারের দোকানে সিরিয়াল পাওয়াই কঠিন হয়ে যায়, তাই আগেভাগেই চলে এলাম।
আধুনিক প্রযুক্তির ছোঁয়ায় এখন বৈদ্যুতিক শান মেশিনের ব্যবহার বাড়লেও, হাতুড়ি ও নেহাইয়ের ঐতিহ্যবাহী কারুকাজেই তৈরি হচ্ছে সেরা মানের সরঞ্জাম। বিদেশি রেডিমেড ছুরির ভিড়েও দোহার-নবাবগঞ্জের কামারদের হাতে তৈরি দেশি লোহার জিনিসের কদর এখনো কমেনি।
পৈতৃক সূত্রে পাওয়া এই পেশাকে নানা সংকটের মধ্যেও টিকিয়ে রেখেছেন অনেক কর্মকার পরিবার। তাদের দাবি, সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা ও সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা করা হলে এই কুটির শিল্প আরও বড় পরিসরে এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হবে।
ঈদের দিন সকাল পর্যন্ত কামারপাড়ার এই ব্যস্ততা ও টুংটাং শব্দ থামবে না। সব সংকট কাটিয়ে এবারের ঈদ দোহার-নবাবগঞ্জের কামার সম্প্রদায়ের মুখে হাসি ফোটাবে- এমনটাই প্রত্যাশা স্থানীয় সচেতন মহলের।

