সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

কুলিয়ারচর থানার ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়াসহ পালানো আ.লীগ নেতাসহ ৪ নারীর বিরুদ্ধে মামলা প্রতিবাদে এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন

কুলিয়ারচর থানার ওসি প্রত্যাহার, হাতকড়াসহ পালানো আ.লীগ নেতাসহ ৪ নারীর বিরুদ্ধে মামলা প্রতিবাদে এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়া আওয়ামী লীগ নেতা মো. রেনু মিয়াকে প্রায় ১০ ঘণ্টা পর হাতকড়া পরা অবস্থায় পুনরায় গ্রেপ্তারের পর তাঁর বিরুদ্ধে মামলা করেছে পুলিশ। একই ঘটনায় চার নারীকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে আদালতে পাঠানো হয়েছে। এদিকে দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনকে প্রত্যাহার করে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে।

তবে রেনু মিয়ার স্বজন ও এলাকাবাসীর দাবি, স্থানীয় কয়েকজন রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় রেনু মিয়াসহ চার নারীকে ষড়যন্ত্রমূলকভাবে গ্রেপ্তার করে মিথ্যা মামলায় ফাঁসানো হয়েছে।

পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, গত ১৪ সেপ্টেম্বর সোমবার দুপুরে কুলিয়ারচর থানার একটি মামলায় ছয়সূতি ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি মো. রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তার করতে উপজেলার মাধবদী গ্রামে তাঁর বাড়িতে অভিযান চালানো হয়। স্থানীয় লোকজনের উপস্থিতির মধ্যে গ্রেপ্তারের পর তাঁকে হাতকড়া পরানো হয়। একপর্যায়ে তিনি হাতকড়াসহ পুলিশ হেফাজত থেকে পালিয়ে যান। পরে প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়। এ ঘটনা নিয়ে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমেও প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে।

রেনু মিয়া ছয়সূতি ইউনিয়নের মাধবদী এলাকার মৃত ইল্লাল মিয়ার ছেলে।

এ ঘটনায় এলাকায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হলে পুলিশ রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্য ও কয়েকজন নারীকে থানায় নিয়ে যায়। তাঁদের মধ্যে ছিলেন রেনু মিয়ার ছেলে মনিরের স্ত্রী ইতি আক্তার (২৩), মেয়ে বিপাশা আক্তার (২৪), প্রতিবেশী সাদিয়া আক্তার (২০), রত্না (৩০), মরিয়ম (৪৫), আকলিমা (২৬) ও আরিফা আক্তার (৪০)। তাঁদের মধ্যে চারজনকে পরবর্তীতে মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়।

স্থানীয় কয়েকজন বাসিন্দা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, রেনু মিয়াকে পুলিশের কাছে ফিরিয়ে দিতে পুলিশ গ্রামবাসীর সহযোগিতা চায়। তাঁদের ভাষ্য, রেনু মিয়ার কাছে মুঠোফোন না থাকায় পরিবারের সদস্যদের থানায় নেওয়ার বিষয়টি তিনি প্রথমে জানতে পারেননি। পরে বিভিন্ন মাধ্যমে তিনি বিষয়টি জানতে পারেন। পরিবারের সদস্যদের আসামি করা হতে পারে- এমন আশঙ্কা থেকে শেষ পর্যন্ত তিনি পুলিশের কাছে ফিরে আসেন।

রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তারের প্রথম অভিযানে নেতৃত্ব দেন কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) মো. শারফিন মিয়া। দ্বিতীয় দফার অভিযানেও তিনি ছিলেন। তিনি বলেন, রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তারে পুলিশ একাধিক কৌশল নেয়। প্রায় ১০ ঘণ্টার মধ্যে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তার করা সম্ভব হয়।

পুলিশ হেফাজতে রেনু মিয়া সাংবাদিকদের বলেন, হঠাৎ পুলিশ দেখে তিনি ভয় পেয়েছিলেন। গ্রামবাসী তাঁর পক্ষে কথা বলায় তিনি পালানোর সুযোগ পান। তবে হাতকড়া থাকায় তিনি গ্রাম ছাড়তে পারেননি। পরে একটি বাড়িতে আশ্রয় নেন। পরিবারের সদস্যদের কথা চিন্তা করে শেষ পর্যন্ত পুলিশের কাছে ফিরে আসেন বলে জানান তিনি।

পুলিশের ভাষ্য, রেনু মিয়াকে গ্রেপ্তারের পর তাঁর দুই হাতে হাতকড়া পরানো হয়। এ সময় পরিবারের সদস্য ও স্থানীয় লোকজন সেখানে জড়ো হন। একপর্যায়ে পুলিশকে ঘেরাও করে ধস্তাধস্তির মাধ্যমে রেনু মিয়াকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া হয়। এতে কয়েকজন পুলিশ সদস্য আহত হন। পরে তাঁকে পুনরায় গ্রেপ্তারে অভিযান শুরু করে পুলিশ। একাধিক দল নিয়ে অভিযান চালিয়ে সোমবার রাত আনুমানিক ৯টা ৫০ মিনিটে মাধবদী এলাকা থেকে তাঁকে হাতকড়াসহ পুনরায় গ্রেপ্তার করা হয়।

রেনু মিয়াকে হাতকড়াসহ ছিনিয়ে নেওয়া, পুলিশের কাজে বাধা এবং পুলিশ সদস্যদের ওপর হামলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার উপপরিদর্শক (এসআই) শারফিন মিয়া বাদী হয়ে ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে এবং অজ্ঞাতনামা আরও ২০ থেকে ২৫ জনকে আসামি করে মামলা করেন। মামলায় দণ্ডবিধির ১৮৬, ৩৩২, ২২৪, ২২৫, ৩৫৩ ও ৩৪ ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে। মামলাটি ১৫ সেপ্টেম্বর দায়ের করা হয় বলে সংবাদ প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

মামলার এজাহারে বলা হয়েছে, ঘটনার সময় পুলিশের সঙ্গে ধস্তাধস্তিতে এসআই শারফিন মিয়া, কনস্টেবল বাবলু মিয়া ও কনস্টেবল সোহেল রানা আহত হন। পরে তাঁরা কুলিয়ারচর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা নেন।

এ মামলায় রেনু মিয়ার ছেলে মনিরের স্ত্রী ইতি আক্তার (২৩), প্রতিবেশী সাদিয়া আক্তার (২০), রত্না (৩০) ও আকলিমা (২৬)-কে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দেড় বছরের শিশু আয়াত ও ৯ মাসের শিশু রায়ানসহ ১৫ সেপ্টেম্বর বিকেল ৩টার দিকে কিশোরগঞ্জ জেলা আদালতে পাঠানো হয়। নারীদের মধ্যে একজন অন্তঃসত্ত্বা ছিলেন। দেড় বছরের শিশু আয়াত ইতি আক্তারের মেয়ে এবং ৯ মাসের শিশু রায়ান সাদিয়া আক্তারের ছেলে।

এ ছাড়া রেনু মিয়ার মেয়ে বিপাশা আক্তার (২৪), প্রতিবেশী মরিয়ম (৪৫) ও আরিফা আক্তার (৪০) অসুস্থ থাকায় তাঁদের কাছ থেকে মুচলেকা নিয়ে পরিবারের সদস্যদের জিম্মায় দেওয়া হয়।

এদিকে রেনু মিয়া পুলিশ হেফাজত থেকে হাতকড়াসহ পালিয়ে যাওয়ার ঘটনায় দায়িত্ব পালনে অবহেলার অভিযোগে কুলিয়ারচর থানার ওসি কাজী আরিফ উদ্দীনকে শোকজ করার পাশাপাশি প্রশাসনিক কারণে প্রত্যাহার করে কিশোরগঞ্জ পুলিশ লাইনে সংযুক্ত করা হয়েছে। ১৪ সেপ্টেম্বর রাতে তাঁকে থানা থেকে প্রত্যাহার করা হয় বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।

ওসি কাজী আরিফ উদ্দীন জানান, সরকারি আদেশে তাঁকে বদলি করা হয়েছে। মঙ্গলবার দুপুর ১২টার দিকে তিনি থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেনের কাছে দায়িত্ব বুঝিয়ে দেন।

কুলিয়ারচর থানার ওসি (তদন্ত) মো. মোবারক হোসেন জানান, মঙ্গলবার দুপুরে ওসি কাজী আরিফ উদ্দীনের কাছ থেকে তিনি দায়িত্ব বুঝে নিয়েছেন।

এলাকাবাসীর সংবাদ সম্মেলন:

রেনু মিয়াসহ চার নারীর বিরুদ্ধে মামলা এবং তাঁদের আদালতে পাঠানোর ঘটনায় গত ১৭ সেপ্টেম্বর বৃহস্পতিবার দুপুরে মাধবদী গ্রামে সংবাদ সম্মেলন করেন রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্য ও এলাকাবাসী।

সংবাদ সম্মেলনে তাঁদের দাবি, একটি মেয়েসংক্রান্ত বিষয়কে কেন্দ্র করে স্থানীয় একটি হিন্দু পরিবারের কাছে কয়েকজন রাজনৈতিক ব্যক্তি চাঁদা দাবি করেন। এর প্রতিবাদ করায় রেনু মিয়ার ওপর ওই রাজনৈতিক ব্যক্তিদের ক্ষোভ তৈরি হয় বলে দাবি করেন তাঁরা।

তাঁদের আরও দাবি, মাধবদী কর্মকারপাড়ার সজিব রায় (৩৫) নামে এক সিঙ্গাপুরপ্রবাসীর পরিবারের কাছে চাঁদা দাবি ও ব্ল্যাকমেইলের অভিযোগের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করতে গিয়ে রেনু মিয়া স্থানীয় রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের বিরোধিতার মুখে পড়েন। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলকে অবহিত করায় তাঁকে হয়রানি করতে পরিকল্পিতভাবে মামলায় জড়ানো হয়েছে বলেও দাবি করেন পরিবারের সদস্যরা।

রেনু মিয়ার পরিবারের সদস্যরা আরও দাবি করেন, তিনি কোনো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িত ছিলেন না; বরং বিপদে পড়া একটি অসহায় পরিবারকে সহযোগিতা করতেই ঘটনাস্থলে গিয়েছিলেন। চাঁদাবাজির প্রতিবাদ করায় তাঁকে পরিকল্পিতভাবে মামলায় আসামি করা হয়েছে এবং পরিবারের সদস্যদের হয়রানি করা হচ্ছে।

এলাকাবাসী রেনু মিয়া ও গ্রেপ্তার নারীদের বিরুদ্ধে করা মামলা প্রত্যাহার এবং ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *