ঢাকা: বর্তমান সমাজে নারী-পুরুষ নির্বিশেষে অনেকের হাতে-পায়ে বা শরীরের বিভিন্ন অংশে উল্কি বা ট্যাটু আঁকা একটি জনপ্রিয় ফ্যাশন হয়ে উঠেছে। তবে ইসলামি শরিয়তে এই ধরনের স্থায়ী উল্কি বা ট্যাটু অংকন করা হারাম (নিষিদ্ধ) এবং এটি কবিরা গুনাহ হিসেবে গণ্য। ইসলামি আইনজ্ঞরা দলিলের ভিত্তিতে এই কাজটি আল্লাহর সৃষ্টির বিকৃতি বলে মত দিয়েছেন।
ইসলামী চিন্তাবিদদের মতে, এই নিষেধাজ্ঞা পুরুষ ও নারী উভয়ের জন্যই প্রযোজ্য।
ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে শরীরে স্থায়ী উল্কি বা ট্যাটু আঁকা নিষিদ্ধ হওয়ার পেছনে মূল কারণগুলো নিম্নরূপ-
১. আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি সাধন (تحريف خلق الله)-
উল্কির মাধ্যমে ত্বকের নিচে স্থায়ীভাবে রং প্রবেশ করানো হয়, যা মানুষের স্বাভাবিক আকৃতি ও সৌন্দর্যের স্থায়ী পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটায়।
- পবিত্র কোরআনের দলিল: মহান আল্লাহ বলেন, “নিশ্চয় আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি শ্রেষ্ঠতম-সুন্দর আকৃতিতে।” (সূরা তীন, আয়াত: ৪)
- এই বিকৃতিকে শয়তানের কাজ বলেও কোরআনে আখ্যায়িত করা হয়েছে। শয়তান বলেছিল, “আমি অবশ্যই তাদেরকে (মানুষকে) আদেশ করব, ফলে তারা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃত করবে।” (সূরা নিসা, আয়াত: ১১৯)
২. অভিশাপ ও কঠোর হুঁশিয়ারি-
উল্কি অঙ্কনকারী ও অঙ্কন গ্রহণকারী উভয়কেই হাদিসে অভিশাপ দেওয়া হয়েছে।
- সহিহ হাদিসের দলিল: বিখ্যাত সাহাবি হযরত আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) থেকে বর্ণিত, “রাসূলুল্লাহ (সা.) ওই সব নারীর ওপর লানত (অভিশাপ) করেছেন, যারা উল্কি অঙ্কন করে ও যারা উল্কি গ্রহণ করে, যারা সৌন্দর্যের জন্য ভ্রূ উপড়ে ফেলে ও দাঁতের মাঝে ফাঁক সৃষ্টি করে; এরা আল্লাহর সৃষ্টিতে বিকৃতি ঘটিয়েছে।” (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৪৮৮৬; সহিহ মুসলিম, হাদিস: ৫৬৯৩)
- আবু জুহাইফা (রা.) থেকে বর্ণিত অপর হাদিসে উল্কি অঙ্কনকারিণী, উল্কি গ্রহণকারিণী, সুদগ্রহীতা ও সুদদাতার ওপর রাসূল (সা.) অভিসম্পাত করেছেন। (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৪৭)
৩. ওজু-গোসলের শুদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন-
স্থায়ী উল্কি বা ট্যাটুর ক্ষেত্রে যদি এমন হয় যে, চামড়ার ওপরে রঙের একটি ঘন আবরণ সৃষ্টি হয় যা পানির চামড়ায় পৌঁছাতে বাধা দেয়, তাহলে সেই স্থানে ওজু ও ফরজ গোসল শুদ্ধ হবে না। এর ফলে মুসলিম ব্যক্তি সব সময় অপবিত্র থেকে যেতে পারেন।
ট্যাটু থাকলে কী করণীয় ?
বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো মুসলিম যদি না জেনে বা ভুলে উল্কি করে ফেলেন, তবে তার জন্য করণীয় হলো, তাওবা (অনুশোচনা) আন্তরিকভাবে আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এমন কাজ না করার দৃঢ় সংকল্প করা। মুছে ফেলার চেষ্টা- যদি সম্ভব হয় এবং শারীরিক ক্ষতির আশঙ্কা না থাকে, তবে ট্যাটু অপসারণের ব্যবস্থা করা উচিত। তবে যদি অপসারণ সম্ভব না হয় অথবা অপসারণের চেষ্টা করলে চামড়ার গুরুতর ক্ষতি হওয়ার সম্ভাবনা থাকে, তবে আল্লাহর কাছে তাওবা করাই যথেষ্ট।
উল্লেখ্য, মেহেদি বা সাময়িক রঙের নকশা যা চামড়ার ওপরে থাকে এবং গোসল বা ঘষার পর উঠে যায়, তা স্থায়ী উল্কির অন্তর্ভুক্ত নয় এবং শরিয়তে তা হারাম নয়। শরীরের স্বাভাবিক সৌন্দর্য বজায় রেখে যে কোনো সাজসজ্জা বা রূপচর্চা ইসলাম সমর্থন করে, কিন্তু আল্লাহর সৃষ্টিতে স্থায়ী পরিবর্তন বা বিকৃতি ঘটানোকে কঠোরভাবে নিষেধ করা হয়েছে।

