ঢাকার দোহার উপজেলার ইতিহাসে জনদরদী নেতা, শিক্ষানুরাগী, দানবীর ও মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক হিসেবে আশরাফ আলী চৌধুরী (মধু মিয়া) এবং তাঁর ছোট ভাই জি. এস. চৌধুরী (গোলাম শফিউদ্দিন চৌধুরী-আতা মিয়া) আজও শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণীয় হয়ে আছেন। শিক্ষা, সমাজসেবা, জনকল্যাণ এবং প্রশাসনিক দক্ষতায় এই দুই ভাই দোহার-নবাবগঞ্জসহ সমগ্র দেশের মানুষের হৃদয়ে স্থায়ী আসন করে নিয়েছেন।
আশরাফ আলী চৌধুরী (মধু মিয়া) জন্মগ্রহণ করেন ১৯১৮ সালের ১ অক্টোবর ঢাকার দোহার উপজেলার জয়পাড়ায়। তাঁর পিতা ছিলেন গোলাম রাসূল চৌধুরী (দুখু মিয়া) এবং মাতা রাহিমুন্নেসা বেগম। তিনি ছিলেন একজন আয়কর উপদেষ্টা, মুক্তিযুদ্ধের সংগঠক, স্বাধীন বাংলা ফুটবল দলের সভাপতি, ঢাকা জেলার গভর্নর (১৯৭৫), ১৯৭০ সালের জাতীয় নির্বাচনে এমএনএ (দোহার-নবাবগঞ্জ-কেরানীগঞ্জ) এবং ট্যাক্সেস বার অ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠাতা সদস্য।
১৯৭০ ও ১৯৭৩ সালের জাতীয় নির্বাচনে তিনি বিপুল ভোটে বিজয়ী হয়ে জনগণের অকুণ্ঠ সমর্থন লাভ করেন। সেই সময় সকল এমপির চেয়ে বেশি সংখ্যক ভোট পেয়ে বিজয়ী হওয়ার বিরল সম্মান অর্জন করেন তিনি। আজও দোহারবাসীর মুখে “মধু ভাই, মধু ভাই” জয়ধ্বনি উচ্চারিত হয়।
মধু মিয়া ছিলেন শিক্ষা বিস্তারের অন্যতম অগ্রদূত। তিনি প্রতিষ্ঠা ও ভূমিদান করেন জয়পাড়া কলেজ, জয়পাড়া টেকনিক্যাল/ভোকেশনাল কলেজ, জয়পাড়া প্রাইমারি বিদ্যালয় (মধু মিয়ার স্কুল) এবং জমিলা স্মৃতিভবন। এছাড়া তিনি দোহার-নবাবগঞ্জ কলেজ (ডি.এন. কলেজ) এবং পুরানা পল্টনের নিধু স্মৃতি প্রাইমারি স্কুলের অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ছিলেন।
তিনি বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের ট্রাস্টি ও কোষাধ্যক্ষ হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন। শিক্ষা, সংস্কৃতি ও জনকল্যাণে তাঁর অবদান আজও মানুষ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করে।
১৯৭৬ সালের ৬ ডিসেম্বর তিনি ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। তাঁকে বনানী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।
অন্যদিকে তাঁর ছোট ভাই জি. এস. চৌধুরী (গোলাম শফিউদ্দিন চৌধুরী-আতা মিয়া) জন্মগ্রহণ করেন ১৯২৫ সালের ১ এপ্রিল জয়পাড়ায়। তিনিও ছিলেন একজন বিশিষ্ট সরকারি কর্মকর্তা, সমাজহিতৈষী ও শিক্ষানুরাগী ব্যক্তি।
তিনি গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের শিল্প মন্ত্রণালয়ের অ্যাডিশনাল সেক্রেটারি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং ১৯৮৪ সালে অবসর গ্রহণ করেন। পরবর্তীতে ইনকাম ট্যাক্স ট্রাইবুনালের সদস্য হিসেবেও দায়িত্ব পালন করেন।
স্থানীয় সরকার ব্যবস্থায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখে তিনি দোহার উপজেলার প্রথম উপজেলা চেয়ারম্যান হিসেবে ১৯৮৫ থেকে ১৯৯০ সাল পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। তাঁর প্রশাসনিক দক্ষতা ও জনকল্যাণমূলক কর্মকাণ্ড আজও মানুষের মুখে মুখে ফিরছে।
শিক্ষা বিস্তারেও তাঁর অবদান ছিল অনন্য। তিনি জয়পাড়া কলেজ এবং জয়পাড়া টেকনিক্যাল কলেজের ভূমিদাতা হিসেবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
১৯৯৮ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার পল্টনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁকে জয়পাড়ার পারিবারিক কবরস্থানে দাফন করা হয়।
দোহারের চৌধুরী পরিবারের এই দুই ভাই শুধু ব্যক্তি নন, তারা ছিলেন একটি আদর্শ, একটি ইতিহাস। মানবিকতা, দানশীলতা, জনসেবা এবং শিক্ষা বিস্তারে তাঁদের অবদান আজও দোহারবাসীর গর্ব। তাদের দান, মহত্ত্ব ও সমাজের প্রতি ভালোবাসা কোনোদিন ভোলার নয়।
দোহারবাসী বিশ্বাস করে, দুই ভাই মধু মিয়া ও আতা মিয়ার মতো মানুষ বারবার জন্ম নেন না। তারা চিরঅম্লান হয়ে থাকবেন ইতিহাসে, মানুষের হৃদয়ে এবং প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে শ্রদ্ধাভরে স্মরণীয় হয়ে।

