সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

আড়িয়াল বিলের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বিবরণ

আড়িয়াল বিলের ঐতিহাসিক ও প্রাকৃতিক বিবরণ

কলম লেখক ও গবেষক বীর মুক্তিযোদ্ধা ইব্রাহীম খলিল সবুজ: আড়িয়াল বিলের উত্তরাংশে আমন ফসল রক্ষার্থে ব্রিটিশ আমল থেকে নব্বইয়ের দশক পর্যন্ত আলমপুর থেকে মরিচপট্টি পর্যন্ত প্রায় ৮ কিলোমিটার এলাকায় গজারী গাছের খুঁটি পোঁতা ছিল। মোটা কয়েক স্তরের তার দিয়ে পুরো অংশ ঘিরে রাখা হতো, যাতে দক্ষিণ পাশে জমে থাকা কচুরিপানার ঢেউ বাধা পেয়ে দুর্বল হয়ে যায়। এর ফলে উত্তরের জনপদের আমন ধান ও বাড়িঘর ভাঙন থেকে রক্ষা পেত।

পরবর্তীতে এ অঞ্চলে ফসল উৎপাদন বৃদ্ধি পাওয়ায় আনন্দের স্মারক হিসেবে ভাঙাভিটায় বড় আকারে নৌকা বাইচের আয়োজন করা হতো। বিল এলাকায় গেলে উত্তরে সারিবদ্ধ কালো খুঁটির সারি চোখে পড়ত।

মুন্সিগঞ্জ এবং ঢাকা জেলার শ্রীনগর, নবাবগঞ্জ ও দোহার উপজেলার প্রায় ১ লাখ ৬৭ হাজার একর জায়গা জুড়ে পদ্মা, ধলেশ্বরী ও ইছামতির মাঝখানে আড়িয়াল বিলের অবস্থান। এর দৈর্ঘ্য প্রায় ২৬ কিলোমিটার এবং প্রস্থ প্রায় ১২ কিলোমিটার।

এর প্রাচীন নাম ছিল ‘চুড়াইন বিল’। বিক্রমপুর অঞ্চলের ইতিহাস থেকে জানা যায়, আড়িয়াল খাঁ নামের ব্রহ্মপুত্রের একটি শাখা নদী একসময় এ অঞ্চল দিয়ে প্রবাহিত হতো। পরবর্তীতে গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্রের গতিপথ পরিবর্তনের ফলে নদীর এ অংশ মৃত নদীতে পরিণত হয়ে বিলের রূপ নেয়। সেই নদীর নামানুসারে এর নাম হয় ‘আড়িয়াল বিল’।

বিলের সীমানা:

  • দক্ষিণে: দয়হাটা, শ্যামসিদ্ধি, প্রাণীমণ্ডল, সেলামতি, মত্তগ্রাম, গাদিঘাট, রাড়িখাল, মাইজপাড়া
  • উত্তরে: শ্রীধরপুর, বাড়ৈখালী, আলমপুর, শেখরনগর, মদনখালি, সুতারপাড়া, তেঘরিয়া
  • পূর্বে: হাঁসাড়া, ষোলঘর, কেয়টখালী, লস্করপুর, মোহনগঞ্জ
  • পশ্চিমে: কামারগাঁও, বালাসুর, জয়পাড়া, জগন্নাথপট্টি, কাঁঠালবাড়ী, মরিচপট্টি, মহুতপাড়া

বিলে ছোট-বড় প্রায় হাজারেরও বেশি জলাধার ও ডোবা রয়েছে। বড় দিঘিগুলো অনেকাংশেই জমিদার বা স্থানীয় রাজাদের খননকৃত। উল্লেখযোগ্য দিঘির মধ্যে রয়েছে- নৈমুদ্দিন, বাগমারা, সাগরদিঘী, কালাচান দিঘি, বসুমালা, লালদিঘী, ঘোড়াপট্টি, টঙ্গীবাড়ি, হাসিমুল্লাহ, বালিবুইন্না, সলেমান দিঘীসহ আরও অনেক।

এ সকল জলাশয়ের মাছ স্টিমারে করে কলকাতা পর্যন্ত যেত। এজন্য বালাসুর এলাকায় একটি বরফকলও নির্মিত হয়েছিল।

প্রথমদিকে বিল ছিল মাছ ধরার প্রধান কেন্দ্র। পরে পলি জমে বিল ভরাট হলে শুষ্ক মৌসুমে বোরো ধান চাষ শুরু হয়। শীতকালে রবিশস্য ও ভিটায় করল্লা, খিরাই, টমেটো, কুমড়া, লাউসহ নানা সবজির আবাদ হতো।

বর্ষাকালে এখানে বিশাল জলরাশি থাকত, ঢেউ উত্তরের জনপদে আছড়ে পড়ত। গরুর খাদ্যের জন্য ‘মনকা’ বা ‘ময়না’ ঘাস নৌকায় করে আনা হতো।

একসময় আড়িয়াল বিল ছিল দেশি-বিদেশি পাখির অভয়ারণ্য। রাজহাঁস, বালিহাঁস, পানকৌড়ি, নিশিবকসহ বহু প্রজাতির পাখি এখানে দেখা যেত। সকালে বুনো হাঁস পদ্মার চরে যেত, সন্ধ্যায় আবার বিলে ফিরত।

বর্তমানে পরিবেশগত পরিবর্তন ও মানব হস্তক্ষেপে এসব পাখির সংখ্যা অনেক কমে গেছে।

বর্তমানে বিল এলাকায় পানি প্রবাহ কমে গেছে। পদ্মার পলি না আসায় জলজ প্রাণী ও উদ্ভিদ ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। অতিথি পাখির আগমনও প্রায় বন্ধ হয়ে গেছে। ইটভাটা, বসতি সম্প্রসারণ ও টপসয়েল কেটে নেওয়ার কারণে বিলের প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য হুমকির মুখে।

গাদিঘাট একসময় অবহেলিত জল-কাদা অঞ্চল ছিল। রাস্তাঘাট ছিল অনুন্নত। পরে ধীরে ধীরে উন্নয়ন ঘটে।

এ এলাকার শিক্ষক নুরমোহাম্মদ স্যার ও রফিক স্যার স্থানীয়ভাবে অত্যন্ত সম্মানিত ছিলেন। একসময় বর্ষাকালে এখানে ২০-২৫ হাত পানি হতো, ফলে বাড়িঘর ও কৃষি ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতো।

গাদিঘাট ও আশপাশের এলাকা কুমড়া, লাউ, করল্লা ইত্যাদি সবজির জন্য বিখ্যাত। তিনদোকান বাজার ও মাইজপাড়া বাজারে বিলের তাজা মাছ ও সবজি পাওয়া যায়।

সকালে ও বিকেলে মাছ উঠলে তা দ্রুত বিক্রি হয়ে যায়। স্থানীয়ভাবে কিছু হোটেল গড়ে উঠেছে, যেখানে নাস্তা ও সাধারণ খাবার পাওয়া যায়।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *