সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

রামিসার রক্তে রঞ্জিত নগরী: আমরা আর কত নীরব থাকবো?

বিচারহীনতার এই নরকে আমরা কার ভরসায় বেঁচে আছি?

বিচারহীনতার এই নরকে আমরা কার ভরসায় বেঁচে আছি? মো. শাহাদাত হোসেন: রামিসার মৃত্যু শুধু একটি পরিবারের বুকভাঙা শোক নয়, এটি আমাদের পুরো সমাজ, রাষ্ট্র এবং বিবেকের গভীর ব্যর্থতার এক নির্মম প্রতিচ্ছবি।

একটি সভ্য রাষ্ট্রের সবচেয়ে মৌলিক পরিচয় হলো মানুষের জীবনের নিরাপত্তা এবং অন্যায়ের সুষ্ঠু বিচার নিশ্চিত করা। কিন্তু আমরা আজ এমন এক নির্মম বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আছি, যেখানে এই দুটি শব্দ যেন কেবল বইয়ের পাতায় লেখা কিছু শূন্য প্রতিশ্রুতি। বাস্তব জীবনে সেগুলো এখন প্রহসন, ব্যঙ্গ, আর অসহায়ের দীর্ঘশ্বাস ছাড়া আর কিছু নয়। সম্প্রতি রাজধানীতে ঘটে যাওয়া রামিসার মর্মান্তিক ও নৃশংস হত্যাকাণ্ড শুধু একটি প্রাণ কেড়ে নেয়নি; এটি আমাদের তথাকথিত সভ্য সমাজ ব্যবস্থার মুখোশ ছিঁড়ে দিয়েছে। আবারও প্রমাণ হয়েছে- এই নগরী, এই রাষ্ট্র, এই সমাজ ক্রমেই এমন এক জায়গায় পরিণত হচ্ছে, যেখানে সাধারণ মানুষের জীবন আর নিরাপদ নয়; এটি যেন ধীরে ধীরে এক নীরব বধ্যভূমিতে রূপ নিচ্ছে।

কিন্তু এই নির্মম হত্যাকাণ্ডের চেয়েও বেশি যেটি হৃদয় বিদীর্ণ করে, সেটি হলো রামিসার বাবার নিঃশব্দ, পাথর হয়ে যাওয়া অবয়ব। তিনি তার আদরের মেয়ের খুনের বিচার পর্যন্ত চাইছেন না। একজন বাবা, যার বুকের ধন, যার জীবনের আলো, যার চোখের মণি এভাবে নির্মমভাবে কেড়ে নেওয়া হয়েছে- তিনি যদি বিচার চাওয়ার আশা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলেন, তবে বুঝতে হবে তার ভেতরে কতটা গভীর হতাশা জমে আছে। কতবার তিনি ভেঙেছেন, কতবার তিনি দেখেছেন অন্যায়ের কাছে সত্যের পরাজয়, কতবার তিনি জেনেছেন, এই দেশে বিচার মানে দীর্ঘ অপেক্ষা, অপমান, হয়রানি, আর শেষ পর্যন্ত শূন্য হাতে ফিরে আসা।

একজন বাবার এই বিচার না চাওয়ার সিদ্ধান্ত কোনো ব্যক্তিগত দুর্বলতা নয়; এটি গোটা রাষ্ট্রব্যবস্থার প্রতি এক নিঃশব্দ কিন্তু ভয়াবহ অভিযোগ। এটি এমন এক চপেটাঘাত, যা আমাদের আইন, প্রশাসন এবং সমাজের মুখে সজোরে আঘাত করে। এই নীরবতা কোনো শব্দহীনতা নয়, এটি এক মহাসমুদ্রসম ক্ষোভ, এক অশেষ ক্লান্তি, এক মৃতপ্রায় আস্থার শেষ আর্তনাদ। তিনি হয়তো জানেন, ক্ষমতার দাপট, অর্থের প্রভাব, পরিচয়ের জোর আর আইনের ফাঁকফোকরে অপরাধীরা একদিন আবার স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যাবে। কিন্তু তার ঘর? তার বুক? তার প্রতিটি সকাল? সেগুলো তো আর কখনো স্বাভাবিক হবে না।

আমরা প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠি, অথচ জানি না দিনশেষে প্রিয় মানুষগুলো সবাই ঘরে ফিরবে কি না। সন্তান স্কুলে গেলে, স্বামী কাজে গেলে, স্ত্রী বাজারে গেলে- একটা অদৃশ্য ভয় আমাদের বুকের ভেতর বাসা বেঁধে থাকে। কেউ ফোন না ধরলে বুক ধকধক করে। সন্ধ্যায় সবাই অক্ষত অবস্থায় ঘরে ফিরলে আমরা স্বস্তি পাই, কিন্তু একটু ভাবুন, এই স্বস্তি কি স্বাভাবিক? নিজের আপনজন বেঁচে ফিরে এসেছে বলে প্রতিদিন কৃতজ্ঞ হওয়া, এ কি সভ্য জীবনের লক্ষণ, নাকি এক গভীর সামাজিক ব্যর্থতার চিহ্ন?

রামিসার মতো একটি নিষ্পাপ, প্রাণোচ্ছ্বল শিশু বা তরুণী যখন এভাবে অকালেই ঝরে যায়, তখন শুধু একটি পরিবার নয়, পুরো সমাজ একটু করে মরে যায়। একটি মায়ের কোল খালি হয়, একটি বাবার পৃথিবী থেমে যায়, একটি ঘরের দেয়ালে ঝুলে থাকা ছবিগুলো নিঃশব্দে কাঁদে। অথচ আমরা-পাশের মানুষ, প্রতিবেশী, নাগরিক- কয়েকদিন শোক প্রকাশ করি, কিছু স্ট্যাটাস লিখি, তারপর আবার অভ্যস্ত হয়ে যাই। এই অভ্যস্ত হয়ে যাওয়াটাই সবচেয়ে ভয়ঙ্কর। কারণ নীরবতা অপরাধীকে সাহসী করে তোলে, আর প্রতিবাদের অভাব অন্যায়ের শিকড়কে আরও গভীরে প্রোথিত করে।

আমরা কিসের ভরসায় বাঁচি?

আইনের শাসন: যা আজ অনেক ক্ষেত্রেই ক্ষমতাবানদের ইচ্ছার কাছে অসহায়। আইন যেন আর অন্ধ নয়; বরং অপরাধীর পরিচয়, সামাজিক অবস্থান আর প্রভাব দেখে তার চোখ খোলে বা বন্ধ হয়।

সামাজিক নিরাপত্তা: যা আমাদের সন্তানদের নিরাপদ রাখতে ব্যর্থ, অথচ রাষ্ট্র উন্নয়ন আর অগ্রগতির গল্প শোনাতে ব্যস্ত।

বিবেক ও মূল্যবোধ: যা আজ সমাজের ডাস্টবিনে পড়ে আছে। এখানে মানুষের চেয়ে ক্ষমতার মূল্য বেশি, সত্যের চেয়ে প্রভাবশালীর কথা বেশি গুরুত্বপূর্ণ।

এমন এক পচে যাওয়া, জঘন্য এবং অমানবিক সমাজে প্রতিদিন বেঁচে থাকাটাও কখনো কখনো এক ধরনের শাস্তি মনে হয়। রামিসার বাবার নীরবতা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে, আমরা কতটা অসাড় হয়ে গেছি। আজ যদি আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে, বিচারহীনতার সংস্কৃতির বিরুদ্ধে, এই সামাজিক পচনের বিরুদ্ধে একসঙ্গে দাঁড়াতে না পারি, তাহলে মনে রাখতে হবে- পরবর্তী শোকের খবরটি আপনার বা আমার ঘরেও আসতে পারে। তখন আমাদের চিৎকারও হয়তো এই শহরের কংক্রিটের দেয়ালে প্রতিধ্বনি হয়ে ফিরে আসবে, কিন্তু কোনো দরজা খুলবে না।

রামিসার জন্য মাগফিরাত কামনা করি, কিন্তু সেই দোয়াতেও আজ এক গভীর লজ্জা মিশে আছে। কারণ আমরা তাকে একটি নিরাপদ পৃথিবী দিতে পারিনি। আমরা তাকে রক্ষা করতে পারিনি। আমরা তার জন্য ন্যায়বিচারের নিশ্চয়তা দিতে পারিনি।

এই দায় শুধু খুনির নয়। এই দায় আমাদেরও। আমাদের নীরবতার, আমাদের ভীরুতার, আমাদের দ্রুত ভুলে যাওয়ার। আমরা যখন অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়াই না, তখন আমরা অজান্তেই অন্যায়ের পক্ষকে শক্তিশালী করি। রামিসার রক্ত শুধু এক ঘরের নয়, এটি আমাদের সবার বিবেকের ওপর লেগে থাকা এক দাগ।

এই দাগ মুছবে না কেবল শোক প্রকাশে। এই দাগ মুছবে না কিছু আবেগঘন কথায়। এই দাগ মুছবে তখনই, যখন আমরা সত্যিকার অর্থে এমন এক সমাজ গড়তে চাইব, যেখানে একজন বাবা তার সন্তানের খুনের বিচার চাওয়ার আশাটুকু হারাবে না।

যে দিন একজন সাধারণ মানুষ রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে পারবে, যে দিন অন্যায়ের বিচার অর্থ ও ক্ষমতার কাছে হার মানবে না, যে দিন কোনো মা তার সন্তান বাইরে গেলে বুক কাঁপিয়ে অপেক্ষা করবে না- সেদিনই আমরা নিজেদের সভ্য বলতে পারব।

তার আগে, আমরা শুধু বেঁচে আছি, কিন্তু মানুষ হয়ে নয়, আতঙ্কে থমকে থাকা এক অনিশ্চিত অপেক্ষার মধ্যে।

প্রচার ও প্রকাশনা সম্পাদক

পিসওয়ে হিউম্যান রাইটস সোসাইটি

দোহার-নবাবগঞ্জ উপজেলা শাখা, ঢাকা।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *