নিজস্ব প্রতিবেদক: আবদুস সালেক চৌধুরী, বীর উত্তম, বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের এক অনন্য নাম। অসাধারণ বীরত্ব ও সাহসিকতার জন্য যিনি দেশের সর্বোচ্চ সামরিক সম্মাননাগুলোর একটি, বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত হয়েছিলেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় তিনি ছিলেন ২ নম্বর সেক্টরের অধীনে সালদা নদী সাব সেক্টরের কমান্ডার এবং পরবর্তীতে ‘কে’ ফোর্সের অধিনায়ক।
আবদুস সালেক চৌধুরী ১৯৪৬ সালের ২০ সেপ্টেম্বর ঢাকার দোহার উপজেলার হাতুরপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তার বাবার নাম ছিল আবদুল রহিম চৌধুরী এবং মায়ের নাম ছিল সায়মা খানম। আট ভাই-বোনের মধ্যে তিনি ছিলেন চতুর্থ।
ঢাকার সেন্ট গ্রেগরি স্কুল থেকে মাধ্যমিক এবং নটরডেম কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক পাস করার পর ১৯৬৫ সালে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন। প্রথম বর্ষেই তিনি পাকিস্তান সেনাবাহিনীতে যোগ দেন এবং ১৯৬৭ সালে কমিশন লাভ করেন। মুক্তিযুদ্ধের আগে তিনি ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে কর্মরত ছিলেন।
১৯৭১ সালের ২২ এপ্রিল আবদুস সালেক চৌধুরী পাকিস্তান সেনাবাহিনী থেকে পালিয়ে এসে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেন। প্রাথমিকভাবে তিনি খালেদ মোশাররফ, বীর উত্তমের অধীনে কুমিল্লা অঞ্চলে যুদ্ধ করেন। পরে ২ নম্বর সেক্টর গঠিত হলে তাকে সালদা নদী সাব সেক্টরের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। এই সাব সেক্টরটি ছিল সামরিক দিক থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর মোট আয়তন ছিল প্রায় ২০০ বর্গ কিলোমিটার, যা নয়নপুর, বুড়িচংসহ বেশ কিছু এলাকা নিয়ে গঠিত হয়েছিল।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে সালদা নদী সাব সেক্টর এক অসামান্য স্থান দখল করে আছে। এই অঞ্চলের যুদ্ধে মুক্তিবাহিনী ও পাকিস্তানি বাহিনীর মধ্যে একাধিক তীব্র সংঘর্ষ ঘটে।
- ২৫ জুলাই আক্রমণ: আবদুস সালেক চৌধুরীর নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধারা পাকিস্তানি বাহিনীর ওপর আক্রমণ শুরু করেন। ২৬ জুলাই পাকিস্তানি বাহিনী পিছু হটে মনোয়ারা ব্রিজের দিকে চলে যায়। ২৭ জুলাই মুক্তিযোদ্ধারা তাদের ওপর পুনরায় আক্রমণ করেন। প্রায় তিন দিন ধরে চলা এই যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীর ব্যাপক ক্ষতি হয়।
- ১০ আগস্টের যুদ্ধ: এই দিন মেজর আবদুস সালেক চৌধুরীর নির্দেশে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি বাহিনীর অবস্থানের চারদিক ঘিরে ফেলে। টানা চার দিনের গোলাবর্ষণে পাকিস্তানি বাহিনীর ৬০ জন সেনা নিহত হয় এবং তারা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার দিকে পালিয়ে যায়।
- নয়নপুর ও সালদা নদী স্টেশন অপারেশন: সেপ্টেম্বরের শেষের দিকে ২ নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর খালেদ মোশাররফ সালদা নদী স্টেশন দখলের নির্দেশ দেন। মেজর আবদুস সালেক চৌধুরীর নেতৃত্বে মুক্তিবাহিনী চতুর্দিক থেকে আক্রমণ শুরু করে। তীব্র আক্রমণের মুখে পাকিস্তানি বাহিনী নয়নপুর ছেড়ে সালদা নদী রেলওয়ে স্টেশনে আশ্রয় নেয়। যুদ্ধ চলাকালীন গোলাবারুদ ফুরিয়ে যাওয়ায় মুক্তিযোদ্ধারা স্টেশন দখল করতে না পারলেও নয়নপুর দখল করে নেয়, যা ছিল এক বড় ধরনের সাফল্য।
সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে কে ফোর্স গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। পরিকল্পনা অনুযায়ী, মেজর আবদুস সালেক চৌধুরীকে নবগঠিত ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের অধিনায়ক হিসেবে নিযুক্ত করা হয়। পরে ২৩ অক্টোবর খালেদ মোশাররফ আহত হলে মেজর আবদুস সালেক চৌধুরীকে ‘কে’ ফোর্সের অধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। এ সময় তিনি ১০ম ইস্ট বেঙ্গল রেজিমেন্টের দায়িত্ব ক্যাপ্টেন জাফর ইমামের হাতে তুলে দেন এবং মেজর এটিএম হায়দার ২ নম্বর সেক্টরের কমান্ডার হিসেবে দায়িত্ব নেন।
অসাধারণ বীরত্বের জন্য আবদুস সালেক চৌধুরীকে বীর উত্তম খেতাবে ভূষিত করা হয়। তার সনদ নম্বর ছিল-১২। ১৯৭২ সালের ১৯ নভেম্বর এই বীর মুক্তিযোদ্ধা পরলোকগমন করেন।
তথ্যসূত্র:
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধ দলিলপত্র দশম খণ্ড।
বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের সেক্টর ভিত্তিক ইতিহাস: সেক্টর ২
দ্যা ডেইলি স্টার।

