সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

একজন জহির আলী স্যার

একজন জহির আলী স্যার

আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): ৬ ফেব্রুয়ারি। সন্ধ্যা তখন প্রায় ৭টা। মৌলভীবাজার রোড ধরে হেঁটে যাচ্ছিলাম। হঠাৎ চোখে পড়ল শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান ফটকের পাশের ছোট পকেট গেটটি খোলা। ভেতর থেকে আলো ছড়িয়ে পড়ছে নীরব অন্ধকারে। মনের অজান্তেই থমকে দাঁড়ালাম। কৌতূহল আমাকে টেনে নিল বিদ্যালয় প্রাঙ্গণের ভেতরে।

নীরব ক্যাম্পাস। বারান্দা ধরে নৈশপ্রহরীর ধীর, একঘেয়ে পায়চারি। চারদিকে যেন দিনের সমস্ত কোলাহল হারিয়ে গেছে। ঠিক তখনই বারান্দায় পা দিতেই চোখে পড়ল একটি দৃশ্য- একটি কক্ষে গভীর মনোযোগে কাজ করছেন বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মো. জহির আলী। সন্ধ্যা ৭টা পেরিয়ে গেছে, অথচ তিনি একা বসে কাগজপত্রে চোখ রেখেছেন; কলম থামছে না। মনে হলো, সময় যেন তার কাছে কোনো অজুহাত নয়- দায়িত্বই তার একমাত্র সঙ্গী।

তিনি তখনো আমাকে খেয়াল করেননি। কাজে ডুবে আছেন। আমি কিছুক্ষণ দূরে দাঁড়িয়ে ভাবছিলাম- একজন মানুষ কতটা দায়িত্বশীল হলে দিনের শেষে, সবাই যখন ঘরের পথে, তখনো অফিসের আলো জ্বালিয়ে বসে থাকেন! সালাম দিয়ে ভেতরে ঢুকতেই তিনি চমকে তাকালেন, তারপর সেই পরিচিত স্নিগ্ধ হাসি। হাসিটা এমন, যেন ক্লান্তি নেই, বিরক্তি নেই- শুধু আন্তরিকতা।

কুশল বিনিময়ের পর বললেন, ‘অফিসের কিছু জরুরি কাজ আছে, আজই শেষ করতে হবে।’ কথাগুলো খুব সাধারণ, কিন্তু তার ভেতরে লুকিয়ে আছে দীর্ঘ এক শিক্ষকতা জীবনের দায়বদ্ধতা।

মো. জহির আলী শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের একজন জনপ্রিয় শিক্ষক। তবে জনপ্রিয়তার চেয়েও বড় পরিচয়- তিনি একজন অভিভাবকসুলভ মানুষ। সদাহাস্য এই শিক্ষক প্রতিদিন খেয়াল রাখেন কোন ছাত্রী স্কুলে এলো, কে এলো না, না এলে কেন এলো না। কোনো ছাত্রী অসুস্থ কি না, কারও চোখেমুখে মন খারাপের ছায়া আছে কি না- এসবও তার দৃষ্টি এড়ায় না।

একইভাবে শিক্ষকরা সময়মতো বিদ্যালয়ে এসেছেন কি না, নির্ধারিত সময়ে শ্রেণিকক্ষে পাঠদান শুরু করেছেন কি না- এসব তদারকিতেই কেটে যায় তার দিনের বড় অংশ।

শুধু পাঠদান বা প্রশাসনিক দায়িত্বেই সীমাবদ্ধ নন তিনি। বিদ্যালয় প্রাঙ্গণ পরিচ্ছন্ন আছে কি না, শ্রেণিকক্ষগুলো শিক্ষার উপযোগী আছে কি না- এসব ছোট ছোট বিষয়ও তার কাছে বড় গুরুত্ব পায়। কারণ তিনি বিশ্বাস করেন, সুন্দর পরিবেশ না হলে সুন্দর মানুষ তৈরি হয় না।

শিক্ষকতা জীবনের পথচলা শুরু হয়েছিল তার ১৯৯৪ সালের ২৯ মার্চ। ওই দিনই তিনি শ্রীমঙ্গল সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ে সহকারী শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন। দীর্ঘ কর্মজীবনে এই বিদ্যালয়েই দুই দফা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেছেন তিনি। গত বছরের ১১ ডিসেম্বর সিনিয়র শিক্ষক থেকে পদোন্নতি পেয়ে সহকারী প্রধান শিক্ষক হন জহির আলী। একই দিন থেকে তিনি আবারও বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করে আসছেন।

দীর্ঘ ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবন শেষে আগামী ৩০ জুন অবসরে যাচ্ছেন তিনি। অবসর-পরবর্তী পরিকল্পনা জানতে চাইলে চোখে-মুখে ভেসে ওঠে নতুন স্বপ্নের আভা। জহির আলী জানান, শ্রীমঙ্গলে একটি স্কুল অ্যান্ড কলেজ প্রতিষ্ঠার পরিকল্পনা রয়েছে তার। শুধু পরিকল্পনাতেই থেমে নেই- ইতোমধ্যে এ শিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ার প্রাথমিক কাজও শুরু করে দিয়েছেন তিনি।

দিনের পর দিন নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করে যাওয়া এই মানুষটির কাছে শিক্ষকতা কেবল একটি চাকরি নয়- এটি একটি ব্রত। সন্ধ্যা নামার পরও আলো জ্বালিয়ে অফিসকক্ষে বসে থাকা জহির আলী স্যার যেন সেই নীরব শিক্ষকসমাজের প্রতিনিধি, যাদের শ্রম আর নিষ্ঠার ওপর ভর করেই এগিয়ে চলে শিক্ষার আলো।

সন্ধ্যার সেই নীরব বিদ্যালয়ে আলো জ্বালিয়ে বসে থাকা জহির আলী স্যার যেন আমাদের সময়ের সেই সব শিক্ষকদের প্রতিনিধি, যারা প্রচারের আলো চান না, বাহবা চান না- শুধু নিঃশব্দে দায়িত্ব পালন করে যান। যাদের হাত ধরেই গড়ে ওঠে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম, আর যাদের অবদান থেকে যায় পাঠ্যবইয়ের বাইরেই, মানুষের মনে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *