কুমিল্লা প্রতিনিধি: কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার স্কুলছাত্রী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) মৃত্যুর ঘটনায় নতুন তথ্য সামনে এসেছে। পরিবারের সঙ্গে অভিমান করে বাড়ি ছাড়ার পর ব্রাহ্মণবাড়িয়া হয়ে কক্সবাজারে যান তিনি। সেখানে ‘রাজুর স্ত্রী তানজু আক্তার’ পরিচয়ে একটি আবাসিক হোটেলে এক রাত অবস্থান করেন। পরে বাড়ি ফেরার পথে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার থেকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ওঠার পর চালক মো. সুমন মিয়ার (৩৫) বিরুদ্ধে তাঁকে ধর্ষণ ও হত্যার অভিযোগ উঠেছে।
রোববার (১১ অক্টোবর) সিসিটিভি ফুটেজ বিশ্লেষণ ও হোটেল কর্তৃপক্ষের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে ওঠেন তাজমিন। হোটেলের ৩০২ নম্বর কক্ষ ভাড়া নেওয়ার সময় তাঁকে রাজুর স্ত্রী হিসেবে পরিচয় দেওয়া হয়। হোটেলের নিবন্ধন খাতায় তাজমিনের নাম লেখা হয় ‘তানজু আক্তার’ এবং বয়স উল্লেখ করা হয় ১৮ বছর। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছাড়েন।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ও ইনস্টাগ্রামে বার্তা আদান-প্রদান এবং রিলসের মাধ্যমে রাজুর সঙ্গে তাজমিনের পরিচয় ও ঘনিষ্ঠতা তৈরি হয়েছিল বলে জানা গেছে। তবে তাঁদের পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে ভিন্ন তথ্য পাওয়া গেছে। রাজু কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে প্রায় তিন বছর ধরে কাজ করছেন বলে জানিয়েছেন তাঁর এক সহকর্মী।
তাজমিনের কক্সবাজার যাওয়ার পেছনে পারিবারিক অভিমানের বিষয়টিও উঠে এসেছে। গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাঁর কথা-কাটাকাটি হয়। এরপর রাগ করে বাড়ি থেকে বেরিয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান তিনি। পরে রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ করলে বিকাশের মাধ্যমে তাঁকে ৫০০ টাকা পাঠানো হয়। এরপর তাজমিন কক্সবাজারে পৌঁছান।
কক্সবাজারে এক রাত অবস্থানের পর বাড়ি ফেরার জন্য বাসের টিকিট সংগ্রহ করেন তাজমিন ও রাজু। ট্রাভেল কাউন্টারের প্রতিনিধি আবদুল্লাহ জানান, ৬ অক্টোবর রাতে তাঁরা পরদিনের বাসের টিকিট নেন। ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, রাজু তাঁর জন্য ৯০০ টাকা মূল্যের টিকিট কেটে দিয়েছিলেন।
সিসিটিভি ফুটেজ অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে বাস থেকে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি।
অভিযোগ অনুযায়ী, চালক সুমন তাঁকে গন্তব্যে না নিয়ে লালমাই উপজেলার ভোরালজগতপুর উত্তরপাড়ার একটি নির্জন স্থানে নিয়ে যান। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে তাজমিনকে ধর্ষণের পর গলায় গামছা পেঁচিয়ে শ্বাসরোধে হত্যা করা হয়।
৮ অক্টোবর সকালে ওই এলাকার একটি ধানখেতের আইল থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। পরে চট্টগ্রাম থেকে অভিযুক্ত সুমনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাঁর দেখানো স্থান থেকে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।
রাজুর এক সহকর্মীর দাবি, বাড়ি ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর ফোনে কথা হচ্ছিল। চালক সম্পর্কেও তাঁদের মধ্যে কথা হয়। তবে রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের ফোনের লাইভ লোকেশন বন্ধ হয়ে গেলে তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়।
মেয়ের নিখোঁজ হওয়ার বিষয়ে তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন নির্দিষ্ট কোনো ঠিকানা না জানিয়ে এক বান্ধবীর বাসায় থাকার কথা বলেছিলেন। মা তাঁকে ফিরিয়ে আনতে চাইলেও কোথায় আছেন, তা স্পষ্ট করে জানাননি।
তাজমিনের গৃহশিক্ষক সাদ বিন এরশাদ বলেন, তাজমিন চঞ্চল স্বভাবের ছিল। রাগ বা অভিমান হলে প্রায়ই একা বাড়ি থেকে বেরিয়ে যেত। তবে মা অসুস্থ থাকলে যমজ দুই ছোট ভাইয়ের যত্ন নিত সে।
লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান বলেন, এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। উদ্ধার করা মোবাইল ফোনের কললিস্ট ও অন্যান্য ডিজিটাল তথ্য-প্রমাণ বিশ্লেষণ করে অধিকতর তদন্ত চলছে।
তদন্ত শেষ হলে পুরো ঘটনার বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য প্রকাশ করা সম্ভব হবে বলে জানান তিনি।

