বেলাল আহমদ, লামা (বান্দরবান): বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার দুর্গম কুরুকপাতা ইউনিয়নের বিভিন্ন পাড়ায় হামের প্রাদুর্ভাব বেড়েছে। জ্বর ও শরীরে ফুসকুড়িসহ উপসর্গ নিয়ে শতাধিক শিশু চিকিৎসা নিলেও এখনও অনেকেই চিকিৎসার বাইরে রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, চিকিৎসা না পেয়ে অন্তত পাঁচ শিশুর মৃত্যু হয়েছে।
উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কুরুকপাতা বাজার ও পোয়ামুহুরীতে অস্থায়ী মেডিকেল ক্যাম্প চালু করা হয়েছে। এসব ক্যাম্পে একসঙ্গে ৩০ জন রোগীকে চিকিৎসা দেওয়া সম্ভব। সেখানে তিনজন চিকিৎসক, তিনজন নার্স, একজন ল্যাব বিশেষজ্ঞ ও একজন সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল কর্মকর্তা দায়িত্ব পালন করছেন।
কুরুকপাতা ইউনিয়নে পাঁচ বছরের নিচে ৫৪৭ জন এবং পাঁচ বছরের বেশি বয়সী ৬৪১ জনকে হামের টিকা দেওয়া হয়েছে। কুরুকপাতা ক্যাম্পে প্রথম দিন জ্বর ও ফুসকুড়ি নিয়ে ৮০ জন চিকিৎসা নিতে এলে তাদের মধ্যে পাঁচজনের হাম শনাক্ত হয়। পরের দিন আরও ৫২ জন একই উপসর্গ নিয়ে এলে তাদের মধ্যে ছয়জনের সংক্রমণ পাওয়া যায়।
আলীকদম স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার পর্যন্ত উপজেলায় ৮৪ জন হাসপাতালে চিকিৎসা নিয়েছেন এবং ৫৮ জন ভর্তি ছিলেন। এ ছাড়া লামা ও নাইক্ষ্যংছড়িতে আরও ছয়জন রোগী হামের উপসর্গ নিয়ে চিকিৎসাধীন রয়েছেন। শুক্রবার নতুন করে আরও ১০ জন হাসপাতালে ভর্তি হয়েছেন। পোয়ামুহুরীতে ২৮ জন আক্রান্ত চিকিৎসা নিচ্ছেন।
স্থানীয়দের ভাষ্য, ইউনিয়নের প্রায় প্রতিটি পাড়ায় হামের প্রাদুর্ভাব রয়েছে। ইয়াংরিং পাড়ার একটি হোস্টেলের এক শিক্ষার্থী একই উপসর্গে মারা যাওয়ার ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। প্রেন্নই হোস্টেলের পরিচালক উথোয়াইংগ্যা মারমা বলেন, দুর্গম পাহাড়ি এলাকা হওয়ায় সেখানে স্বাস্থ্যসেবা পৌঁছানো কঠিন। অসুস্থ শিশুদের বাড়িতে পাঠানো হয়েছিল। তাদের মধ্যে চাংমুম ম্রো হাসপাতালে আসার পথে মারা যায়। সে হোস্টেলের তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী ছিল।
স্থানীয় বাসিন্দা মেসা ম্রো বলেন, কোনো শিশু অসুস্থ হলে প্রথমে হেঁটে দড়িপাড়া পর্যন্ত যেতে হয়। এরপর আলীকদম সদর হাসপাতালে নিতে প্রায় ৬০০ টাকা খরচ হয়, যা অনেক পরিবারের পক্ষে সম্ভব নয়। মোবাইল নেটওয়ার্ক না থাকায় জরুরি সময়ে যানবাহন ডাকার সুযোগও নেই।
স্থানীয় ইউপি সদস্য সাংলুকং ম্রোর অভিযোগ, শুরুতে পোয়ামুহুরীতে ক্যাম্প না দিয়ে কুরুকপাতায় স্থাপন করায় অনেকেই চিকিৎসা থেকে বঞ্চিত হয়েছেন। দীর্ঘদিন নিয়মিত টিকাদান কার্যক্রম না থাকায় এই পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন।
কুরুকপাতা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান ক্রাত পুং ম্রো বলেন, হাম-সদৃশ উপসর্গে পাঁচ শিশুর মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। পাড়ায় পাড়ায় টিকা নেওয়ার জন্য সবাইকে উৎসাহিত করা হচ্ছে। তবে কুসংস্কার ও টিকা সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে অনেকেই টিকা নিচ্ছেন না।
উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের কর্মকর্তা ডা. মো. আবু হানিফ বলেন, কুরুকপাতা ইউনিয়নের ২৮ জন ম্রো শিশু হাসপাতালে ভর্তি ছিল। ম্রো সম্প্রদায়ের অনেকেই টিকা নিতে আগ্রহী নন। তাই পাড়ায় পাড়ায় গিয়ে টিকা দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্যকর্মীদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
আলীকদম উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) মনজুর আলম বলেন, আক্রান্তদের পরিবহন ও ওষুধসহ প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। আগের তুলনায় হামের প্রাদুর্ভাব কিছুটা কমেছে। টিকাদান কার্যক্রম চলমান থাকবে বলে জানান তিনি।

