মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে গ্রামবাসীর সঙ্গে মাদকের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করায় সৎ ভাসুর ও স্বামীর আপন ভাতিজাকে আইনি ঝামেলায় ফাঁসাতে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) বরাবর ভিত্তিহীন ও বানোয়াট অভিযোগ দাখিলের অভিযোগ উঠেছে উপজেলার সালুয়া ইউনিয়নের দড়িগাঁও গ্রামের আনোয়ার হোসেনের স্ত্রী মোছা. নাসরিন বেগমের (২৮) বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ক্ষোভ ও নিন্দা প্রকাশ করে প্রতিবাদ জানিয়েছেন ভুক্তভোগী পরিবার ও এলাকাবাসী।
জানা যায়, গত ১৪ অক্টোবর বুধবার বিকেলে মোছা. নাসরিন বেগম উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে উপস্থিত হয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন। অভিযোগে তিনি দাবি করেন, গত ১২ অক্টোবর সোমবার সকাল আনুমানিক ১০টার দিকে তাঁর সৎ ভাসুর মো. আয়না মিয়া ওরফে মো. আইন উদ্দিন (৫৫) এবং স্বামীর আপন ভাতিজা মো. অন্তত মিয়া (২৫) তাঁদের সহযোগীদের নিয়ে নাসরিন বেগমের বাড়িতে অনধিকার প্রবেশ করেন। এ সময় তাঁরা ঘর নির্মাণের ১৯টি সিমেন্টের পিলার ভাঙচুর করে প্রায় দেড় লাখ টাকার ক্ষতিসাধন করেন। এ ছাড়া তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেনকে দেশীয় অস্ত্র নিয়ে আক্রমণ ও প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
তবে গত ১৫ অক্টোবর বৃহস্পতিবার বিকেলে সরেজমিনে দড়িগাঁও গ্রামে গিয়ে অভিযুক্ত মো. আয়না মিয়াসহ স্থানীয় ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. কামরুল ইসলাম (৫২), সাবেক ইউপি সদস্য মো. হেলিম মিয়া (৬০), ২ নম্বর ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি আবদুল আওয়াল (৬০), ব্যবসায়ী মো. বাবুল মিয়া (৪০), মাসুম মিয়া (৩২), লিটন (৫০), রমজান আলী (৬৫), হারুন মিয়া (৪৫), খোকন মিয়া (৫৫), শামীম (৪০) ও বিল্লাল মিয়া (৫২)সহ স্থানীয় বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলা হয়। তাঁদের বক্তব্য অনুযায়ী, নাসরিন বেগমের অভিযোগের পক্ষে কোনো সত্যতা পাওয়া যায়নি। এ সময় গ্রামবাসী ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, অভিযোগে উল্লেখিত তারিখে সেখানে ভাঙচুর, আক্রমণ কিংবা হুমকি-ধমকির কোনো ঘটনা ঘটেনি।
গ্রামবাসীর অভিযোগ, নাসরিন বেগম, তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেন ও তাঁর মা দীর্ঘদিন ধরে এলাকায় মাদক ব্যবসা চালিয়ে যুব ও ছাত্রসমাজকে ধ্বংসের দিকে ঠেলে দিচ্ছেন। তাঁদের দাবি, তাঁরা একাধিকবার মাদকসহ হাতেনাতে ধরা পড়েছেন এবং আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে একাধিক মাদক মামলা রয়েছে। তিনি আগেও কারাবাস করেছেন। তাঁদের অভিযোগ, মাদক ব্যবসা ও এসব কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে গ্রামবাসীর সঙ্গে সোচ্চার হওয়া এবং প্রতিবাদ করার কারণে সৎ ভাসুর ও স্বামীর আপন ভাতিজাকে ফাঁসাতে এই অভিযোগ করা হয়েছে।
জানা গেছে, আনোয়ার-নাসরিন দম্পতির মাদক কেনাবেচার বিরুদ্ধে সোচ্চার হয়ে গত ১১ অক্টোবর রোববার এলাকার জনপ্রতিনিধি, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও রাজনৈতিক নেতাদের নিয়ে একটি সালিশ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়।
এ ছাড়া প্রায় দুই মাস আগে আনোয়ার-নাসরিন দম্পতির মাদক বিক্রিতে অতিষ্ঠ হয়ে গ্রামবাসী তাঁদের এলাকা থেকে উচ্ছেদের দাবিতে বাড়িতে গিয়ে চড়াও হন এবং হালকা ভাঙচুর করেন বলে জানা গেছে। এরপর থেকে নাসরিন বেগম ও আনোয়ার হোসেন তাঁদের সন্তানদের নিয়ে এলাকা ছেড়ে আত্মগোপনে রয়েছেন বলে স্থানীয়দের দাবি। কুলিয়ারচর থানা পুলিশ ও এলাকাবাসী খোঁজ করেও বর্তমানে তাঁদের সন্ধান পাচ্ছেন না বলে জানা গেছে।
এদিকে, কোনো অপরাধ না করেও মিথ্যা মামলার আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী আয়না মিয়া ওরফে মো. আইন উদ্দিনের পরিবার। সচেতন মহলের মতে, অনেক ক্ষেত্রে অপরাধীরা নিজেদের প্রভাব বজায় রাখতে কিংবা প্রতিপক্ষকে দমাতে প্রশাসনের কাছে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে থাকে।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও এলাকাবাসী প্রশাসনের কাছে জোর দাবি জানিয়েছেন, অভিযোগের সত্যতা যথাযথভাবে তদন্ত করে যেন কোনো নির্দোষ ব্যক্তি হয়রানির শিকার না হন এবং মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়।
এ বিষয়ে মোছা. নাসরিন বেগমের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে জানান, গত ১৪ অক্টোবর বুধবার বিকেলে আয়না মিয়া ও অন্তত মিয়ার বিরুদ্ধে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার (ইউএনও) কার্যালয়ে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছেন। পরে তিনি বলেন, কিশোরগঞ্জ আদালতে একটি মামলাও দায়ের করেছেন। অপর এক প্রশ্নের জবাবে তিনি জানান, তাঁর স্বামী আনোয়ার হোসেনের বিরুদ্ধে ২০২৩ সালে একটি মাদক মামলা হয়েছিল এবং ওই মামলায় তিনি কারাবাস করেছেন। বর্তমানে তাঁরা মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নন বলেও দাবি করেন নাসরিন বেগম।

