কেএম শাহীন রেজা (কুষ্টিয়া): বালু মহাল ও মাটি ব্যবস্থাপনা আইন ২০১০ অনুযায়ী নদী থেকে অবৈধভাবে মাটি ও বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তবে এই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে এক যুগেরও বেশি সময় ধরে পদ্মা নদীর মাটি ও বালু কেনাবেচা করে আসছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহ ইউনিয়নের অন্তত ১২টি ইটভাটার মালিক, শ্রমিক ও কিছু অসাধু কৃষক।
জানা গেছে, শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকার কয়েক শত বিঘা জমির মাটি প্রতিবছর কোটি কোটি টাকায় বিক্রি করা হচ্ছে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, এসব জমি তাদের নিজস্ব মালিকানাধীন। নদীর কারণে বছরে একবার ফসল উৎপাদন হয়, যা লাভজনক নয়। তাই তারা ফসল চাষ না করে ইটভাটায় মাটি ও বালু বিক্রি করছেন। জমির মান ভেদে প্রতিবিঘা মাটি ৫০ হাজার থেকে ২ লাখ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, প্রশাসন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের কিছু অসাধু ব্যক্তিকে ‘ম্যানেজ’ করেই তারা বছরের পর বছর এ কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন।
অবৈধভাবে নদীর মাটি ও বালু কাটার ফলে প্রতি বছর হুমকিতে পড়ছে হাজার হাজার বিঘা ফসলি জমি ও পরিবেশ। ভারী যান চলাচলের কারণে ভেঙে পড়েছে গ্রামীণ সড়ক। প্রকাশ্যে এমন অবৈধ কার্যক্রম চললেও প্রশাসনের কার্যকর উদ্যোগ না থাকায় ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও কৃষকরা। তারা দ্রুত নদী থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন বন্ধের দাবি জানান।
স্থানীয়রা জানান, এক যুগ আগেও পদ্মা নদীর কোলঘেঁষা শিলাইদহ ইউনিয়নের মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকায় কয়েক হাজার বিঘা জমিতে বাদাম, সরিষা, মসুর, তিলসহ বিভিন্ন ফসলের চাষ হতো। কিন্তু ফসল চাষের তুলনায় মাটি বিক্রি অধিক লাভজনক হওয়ায় বর্তমানে কৃষি জমির পরিমাণ কমে যাচ্ছে এবং পরিবেশের ভারসাম্য মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
আরও জানা গেছে, শিলাইদহ ইউনিয়নে বর্তমানে ১২টি ইটভাটা রয়েছে। প্রতিটি ভাটায় বছরে ৫০ থেকে ৬০ লাখ ইট উৎপাদন করা হয়। এসব ইট তৈরির প্রধান কাঁচামাল হিসেবে পদ্মা নদী থেকে সংগৃহীত মাটি ও বালু ব্যবহার করা হচ্ছে। এতে কৃষি জমি, পরিবেশ ও গ্রামীণ সড়ক মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়েছে।
বুধবার (১৭ ডিসেম্বর) দুপুর ১২টার দিকে সরেজমিনে মাজগ্রাম, ছোট মাজগ্রাম ও জুড়ালপুর এলাকা ঘুরে দেখা যায়, পদ্মা নদীর পানি শুকিয়ে বিস্তীর্ণ চর জেগে উঠেছে। সেখানে সরিষা, মসুর, মটর, পেঁয়াজসহ বিভিন্ন ফসলের আবাদ করা হয়েছে। একই সঙ্গে অন্তত ছয়টি ভেকু দিয়ে মাটি ও বালু কাটা হচ্ছে। এসব মাটি এসবিসি, এনএসবি ও মাস্টার্স ব্রিকসসহ বিভিন্ন ইটভাটায় পরিবহন করা হচ্ছে। সড়কের কার্পেটিং উঠে গেছে। সাংবাদিকদের উপস্থিতি টের পেয়ে ভেকু ফেলে দ্রুত পালিয়ে যান চালক ও শ্রমিকরা।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কৃষক বলেন, আগে ধান, পাট, আখ, বাদাম, মসুর- কত ফসল হতো। এখন প্রতিবছর ভাটা হচ্ছে। টাকার লোভে মানুষ ভাটায় মাটি বিক্রি করছে। একজনের কারণে সবার ক্ষতি হচ্ছে। আমরা চাই অবৈধ কাজ বন্ধ হোক।
মাজগ্রাম এলাকায় পদ্মা নদীতে প্রায় পাঁচ বিঘা জমির মালিক ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মনোয়ার হোসেন বলেন, পানির কারণে ঠিকভাবে চাষ করা যায় না। বছরে একবার ফসল হতো, তাতে সংসার চলে না। তাই প্রতিবিঘা এক লাখ টাকা দরে ইটভাটায় মাটি বিক্রি করেছি। বন্যা এলে আবার ভরাট হয়ে যাবে।
একই বক্তব্য দেন উপজেলা যুবদলের যুগ্ম আহ্বায়ক খাইরুল ইসলাম। তাদের দাবি, চাষাবাদের চেয়ে ইটভাটায় মাটি বিক্রি বেশি লাভজনক এবং প্রশাসনের পক্ষ থেকে কোনো বাধা দেওয়া হয় না।
জুড়ালপুর গ্রামের কৃষক কুদ্দুস আলী বলেন, আগে চরে বাদাম, সরিষা, তিল ও মসুরসহ নানা ফসল হতো। এখন ভাটার কারণে মাটির দাম বেশি, তাই অনেকে মাটি বিক্রি করছেন।
একটি ইটভাটায় বছরে প্রায় ১০ লাখ টাকার মাটি ব্যবহৃত হয় বলে জানান এসবিসি ইটভাটার মালিক মো. শাহিন। তিনি বলেন, এখানে অবৈধ কিছু করা হচ্ছে না। জমির মালিকদের কাছ থেকে টাকা দিয়েই মাটি কেনা হয়।
কৃষক আমির হোসেন বলেন, চাষাবাদ করলে পদ্মার বুকে ভালো ফলন সম্ভব। কিন্তু কিছু অসাধু ভাটা মালিক ও কৃষক আইন অমান্য করে মাটি ও বালু বিক্রি করছেন। দোষীদের শাস্তি হওয়া দরকার।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. রাইসুল ইসলাম বলেন, সরকার কৃষি উৎপাদন বাড়াতে প্রণোদনাসহ নানা সুবিধা দিয়েছে। কিন্তু ইটভাটার কারণে কৃষিজমি ও উৎপাদন কমে যাচ্ছে।
এ বিষয়ে জানতে কুষ্টিয়া পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক এমদাদুল হক-কে একাধিকবার ফোন করা হলেও তিনি কল রিসিভ করেননি।
অভিযোগ অস্বীকার করে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ফারজানা আখতার বলেন, বৈধ ইজারা ছাড়া নদী থেকে মাটি ও বালু উত্তোলন সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। দ্রুতই অভিযান চালিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

