মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে দুর্বৃত্তদের অতর্কিত হামলায় নির্মমভাবে নিহত অটোরিকশাচালকের পুত্র জুয়েল মিয়া (২০) হত্যার প্রতিবাদে এবং প্রকৃত খুনিদের ফাঁসির দাবিতে ফুঁসে উঠেছে হত্যাকাণ্ডের ঘটনাস্থল বড়চারা গ্রামের ক্ষুব্ধ এলাকাবাসী। প্রকাশ্য দিবালোকে সংঘটিত এই নৃশংস হত্যাকাণ্ডের কয়েক দিন অতিবাহিত হলেও জুয়েল হত্যার সঙ্গে জড়িত প্রকৃত খুনিদের কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় এলাকায় তীব্র ক্ষোভ ও বিচারহীনতার আতঙ্ক বিরাজ করছে। অপরদিকে, মামলায় কিছু নিরপরাধ ব্যক্তিকে জড়ানো হয়েছে বলে দাবি করে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবিও জানানো হয়েছে।
গত ২০ জুলাই, রোববার বাদ আসর উপজেলার আগরপুর-পোড়াদিয়া মহাসড়কের বড়চারা নতুন বাজার সড়কের ওপর ‘১নং গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের সর্বস্তরের জনগণ’ ব্যানারে মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়।
মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিলে বড়চারা গ্রামের বাসিন্দা উপজেলা বিএনপির তাঁতবিষয়ক সম্পাদক ও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম ওরফে এলেম, উপজেলা ছাত্রদলের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সদস্যসচিব মো. ইমরান খান এবং ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিনের ভাই শাহ আলমের নেতৃত্বে বড়চারা ও আশপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
বিক্ষোভ মিছিলে স্লোগান দেওয়া হয়- সন্ত্রাসীদের কালো হাত ভেঙে দাও, গুঁড়িয়ে দাও, খুনিদের ঠিকানা বড়চারা হবে না, জুয়েল হত্যার বিচার চাই, নিরপরাধ ব্যক্তিদের মুক্তি চাই।
মানববন্ধনে উপজেলা বিএনপির তাঁতবিষয়ক সম্পাদক ও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম ওরফে এলেম জুয়েল হত্যার সঙ্গে জড়িতদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানিয়ে বলেন, দুই দিন আগে কিশোরগঞ্জ আদালত থেকে জুয়েল হত্যা মামলার নকল তুলে তিনি জানতে পারেন, এ মামলায় তাকে ১১ নম্বর আসামি করা হয়েছে। তার এইচএসসি পরীক্ষার্থী ছেলে তৌকিকে ২ নম্বর, ভাতিজা ছায়িম মিয়াকে ৮ নম্বর, ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিনকে ১ নম্বর এবং তার ছেলে মো. সানিকে ৫ নম্বর আসামি করা হয়েছে। এছাড়া ৯ নম্বর আসামি সোহান মিয়া ঘটনার সময় ঢাকায় ছিলেন বলেও তিনি দাবি করেন। তারা কেউই জুয়েল হত্যার সঙ্গে জড়িত নন দাবি করে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে তাদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার দাবি জানান তিনি।
মানববন্ধনে উপজেলা বিএনপির স্বেচ্ছাসেবকবিষয়ক সম্পাদক মো. নাদিরুজ্জামান খসরু, স্বাস্থ্যবিষয়ক সম্পাদক মো. মেজবাহুল হক খোকা, বিএনপি নেতা মো. সেলিম মিয়া, ইউনিয়ন যুবদলের সাধারণ সম্পাদক মো. রফিকুল ইসলাম, ৯নং ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য সাফি উদ্দিন, ইউনিয়ন তরুণ দলের সাবেক সভাপতি মো. নাঈম আনোয়ারসহ বড়চারা ও আশপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ অংশ নেন।
এ সময় বক্তারা জুয়েল হত্যাকারীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি ও ফাঁসির দাবি জানান এবং নিরপরাধ ব্যক্তিদের মামলা থেকে অব্যাহতি দেওয়ার আহ্বান জানান।
এর আগের দিন শনিবার বাদ আসর একই স্থানে জুয়েল হত্যার প্রতিবাদ ও বিচার দাবিতে আরেকটি মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে বক্তারা জুয়েল হত্যার ঘটনায় নিরপরাধ কাউকে হয়রানি না করার দাবি জানান।
এরও আগে গত ১৩ জুলাই, সোমবার বিকেল সাড়ে ৪টার দিকে উপজেলার আগরপুর-পোড়াদিয়া মহাসড়কের লক্ষ্মীপুর বাজারসংলগ্ন ব্রিজের ওপর ‘ঐক্যবদ্ধ লক্ষ্মীপুরের জনগণ’ ব্যানারে এক বিশাল মানববন্ধন ও বিক্ষোভ মিছিল অনুষ্ঠিত হয়। এতে লক্ষ্মীপুর ও আশপাশের এলাকার সর্বস্তরের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে অংশ নেন।
একপর্যায়ে বিক্ষুব্ধ জনতা সড়কের ওপর বাঁশ বেঁধে, শুয়ে পড়ে এবং টায়ার ও কাঠে আগুন জ্বালিয়ে বিকেল সোয়া ৫টা থেকে রাত ৯টা পর্যন্ত প্রায় চার ঘণ্টা যান চলাচল সম্পূর্ণ বন্ধ করে দেয়।
মানববন্ধনে উপস্থিত নিহতের স্বজন ও স্থানীয় বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে একটি প্রভাবশালী মহল পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। অপরাধীরা প্রকাশ্যে ঘুরে বেড়ালেও প্রশাসন দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি দেখাতে পারেনি। কোনো রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয় বা প্রভাবশালী মহলের হস্তক্ষেপে মামলার তদন্তপ্রক্রিয়া ব্যাহত করা যাবে না।
এর আগে গত ১১ জুলাই, শনিবার জুয়েল মিয়ার জানাজা শেষে লাশ দাফনের আগে খাটিয়া কাঁধে নিয়ে শত শত মানুষ লক্ষ্মীপুর দ্বিমুখী উচ্চবিদ্যালয় মাঠ থেকে বুধাইবাড়ি পর্যন্ত বিক্ষোভ মিছিল করেন। দফায় দফায় বিক্ষোভ সত্ত্বেও কেউ গ্রেপ্তার না হওয়ায় পুলিশের ভূমিকা নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন স্থানীয়রা।
স্থানীয় ও পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, গত ১০ জুলাই, শুক্রবার বিকেলে জুয়েল মিয়া তার এক বন্ধুর ডিমবাহী গাড়িতে চড়ে আগরপুর বাসস্ট্যান্ড থেকে লক্ষ্মীপুর বাজারের দিকে আসছিলেন। গাড়িটি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা বাজারের ১০০ গজ পশ্চিমে পৌঁছালে ওত পেতে থাকা একদল দুর্বৃত্ত সেটির গতি রোধ করে। তারা জুয়েলকে জোরপূর্বক গাড়ি থেকে নামিয়ে প্রকাশ্যে রাস্তায় এলোপাতাড়ি মারধর করে চলে যায়। পরে পথচারীরা তাকে উদ্ধার করে আশঙ্কাজনক অবস্থায় ভাগলপুর জহুরুল ইসলাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, লক্ষ্মীপুর ও বড়চারা এলাকার কয়েকজন যুবকের মধ্যে দীর্ঘদিন ধরে বিরোধ চলে আসছিল। তবে নিহত জুয়েল সম্পূর্ণ নিরপরাধ ছিলেন এবং ওই বিরোধের সঙ্গে তার কোনো সম্পৃক্ততা ছিল না। তিনি গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর বুধাইবাড়ি গ্রামের অটোরিকশাচালক মো. কুদ্দুস মিয়ার ছেলে।
এ ঘটনায় কুলিয়ারচর থানা পুলিশ মামলা গ্রহণে গড়িমসি করায় নিহতের পিতা মো. কুদ্দুস মিয়া বাদী হয়ে গত ১৬ জুলাই উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের বড়চারা গ্রামের মৃত ছাবুদ আলীর ছেলে, স্থানীয় ৭নং ওয়ার্ড বিএনপির সভাপতি মো. নাজিম উদ্দিন (৫৫), তার ছেলে মো. সানি (২২), মৃত ইসমাইল মাস্টারের ছেলে উপজেলা বিএনপির তাঁতবিষয়ক সম্পাদক ও গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মো. শামছুল আলম ওরফে এলেম (৫৫), এলেমের ছেলে মো. তৌকি মিয়া (২০), এলেমের ভাই মো. আসাদ উল্লাহর ছেলে মো. ছায়িম মিয়া (২০), আনসার ভিডিপি কমান্ডার মো. জামানের ছেলে মো. আসিফ মিয়া (২২), মো. হুমায়ুনের ছেলে মো. রনি (২১), মো. জসিম উদ্দিনের ছেলে মো. সাকিব মিয়া (২১), মো. জামাল মিয়ার ছেলে মো. সালমান মিয়া (২২), মো. ইব্রাহিমের ছেলে মো. সোহান মিয়া (২১), মো. দুলাল মিয়ার ছেলে মো. জিদনী মিয়া (২২), ইছু মিয়ার ছেলে মো. টুকুল মিয়া (২২) ও সবুজ মিয়ার ছেলে মো. সুমন মিয়া (২৩)সহ অজ্ঞাতনামা ৭-৮ জনের বিরুদ্ধে কিশোরগঞ্জের জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট আদালত নং-২-এ একটি মামলা দায়ের করেন।
বাদী কুদ্দুস মিয়ার দাবি, রহস্যজনক কারণে পুলিশ প্রথমে মামলা না নেওয়ায় তিনি বাধ্য হয়ে আদালতের শরণাপন্ন হয়েছেন।
অন্যদিকে, সাধারণ গ্রামবাসীর অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী মহল আসল অপরাধীদের আড়াল করতে এবং রাজনৈতিক বা ব্যক্তিগত শত্রুতা মেটাতে পুরো বিষয়টিকে ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করার অপচেষ্টা চালাচ্ছে। যেকোনো প্রভাব ও রাজনৈতিক আশ্রয়-প্রশ্রয়ের ঊর্ধ্বে উঠে পুলিশ ও জেলা প্রশাসন যেন নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘাতকদের গ্রেপ্তার করে বিচারের আওতায় আনে- এখন এটিই কুলিয়ারচরের সর্বস্তরের মানুষের একমাত্র দাবি।

