মো. শাহাদাত হোসেন: আমরা সবাই মাটির মানুষ। অথচ মৃত্যুর পর সেই মাটির অধিকারটুকুও আজ অনেকের ভাগ্যে জুটছে না। এ কোনো বাহ্যিক আবেগের কথা নয়; এটি মানুষের অস্তিত্ব, মানবতা এবং বিবেককে নাড়া দেওয়া এক গভীর যন্ত্রণার গল্প।
একবার চোখ বন্ধ করে কল্পনা করুন। চারদিকে শুধু অথৈ পানি। সেই পানির বুক চিরে ভেসে যাচ্ছে বাঁশের তৈরি একটি ভেলা। ভেলার ওপর শুয়ে আছেন আমাদেরই কোনো এক ভাই, কোনো এক বোন। তিনি দুনিয়ার সব কষ্ট, ক্ষুধা আর তৃষ্ণার ঊর্ধ্বে চলে গেছেন। কিন্তু তাঁর স্বজনেরা শেষ বিদায়ের মুহূর্তেও তাঁকে দুই গজ শুকনো মাটিতে সমাহিত করার সুযোগ পাচ্ছেন না। কবর দেওয়ার মতো এক টুকরো জমিও যখন পানির নিচে তলিয়ে যায়, তখন মানুষের অসহায়ত্ব ভাষায় প্রকাশ করা যায় না।
ভাবুন, একজন প্রিয় মানুষকে শেষবারের মতো বুকে জড়িয়ে বিদায় জানাতে না পারার কষ্ট কতটা গভীর হতে পারে! তাই বাধ্য হয়ে কলাগাছ, বাঁশ আর ভেলা বানিয়ে তাঁর নিথর দেহ নিয়ে বেরিয়ে পড়তে হচ্ছে অজানা কোনো গন্তব্যের উদ্দেশে- শুধু একটি শুকনো মাটির খোঁজে।
আজ রাতে আমরা অনেকেই নিরাপদ ঘরে, শুকনো বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমাব। অথচ একই সময়ে কোথাও না কোথাও বন্যার পানিতে ভেসে বেড়াচ্ছে একটি নিথর দেহ, আর তার স্বজনেরা বুকভাঙা কান্না চেপে অসহায়ভাবে অপেক্ষা করছেন শেষ বিদায়ের একটি সুযোগের জন্য। এই দৃশ্য শুধু একটি পরিবারের নয়; এটি আমাদের সমগ্র মানবতার সামনে এক কঠিন প্রশ্ন।
আমাদের ধর্ম, আমাদের নৈতিকতা, আমাদের মানবিক শিক্ষা- সবই মানুষকে মানুষের পাশে দাঁড়াতে শেখায়। মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) শিক্ষা দিয়েছেন, যে ব্যক্তি কোনো মানুষের একটি কষ্ট লাঘব করে, আল্লাহ তাআলা তার বহু কষ্ট দূর করে দেন। এই শিক্ষা শুধু ধর্মীয় বাণী নয়; এটি মানবতার চিরন্তন আহ্বান।
আজ সময় এসেছে নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী এগিয়ে আসার। হয়তো আপনার সামান্য আর্থিক সহায়তা, এক প্যাকেট শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানির কয়েকটি বোতল, একটি ওষুধের প্যাকেট কিংবা একটি আন্তরিক সহযোগিতাই কোনো পরিবারের জন্য আশীর্বাদ হয়ে উঠতে পারে।
মনে রাখতে হবে, দুর্যোগে মানুষের পাশে দাঁড়ানো দান নয়- এটি আমাদের মানবিক দায়িত্ব।
আসুন, আমরা বিভেদ ভুলে একে অন্যের পাশে দাঁড়াই। বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের চোখের জল মুছতে যার যা সামর্থ্য আছে, তা নিয়ে এগিয়ে আসি। কারণ মানুষের সেবাই সবচেয়ে বড় মানবতা। আর যে হৃদয় মানুষের কষ্টে কাঁদে, সেই হৃদয়ই সত্যিকার অর্থে জীবন্ত।
আল্লাহ আমাদের সবাইকে মানবতার এই কঠিন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার তাওফিক দান করুন। আমিন।
সাংবাদিক ও মানবাধিকার কর্মী।

