সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

কুলিয়ারচরে ইউএনওর বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ, মতবিনিময় সভা বয়কট সাংবাদিকদের

কুলিয়ারচরে ইউএনওর বিরুদ্ধে দ্বিমুখী আচরণের অভিযোগ, মতবিনিময় সভা বয়কট সাংবাদিকদের

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচরে নবযোগদানকৃত উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও পৌর প্রশাসক সাফফাত আরা সাঈদের বিরুদ্ধে সাংবাদিকদের প্রতি বৈষম্যমূলক আচরণ, ছবি তুলতে বাধা এবং দ্বিমুখী নীতির অভিযোগ উঠেছে। এ নিয়ে স্থানীয় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে।

ঘটনার প্রেক্ষাপটে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে ‘কুলিয়ারচর ইউএনওর দ্বিমুখী আচরণ: সাংবাদিকদের প্রতি ক্ষোভ নাকি পূর্বশত্রুতা?’ শিরোনামে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হয়।

এর পরিপ্রেক্ষিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে একদিন আগের তারিখ (ব্যাকডেট) দিয়ে সাংবাদিকদের সঙ্গে ইউএনওর পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার নোটিশ জারি করা হয়েছে- এমন অভিযোগ তুলে ওই সভা বয়কট করেছেন কুলিয়ারচরে কর্মরত সাংবাদিকরা।

জানা যায়, সরকারি আদেশে বদলি হয়ে গত রোববার বিকেলে কুলিয়ারচর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার কার্যালয়ে যোগদান করেন ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ। দায়িত্ব গ্রহণের প্রথম দিন উপজেলার ১ নম্বর গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন পরিষদের জনপ্রতিনিধিরা নতুন ইউএনওকে তাঁর কার্যালয়ে ফুলের তোড়া দিয়ে অভিনন্দন জানাতে যান। এ সময় স্থানীয় ছয়জন পেশাদার সাংবাদিক সেখানে উপস্থিত ছিলেন।

জনপ্রতিনিধিরা ফুলের তোড়া দিয়ে ইউএনওকে অভিনন্দন জানাতে চাইলে সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে ইউএনও সাফফাত আরা সাঈদ ছবি তোলার বিষয়ে আপত্তি জানান বলে অভিযোগ। তিনি জানান, ছবি তোলা হলে তিনি জনপ্রতিনিধিদের ফুলের তোড়া গ্রহণ করবেন না। পরে উপস্থিত সাংবাদিকরা জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া ফুলেল শুভেচ্ছার ছবি না তুলে ইউএনওর কার্যালয় থেকে বের হয়ে যান।

অন্যদিকে, যোগদানের দুই দিন পর মঙ্গলবার সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানানোর বেশ কয়েকটি ছবি ছড়িয়ে পড়ে। এসব ছবিতে তাঁকে অন্যদের কাছ থেকে ফুলের তোড়া গ্রহণ করতে এবং ক্যামেরাবন্দী হতে দেখা যায়।

এ ছাড়া মঙ্গলবার দুপুরে আরও একটি ঘটনা ঘটে বলে জানান উপজেলা দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটির এক সদস্য, যিনি পেশায় সাংবাদিক। তিনি জানান, তাঁর সঙ্গে কমিটির অপর এক সদস্য, তিনিও পেশায় সাংবাদিক, ইউএনওর কার্যালয়ে অবস্থানকালে উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়নের লক্ষ্মীপুর টেকনিক্যাল অ্যান্ড বি.এম. কলেজের শিক্ষকরা তাঁদের কলেজের সভাপতি নবযোগদানকৃত ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে আসেন। এ সময় সাংবাদিকদের উপস্থিতি দেখে সেখানেও ছবি তুলতে নিষেধ করা হয় বলে অভিযোগ।

পরে উপজেলা প্রশাসন চত্বরে প্রতিষ্ঠিত উপজেলা প্রশাসন পরিচালিত উপজেলা প্রশাসন স্কুলের শিক্ষক-কর্মচারীরা ইউএনওকে ফুলেল শুভেচ্ছা জানাতে এলে তাঁদের ক্ষেত্রেও ছবি তোলায় একই ধরনের নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন ওই সাংবাদিকরা।

তাঁদের দাবি, উপস্থিত দুই সাংবাদিক ইউএনওর কক্ষ থেকে বের হয়ে যাওয়ার মাত্র এক মিনিটের মধ্যে পৌরসভার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা ফুলের তোড়া নিয়ে ইউএনওর কার্যালয়ে গেলে পরিস্থিতি বদলে যায়। তখন কোনো আপত্তি ছাড়াই ইউএনওকে ফুলের তোড়া দিয়ে শুভেচ্ছা জানানোর ছবি তোলার সুযোগ দেওয়া হয়। পরে ওই ছবিগুলো সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত হয়।

বারবার সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছবি তোলায় বাধা দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় সংবাদকর্মীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দেয়। তাঁরা প্রশ্ন তোলেন- দায়িত্ব গ্রহণের পর শুভেচ্ছা বিনিময়ের ছবি তুলতে সাংবাদিকদের বাধা দেওয়ার কারণ কী? একই স্থানে সাংবাদিকরা উপস্থিত থাকলে ছবি তোলায় আপত্তি এবং সাংবাদিকরা চলে যাওয়ার পরপরই ছবি তোলার সুযোগ দেওয়ার কারণ কী? সাংবাদিকদের ক্যামেরায় ছবি তুলতে ইউএনওর অনীহার কারণই বা কী?

সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে ছবি তোলায় বাধা এবং তাঁদের চলে যাওয়ার পর ছবি তোলার সুযোগ দেওয়ার অভিযোগে স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মীদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে সুশীল সমাজের প্রতিনিধিরা প্রশাসনিক স্বচ্ছতা, তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও গণমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানিয়েছেন।

ঘটনাটি নিয়ে গত ২৯ সেপ্টেম্বর দিবাগত রাতে অনলাইন নিউজ পোর্টাল ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার একটি নোটিশ জারি করা হয়।

তবে সাংবাদিকদের অভিযোগ, কোনো সাংবাদিক প্রতিনিধির সঙ্গে আলোচনা না করেই ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুরে স্থানীয় সাংবাদিকদের সঙ্গে পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার নোটিশ তৈরি করা হয়। নোটিশটির অনুলিপি জেলা প্রশাসক, কিশোরগঞ্জ এবং প্রতিমন্ত্রীর একান্ত সচিব, বস্ত্র ও পাট মন্ত্রণালয়ের কাছে ‘প্রতিমন্ত্রী মহোদয়ের অবগতির জন্য’ পাঠানো হয়।

সাংবাদিকদের দাবি, নোটিশটি তাঁদের হাতে হাতে না দিয়ে ৩০ সেপ্টেম্বর দুপুর ১টা ৬ মিনিটে উপজেলা পরিষদের স্টাফ মো. ওবায়দুল্লাহ সুজনের মোবাইল নম্বর থেকে কুলিয়ারচরের সাংবাদিকদের দুটি হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো হয়। হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে পাঠানো ওই চিঠিতে একদিন আগের অর্থাৎ ২৯ সেপ্টেম্বরের তারিখ উল্লেখ করা হয়। চিঠিতে স্মারক নম্বর ছিল- ০৫.৪১.৪৮৫৪.০০০.০০.০৪৮.২৫-৬৪২ (২৫)।

পরিচিতি ও মতবিনিময় সভার বিষয়ে উপজেলার কয়েকজন সাংবাদিক অবগত হলেও অধিকাংশ সাংবাদিক তা জানতেন না বলে দাবি করেছেন। সভা শুরুর মাত্র আড়াই ঘণ্টা আগে নোটিশ পাঠানো এবং চিঠিতে আগের তারিখ ব্যবহার করায় সাংবাদিকদের মধ্যে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়।

হাতে পর্যাপ্ত সময় না দিয়ে তড়িঘড়ি করে নোটিশ পাঠানো এবং আগের দিনের তারিখ ব্যবহারের প্রতিবাদে কুলিয়ারচরে কর্মরত সাংবাদিকরা ওই পরিচিতি ও মতবিনিময় সভা বয়কট করেন।

স্থানীয় সংবাদকর্মীদের দাবি, এ ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ এবং সাংবাদিকদের এড়িয়ে চলার চেষ্টা উপজেলা প্রশাসনের স্বাভাবিক কর্মপরিবেশকে ব্যাহত করছে। তাঁরা বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নজরে এনে ঘটনার ব্যাখ্যা ও দ্রুত সমাধানের দাবি জানিয়েছেন।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *