সর্বশেষ :
20 Oct 2026, Tue

পলাশবাড়ী হানাদারমুক্ত দিবস আজ

পলাশবাড়ী হানাদারমুক্ত দিবস আজ

বায়েজিদ, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা): ঐতিহাসিক দিন আজ ৮ ডিসেম্বর। ১৯৭১ সালের এই দিনে রংপুর বিভাগের গাইবান্ধা জেলার পলাশবাড়ী উপজেলা হানাদারমুক্ত করেছিলেন আমাদের অহংকার- বীর মুক্তিযোদ্ধারা। হানাদার বাহিনীর পতনের পর এলাকার সর্বত্র ছড়িয়ে পড়ে মুক্তিকামী মানুষের উল্লাস ও উদ্দামতা।

বীর মুক্তিযোদ্ধাদের বিভিন্ন সূত্রে জানা যায়, ১৯৭১ সালের গোটা মার্চ মাস জুড়ে উত্তাল ছিল পলাশবাড়ী অঞ্চল। এই উত্তাল সময়েই পাকবাহিনী বীর সেনাসহ পাঁচ শতাধিক নারী- পুরুষ ও শিশুকে নির্মমভাবে হত্যা করে। পাকবাহিনী সেদিন পাবনা জেলার ঐতিহ্যবাহী নারিন্দা উচ্চবিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক আবদুল আজিজ ও ফাতেমা বেগম দম্পতির বীর সন্তান শহীদ লেফটেন্যান্ট রফিককে নির্মমভাবে হত্যা করে। তিনি পলাশবাড়ীতে শহীদ হন।

২৬ মার্চ কালরাতে স্বাধীনতা যুদ্ধ ঘোষণা হওয়ার পরদিন পশ্চিম পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী পলাশবাড়ী আক্রমণ করে। শুরু হয় সম্মুখযুদ্ধ। সড়কপথে ভারী অস্ত্রশস্ত্র নিয়ে আসা ৬০ জন ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদস্যের বিরুদ্ধে বাঙালি সুবেদার আলতাফ হোসেনের নেতৃত্বে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন মুক্তিযোদ্ধারা। এ যুদ্ধে ব্যবহৃত হয় মেশিনগান, কামানসহ বিভিন্ন ভারী সমরাস্ত্র। সারাদিনের যুদ্ধে উভয় পক্ষে ২১ জন সৈনিক শহীদ হন। তাঁদের মধ্যে শহীদ লে. রফিক এবং কালীবাড়ী হাটে আসা গৃধারীপুর গ্রামের আবদুল মান্নান অন্যতম।

২৮ মার্চ সকাল থেকেই পাকবাহিনী পলাশবাড়ী উপজেলায় শুরু করে জ্বালাও-পোড়াও অভিযান। তাদের এই অভিযানে মহাসড়কের দু’ধারে গৃধারীপুর, নুনিয়াগাড়ী, জামালপুর, মহেশপুর, বাঁশকাট, নিশ্চিন্তপুর, বৈরীহরিনমারী, উদয়সাগরসহ ঐতিহ্যবাহী কালীবাড়ী বাজার পুড়ে যায়। এখান থেকেই হানাদারদের বর্বরতা ও পৈশাচিকতার প্রকৃত রূপ প্রকাশ পেতে থাকে। প্রতিদিন গোটা এলাকায় তাণ্ডব চালিয়ে নারী-পুরুষ ও যুবতীদের ধরে এনে পাকসেনারা স্থানীয় সড়ক বিভাগ (সিএমবি) অফিসের অন্ধকার কক্ষে আটকে রেখে ধর্ষণ করত এবং পরে বেয়োনেট দিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে মাটিচাপা দিত।

হানাদার বাহিনী শুধু গণহত্যাই চালায়নি, লুটপাট ও গ্রাম জ্বালিয়ে ধ্বংস করেছে। কাশিয়াবাড়ী এলাকার বাসিন্দাদের জোরপূর্বক ধরে এনে চতরা-ঘোড়াঘাট সড়কের পশ্চিম রামচন্দ্রপুর গ্রামে সারিবদ্ধভাবে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হয় প্রায় ৩০০ নারী-পুরুষকে। অলৌকিকভাবে বেঁচে যান চকবালা গ্রামের সাগের আলী, আমির আলী এবং সগুনা গ্রামের আনিছুর রহমান বাদশা। তাদের বর্ণনায় সেই দিনের মর্মান্তিক দৃশ্য আজও স্থানীয় মানুষের মনে শোকের ছাপ এঁকে দেয়। এই নৃশংস হত্যাযজ্ঞের বিবরণ সেদিন স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্র থেকেও প্রচারিত হয়েছিল। মৃত্যুর মুখ থেকে ফিরে আসা সাগের আলী (৮৫) এখনো ভয়াবহ স্মৃতিগুলো মনে করেন।

হানাদারদের সেই বর্বরতায় কাশিয়াবাড়ীর ফুলবানু, গিরিবালা, অন্তঃসত্ত্বা হাজেরা বেগমসহ অনেক নারী ধর্ষিত হন। সেদিন এক পাকিস্তানি সৈন্য লে. রফিকের গায়ে পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি চালায়। পাবনা জেলার গর্বিত শিক্ষক দম্পতির এই বীর সন্তান পলাশবাড়ীতে শহীদ হন। সড়ক ও জনপথ বিভাগের ডাকবাংলো ছাড়াও গৃধারীপুর, বৈরী হরিনমারী, মডেল প্রাথমিক বিদ্যালয়, ঝাপড় মুংলিশপুর, জামালপুর, উদয়সাগর, কাশিয়াবাড়ী হাইস্কুলের পাশ, পশ্চিম রামচন্দ্রপুর, কলাগাছী ও আমবাগানসহ উপজেলায় অসংখ্য গণকবর আজো সেই ইতিহাসের সাক্ষী।

পলাশবাড়ী থানার ৬৫ জন বীর সন্তান সম্মুখ যুদ্ধে অংশ নেন। তাঁদের মধ্যে গোলাম রব্বানী, আনজু মণ্ডল, আবদুল লতিফ, আবুল কাসেম, হাসবাড়ী উচ্চবিদ্যালয়ের তৎকালীন প্রধান শিক্ষক নুরুন্নবী মাস্টারসহ বেঙ্গল রেজিমেন্ট, ইপিআর এবং মুজাহিদ বাহিনীর বহু সদস্য শহীদ হন।

অবশেষে ৮ ডিসেম্বর পলাশবাড়ী শত্রুমুক্ত হলে মুক্তিযোদ্ধা ও এলাকার হাজারো ছাত্র-যুবকসহ সর্বস্তরের মানুষ আনন্দ- উল্লাসে ঘরে ফেরেন। তবে অনেকেই আর ফিরে আসেননি- যুদ্ধক্ষেত্রে বীরের মতো শহীদ হয়েছিলেন তারা। এভাবেই ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে পাক হানাদার বাহিনীর কবল থেকে মুক্ত হয় পলাশবাড়ী উপজেলা।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *