মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে আসন্ন উছমানপুর ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৯ নম্বর ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী মো. পারভেজ মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে স্থানীয় কয়েকটি পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়ে সংবাদ সম্মেলন করেছেন। অন্যদিকে, ঘটনাটিকে ঘিরে পাল্টা অভিযোগ তুলেছেন একই ওয়ার্ডের মেম্বার পদপ্রার্থী অপর পক্ষের সৌদি প্রবাসী মো. কাদির মিয়া।
গত ১৮ অক্টোবর রোববার বিকেলে উপজেলার নাজিরদিঘী বাজারে স্থানীয় সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে এ সংবাদ সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করে মো. পারভেজ মিয়া (৩৫) জানান, সম্প্রতি স্থানীয় বেশ কয়েকটি দৈনিক ও সাপ্তাহিক পত্রিকা, অনলাইন নিউজ পোর্টাল এবং ফেসবুকে ‘কুলিয়ারচরে ইউপি নির্বাচনে মেম্বার প্রার্থিতা নিয়ে দুজনের বিরোধ’, প্রতিপক্ষের হুমকির মুখে দুই সন্তান নিয়ে বাড়িঘরছাড়া প্রবাসীর স্ত্রী, দুই শিশুর পড়াশোনা অনিশ্চিত’সহ বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব সংবাদকে সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত দাবি করে তিনি বলেন, আসন্ন ইউপি নির্বাচনে আমি একজন মেম্বার পদপ্রার্থী হিসেবে এলাকার নানা উন্নয়নমূলক কাজ করে আসছি। নির্বাচনে প্রতিপক্ষের একটি মহল আমাকে হেয়প্রতিপন্ন করতে উঠেপড়ে লেগেছে। এরই ধারাবাহিকতায় তারা আমিসহ ছয়জনের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করছে।
তিনি আরও অভিযোগ করেন, কাদির মিয়া নাজিরদিঘী ও খৈলাজুরিসহ বিভিন্ন গ্রামের মানুষকে বিদেশে নেওয়ার কথা বলে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে সঠিক কাজ না দিয়ে হয়রানি করে আসছেন। এসব অনিয়ম ও হয়রানির প্রতিবাদ করায় তাঁকেসহ নাজিরদিঘী গ্রামের কয়েকটি পরিবারের সদস্যদের মিথ্যা মামলায় জড়ানো হয়েছে। এ ব্যাপারে তিনি প্রশাসনসহ বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলমের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে উছমানপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাধারণ সম্পাদক মো. সিদ্দিক মিয়া, ৯ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. সেতু মিয়া, মো. আঙ্গুর মিয়া, মো. ফজলু মিয়া ও মোছা. আনোয়ারা বেগমসহ ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন।
পাল্টা বক্তব্যে যা বললেন সৌদি প্রবাসী কাদির মিয়া:
এদিকে, সৌদি প্রবাসী মো. কাদির মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি করে নিজের অবস্থান ব্যাখ্যা করেন।
তিনি বলেন, সৌদি আরব থেকে ছুটিতে দেশে আসার পর তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেম্বার পদপ্রার্থী পারভেজ মিয়ার চাচা মো. জাকির মিয়া এবং তাঁদের এলাকাসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার মো. ইয়াছিন মিয়া, মো. মামুন মিয়া, মো. মহসিন মিয়া, মো. জুনাইদ মিয়া, মো. আরমান মিয়া, মো. তরিকুল, মো. কাজল মিয়া, মো. তারেক মিয়া, মো. নাছির মিয়া, মো. মুন্না মিয়া, মো. ইকবাল মিয়া, মো. ইসাদ মিয়া, মো. মোস্তাকিম ও মো. আরমানসহ অন্তত ১৫ জন বিভিন্ন সময়ে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করে সৌদি আরবে যাওয়ার প্রক্রিয়া সম্পর্কে জানতে চান।
পরে তাঁর সহযোগিতায় তাঁরা ঢাকার বনানীতে অবস্থিত সরকার অনুমোদিত একটি এজেন্সির (ফাদার ইন্টারন্যাশনাল ওভারসিজ লি., লাইসেন্স নম্বর-২০৫১) সঙ্গে যোগাযোগ করেন। সেখানে গিয়ে তাঁরা এজেন্সি কর্তৃপক্ষের সঙ্গে নিজেরা কথা বলে নিজ নিজ দায়িত্বে টাকা-পয়সার লেনদেন করেন। নিয়ম মেনে শর্তসাপেক্ষে প্রশিক্ষণ শেষ করে তিন ধাপে ওই এজেন্সির মাধ্যমে তাঁরা সৌদি আরবে যান।
কাদির মিয়া আরও দাবি করেন, পরে তিনি জানতে পারেন, সৌদি সরকারের নিয়ম অনুযায়ী যথাযথ সময়ের মধ্যেই তাঁরা ফিউচার মেকার্স লি. কোম্পানির নামে আকামা নিয়ে কাজ শুরু করেন। তাঁদের মধ্যে ১৪ জনের আকামার মেয়াদ ১৭ অক্টোবর শেষ হয়েছে এবং একজনের আকামার মেয়াদ আগামী ২৪ অক্টোবর শেষ হবে।
কাদির মিয়ার দাবি, সৌদি আরবে যাওয়ার পর আকামার মেয়াদ শেষ হওয়ার আগেই মো. তরিকুল, মো. কাজল মিয়া, মো. তারেক মিয়া, মো. নাছির মিয়া, মো. মুন্না মিয়া, মো. ইকবাল মিয়া, মো. ইসাদ মিয়া, মো. মোস্তাকিম ও মো. আরমানসহ নয়জন প্রবাসী বেশি আয়ের আশায় কোম্পানির কাজ ছেড়ে অন্যত্র চলে যান।
তিনি বলেন, “আমি কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা দালাল নই। কারও বেতন বা টাকা আত্মসাতের সুযোগ আমার নেই। টাকা দেওয়া-নেওয়ার বিষয়টি কেউ প্রমাণ করতে পারলে আমি টাকা ফেরত দিতে প্রস্তুত।”
পরিবারের সদস্যদের হয়রানির অভিযোগ:
বিভিন্ন প্রমাণাদি উপস্থাপন করে কাদির মিয়া আরও বলেন, তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী মেম্বার পদপ্রার্থী মো. পারভেজ মিয়া তাঁকে প্রার্থিতা থেকে সরাতে না পেরে সৌদি আরবে লোক পাঠানোর বিষয়টিকে ইস্যু করে সহযোগীদের সহায়তায় তাঁর ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে নানা ষড়যন্ত্র করে আসছেন।
তিনি অভিযোগ করেন, দেশের বাড়িতে পুরুষ সদস্য না থাকায় তাঁর পরিবারের সদস্যদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। তাঁর বৃদ্ধ মাকে জেল খাটানো হয়েছে এবং প্রতিনিয়ত তাঁর স্ত্রী-সন্তানদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে বাড়িছাড়া করা হয়েছে। বর্তমানে তাঁর ১৩ বছরের ছেলে ও ৯ বছরের মেয়ের লেখাপড়া অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে।
কাদির মিয়া আরও অভিযোগ করেন, পারভেজ মিয়ার সহযোগী মো. কাইয়ুম মিয়া তাঁর বাড়িতে গিয়ে মা ও স্ত্রীর কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করেছেন। এ ঘটনার একটি ভিডিও ফুটেজ ইতোমধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
এসব ঘটনায় তাঁর পরিবারের পক্ষ থেকে কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে এবং কুলিয়ারচর থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে বলে জানান তিনি। এসব ঘটনার সুষ্ঠু বিচার দাবি করেন কাদির মিয়া।
প্রবাসীদের ভিডিও বার্তায় ভিন্ন তথ্য:
তবে ঘটনাটি অনুসন্ধানে পাওয়া ভুক্তভোগী প্রবাসীদের মধ্যে তরিকুল ইসলাম, তারেক মিয়া, কাজল মিয়া, নাসির মিয়া, ইকবাল মিয়া ও মুন্না মিয়ার পাঠানো ভিডিও বার্তায় ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভিডিও বার্তায় তাঁরা ফিউচার মেকার্স লি. কোম্পানির বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করলেও সৌদি প্রবাসী কাদির মিয়ার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ তোলেননি বলে জানা গেছে।
প্রবাসী মুন্না মিয়া যাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছেন, তাঁর নাম ‘রানা’; তিনি কাদির মিয়া নন বলে দাবি করা হয়েছে। এ ছাড়া মেম্বার পদপ্রার্থী পারভেজ মিয়ার চাচা মো. জাকির মিয়াও বর্তমানে বৈধ আকামা নিয়ে সৌদি আরবে কাজ করছেন বলে জানা গেছে।
প্রবাসী ও স্থানীয় সূত্র থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে এখন পর্যন্ত কাদির মিয়ার বিরুদ্ধে আনা প্রতারণার অভিযোগের সত্যতা নিশ্চিত করা যায়নি।

