মুহাম্মদ কাইসার হামিদ (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী ইউএনও অফিসের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে আবারও অভিযোগ উঠেছে। এবার এক সাংবাদিকের পেশাগত দায়িত্ব পালনকালে অশোভন, অসৌজন্যমূলক ও দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণের অভিযোগে গত ১৯ নভেম্বর বুধবার (অভিযোগের স্বাক্ষরের নিচে ভুলবশত ২০ নভেম্বর তারিখ উল্লেখ করা হয়) কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন দৈনিক বাংলাদেশের খবর কটিয়াদী উপজেলা প্রতিনিধি মিজানুর রহমান। তিনি দৈনিক বাংলাদেশের খবর পত্রিকার কটিয়াদী উপজেলা প্রতিনিধির পাশাপাশি কিশোরগঞ্জ জেলা গণঅধিকার পরিষদের সহ-সাংগঠনিক সম্পাদক।
ভুক্তভোগী সাংবাদিক মিজানুর রহমান জানান, গত ১৭ নভেম্বর সোমবার দুপুরে তাঁর পেশাগত দায়িত্ব পালনের অংশ হিসেবে উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে পত্রিকা দেওয়ার জন্য প্রবেশ করেন। পত্রিকা দেওয়ার পর তিনি দ্রুত অফিস ত্যাগ করেন। কিন্তু অফিসের বাইরে বের হওয়ার পর ওই অফিসের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম খান আনসার সদস্যদের উদ্দেশ্য করে প্রকাশ্যে অশালীন ও অশ্লীল ভাষায় তাঁদের অপমান করেন এবং সাংবাদিক মিজানুর রহমানকে কেন অফিসে প্রবেশ করতে দেওয়া হলো তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন ও ধমক দেন।
মিজানুর রহমান আরও বলেন, একজন সরকারি কর্মকর্তার এমন দায়িত্বহীন ও অপেশাদার আচরণ শুধু আনসার সদস্যদের মর্যাদা ক্ষুণ্ন করেনি, বরং এটি প্রশাসনিক শিষ্টাচার, নাগরিক অধিকার এবং সাংবাদিকতার স্বাধীনতার পরিপন্থী। এ ধরনের আচরণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের ভাবমূর্তি ও জনআস্থা নষ্ট করার দৃষ্টান্ত হয়ে দাঁড়ায়। তিনি অভিযোগ করে বলেন, অভিযোগ দাখিলের প্রায় তিন সপ্তাহ অতিক্রান্ত হলেও এ ঘটনার কোনো প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় তিনি হতাশায় ভুগছেন। শুধু তাই নয়- জেলা প্রশাসক মহোদয় এনামুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় দায়িত্বহীন আচরণের সাহস কর্মকর্তাদের মধ্যে বেড়ে যেতে পারে বলেও তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করেন। এটি প্রশাসনিক শৃঙ্খলা ও জনস্বার্থের জন্য মারাত্মক হুমকিস্বরূপ বলেও উল্লেখ করেন তিনি।
জানা যায়, কিশোরগঞ্জ জেলার ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় এনামুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে গত বছরের ২৬ ফেব্রুয়ারি ভৈরব থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক দুর্জয় দরশন পত্রিকায় ‘ফলোআপ- এনামুলের খুঁটির জোর কোথায়?’ শিরোনামে, ওই বছরের ৪ মার্চ ‘নিয়ম-নীতির তোয়াক্কা না করে ভৈরবে একই চেয়ারে একযুগেরও বেশি সময় দায়িত্বে রয়েছেন উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল ইসলাম খান’ শিরোনামে এবং সেই বছরের ৫ অক্টোবর ‘জরুরি দুদকের তদন্ত প্রয়োজন- একই কর্মস্থলে ১৬ বছর কাটিয়েছেন উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল, করছেন সরকারি টাকা হরিলুট’ শিরোনামে ফলোআপ সংবাদ প্রকাশিত হয়। এসব প্রকাশের পর ৪ নভেম্বর ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম খানকে একটি অফিস আদেশের মাধ্যমে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে বদলি করা হয়।
ঐ বছরের ৯ নভেম্বর সাপ্তাহিক দুর্জয় দরশন পত্রিকায় ‘অবশেষে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল বদলি, জনমনে স্বস্তি’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। পরদিন ১০ নভেম্বর সকালে তিনি ভৈরব কর্মস্থল ত্যাগ করে কটিয়াদী উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে যোগদান করেন। এরপর ১৬ নভেম্বর সাপ্তাহিক দুর্জয় দরশন পত্রিকায় ‘একই কর্মস্থলে ১৬ বছর কাটানোর পর বদলি-বিদায় নিলেন ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ের উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা এনামুল’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হলে সাংবাদিকদের মাধ্যমে তাঁর দুর্নীতির তথ্য বেরিয়ে আসে, এবং এরপর থেকেই সাংবাদিক দেখলেই তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে তাঁদের সঙ্গে অশোভন আচরণ করতে থাকেন।
এ বিষয়ে ৩ ডিসেম্বর বুধবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে অভিযুক্ত মো. এনামুল ইসলাম খানের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি প্রথমে বলেন, সাংবাদিক মিজানুর রহমানের সাথে তাঁর তেমন কিছুই হয়নি। পরে তিনি দাবি করেন, তাঁর বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে কর্মরত থাকা অবস্থায় উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. এনামুল ইসলাম খানের বিরুদ্ধে সীমাহীন অনিয়ম ও দুর্নীতি করে কোটি কোটি টাকার মালিক বনে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছিল। চাকরি বিধি অনুযায়ী ৩ বছর পরপর বদলির নিয়ম থাকলেও তিনি একই কর্মস্থলে প্রায় ১৬ বছর চাকরি করায় জনমনে প্রশ্ন দেখা দেয়- একই কর্মস্থলে থাকার নেপথ্যে রহস্য কী? তাঁর লাভ কী? অনেকে প্রশ্ন তুলেছিলেন- এনামুল ইসলাম খানের খুঁটির জোর কোথায়? কারণ এর আগেও তাঁর বিরুদ্ধে বিভিন্ন দপ্তরে একাধিক লিখিত অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার পাননি ভুক্তভোগীরা। জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকায় সংবাদ প্রকাশিত হলেও কিসের ক্ষমতায় তিনি একই চেয়ারে এত দীর্ঘ সময় বহাল তবিয়তে ছিলেন- তা নিয়েও প্রশ্ন দেখা দেয়।
সরকারি চাকরিতে একই স্টেশনে ৩ বছরের বেশি থাকার বিধান না থাকলেও এনামুল ইসলাম খান তৎকালীন সময়ে কিশোরগঞ্জ জেলা বদলি শাখার কিছু অসৎ কর্মকর্তাকে প্রতি মাসে মোটা অঙ্কের টাকা দিয়ে ভৈরবে দীর্ঘ ১৬ বছর টিকে ছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
এনামুল ইসলাম খান কিশোরগঞ্জ জেলার করিমগঞ্জ উপজেলার বৌলাই ইউনিয়নের খাংগাইল গ্রামের মো. ফাইজুর রহমান খান ও মোছা. খুজিস্তা আক্তার খানমের পুত্র। তিনি ২০০৯ সালের ১৩ জুলাই সার্ট মুদ্রাক্ষরিক হিসেবে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে যোগদান করেন। পরে ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার কার্যালয়ে উপ-প্রশাসনিক কর্মকর্তা হিসেবে ১৬ বছর কর্মরত থেকে কর্মবণ্টনে বৈষম্য, অনিয়ম ও বিভিন্ন দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়েন- এমন অভিযোগ এনে গত ২০২৩ সালের ৩ অক্টোবর ভৈরব উপজেলা নির্বাহী অফিসার বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়।
এছাড়াও দৈনিক হাজিরায় নিয়োগপ্রাপ্ত মোহাম্মদ আলী ও দর্পণ হরিজনের নামে সম্পূর্ণ বেতন বিল করে অর্ধেক পরিশোধ করে বাকি অংশ অন্য খাতে দেখানোর অভিযোগে কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসক বরাবর আরেকটি অভিযোগ করেন একজন ভুক্তভোগী। মোবাইল কোর্টের ভয় দেখিয়ে অভিনব কৌশলে মোটা অঙ্কের টাকা আদায়ের অভিযোগে শামীম আলম নামে জনৈক ব্যক্তি ২০২৩ সালের ৫ মার্চ ঢাকা বিভাগীয় কমিশনার বরাবর আরেকটি লিখিত অভিযোগ করেন। দীর্ঘদিন একই কর্মস্থলে থাকার সুযোগে ইউএনও’র নাম ভাঙিয়ে অবৈধ কয়েল ফ্যাক্টরি, ইটভাটা, চানাচুর-বিস্কুট কারখানা, অবৈধ প্রসাধনী কারখানা, হাসপাতাল, তেল ফ্যাক্টরি থেকে মাসিক চাঁদা আদায় করতেন- এমন অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে। বিশেষ দিবসে চাঁদা আদায়ের নামে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেওয়ার অভিযোগও করেছিলেন এক ভুক্তভোগী। এছাড়াও ভুয়া ভাউচার তৈরি করে অফিসের টাকা আত্মসাৎ করার অভিযোগও ওঠে তাঁর বিরুদ্ধে।
অল্প বেতনে কিশোরগঞ্জ কালেক্টরেট কর্মচারী ক্লাবের বাসায় ভাড়া থেকে প্রতিদিন অফিস করা, সন্তানদের নামিদামি স্কুলে পড়ানো এবং স্ত্রী শামসুন্নাহারের নামে ও সালকের নামে একাধিক জায়গা-সম্পত্তি ক্রয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছিল। স্ত্রী গৃহিণী হওয়া সত্ত্বেও তাঁর নামে ইনকাম ট্যাক্সের ফাইল খোলা ও ব্যাংক ব্যালেন্স রাখা নিয়েও সন্দেহ সৃষ্টি হয়। বিভিন্ন তত্ত্বসূত্রে জানা যায়, তিনি তৃতীয় শ্রেণির চাকরি করে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। দুদক বা গোয়েন্দা সংস্থা তদন্ত করলে আরও অজানা তথ্য বেরিয়ে আসবে বলে অনেকেই মনে করেন।
আরও জানা যায়, গত বছরের ২৮ নভেম্বর সোনালী ব্যাংক লি. ভৈরব শাখা থেকে তিনি ৫০ লাখ টাকা উত্তোলন করেন। এছাড়া তৎকালীন ভৈরব উপজেলার বিদায়ী উপজেলা নির্বাহী অফিসার তাঁকে ১৭ লাখ টাকা দিয়ে যান। এত টাকা কোথায় খরচ হয়েছে তার সঠিক তথ্য জানা যায় না। তবে অনেকের প্রশ্ন- এনামুল ইসলাম খানের খুঁটির জোর কোথায়?

