বাম্পার ফলনের পথে বাংলাদেশ, নতুন রেকর্ডের হাতছানি
আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): চলতি ২০২৬ সালের চা উৎপাদন মৌসুমের প্রথম ছয় মাসেই দেশে চা উৎপাদনে বড় ধরনের প্রবৃদ্ধি হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত দেশের চা-বাগানগুলোতে উৎপাদিত হয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩১ হাজার কেজি চা। গত বছরের একই সময়ে উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার কেজি। অর্থাৎ এক বছরের ব্যবধানে মাত্র ছয় মাসেই উৎপাদন বেড়েছে ৮২ লাখ ১২ হাজার কেজি।
চা উৎপাদনের এই উল্লেখযোগ্য প্রবৃদ্ধিতে চলতি বছর দেশে বাম্পার চা উৎপাদনের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। অনুকূল আবহাওয়া, পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সময়মতো সার প্রয়োগ এবং বাগান ব্যবস্থাপনায় উন্নতির ধারা অব্যাহত থাকলে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে চা উৎপাদনে নতুন রেকর্ড হতে পারে বলে আশা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের সর্বশেষ পরিসংখ্যান বুলেটিনের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জানুয়ারি-জুন সময়ে দেশে চা উৎপাদন হয়েছিল ২ কোটি ২৪ লাখ ১৯ হাজার কেজি। চলতি বছরের একই সময়ে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৬ লাখ ৩১ হাজার কেজিতে। ফলে ছয় মাসেই উৎপাদন বেড়েছে প্রায় ৩৬ দশমিক ৬ শতাংশ।
চা বোর্ড ও বাগানসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের মতে, বছরের শুরু থেকেই আবহাওয়া চা উৎপাদনের জন্য মোটামুটি অনুকূলে ছিল। পর্যাপ্ত বৃষ্টিপাত, সময়মতো সার প্রয়োগ, উন্নত ব্যবস্থাপনা এবং বাগানের নিয়মিত পরিচর্যার ফলে চা গাছের কুঁড়ি ও কচি পাতার উৎপাদন বেড়েছে। দেশের প্রধান চা উৎপাদন অঞ্চল মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল, হবিগঞ্জ, সিলেট ও চট্টগ্রামের বিভিন্ন বাগানে মৌসুমের শুরু থেকেই সন্তোষজনক ফলন পাওয়া যাচ্ছে।
চা শিল্পসংশ্লিষ্টরা বলছেন, সাধারণত মে থেকে অক্টোবর দেশের চা উৎপাদনের প্রধান মৌসুম। এ সময়ই বাগানগুলোতে সবচেয়ে বেশি পরিমাণে চা পাতা সংগ্রহ করা হয়। ফলে আগামী কয়েক মাস আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদন আরও দ্রুত বাড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।

চলতি বছর দেশে ১০ কোটি ৪০ লাখ কেজি চা উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। বছরের প্রথম ছয় মাসেই লক্ষ্যমাত্রার প্রায় ৩০ শতাংশ উৎপাদন হয়েছে। ফলে বাকি সময়ে অনুকূল আবহাওয়া ও উৎপাদন পরিস্থিতি বজায় থাকলে লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে যাওয়ার সম্ভাবনা দেখছেন সংশ্লিষ্টরা।
বাংলাদেশ চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে মোট ১৭২টি চা-বাগান রয়েছে। এর মধ্যে দেশের উত্তর-পূর্বাঞ্চলের সিলেট, মৌলভীবাজার, শ্রীমঙ্গল ও হবিগঞ্জ এবং চট্টগ্রাম অঞ্চলে দীর্ঘদিন ধরে বাণিজ্যিকভাবে চা উৎপাদন হয়ে আসছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরাঞ্চলের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও ও লালমনিরহাটেও চা চাষ দ্রুত সম্প্রসারিত হয়েছে। এর মধ্যে পঞ্চগড় ইতোমধ্যে দেশের অন্যতম বৃহৎ চা উৎপাদন অঞ্চলে পরিণত হয়েছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, দেশের চা-বাগানগুলোর মোট আয়তন প্রায় ২ লাখ ৯৪ হাজার ১৪২ একর। এর মধ্যে চা চাষের উপযোগী জমি ১ লাখ ৭৭ হাজার ৮৭৭ একর। বর্তমানে চা চাষ হচ্ছে ১ লাখ ৫৮ হাজার ৭৪১ একর জমিতে। ভবিষ্যতে চা চাষ সম্প্রসারণের জন্য আরও প্রায় ১৬ হাজার ১৩০ একর জমি রোপণযোগ্য রয়েছে।

চা বোর্ডের তথ্য অনুযায়ী, দেশে প্রতি একরে জাতীয় গড় চা উৎপাদন প্রায় ৬২৮ কেজি। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহার, উন্নত জাতের চা গাছের সম্প্রসারণ, সেচব্যবস্থার উন্নয়ন এবং দক্ষ বাগান ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে এ উৎপাদনশীলতা আরও বাড়ানোর সুযোগ রয়েছে বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।
চা শিল্প বাংলাদেশের অন্যতম ঐতিহ্যবাহী কৃষিভিত্তিক শিল্প। দেশের বিপুলসংখ্যক মানুষের কর্মসংস্থানের পাশাপাশি অভ্যন্তরীণ চাহিদা পূরণেও এ শিল্প গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। একই সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাজারে বাংলাদেশি চায়ের অবস্থান আরও শক্তিশালী করার সুযোগও তৈরি হচ্ছে।
চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসের উৎপাদনের এই ঊর্ধ্বমুখী চিত্র তাই শুধু চা শিল্পের জন্য আশার খবর নয়; বছরের শেষ পর্যন্ত উৎপাদনের এই ধারা অব্যাহত থাকলে বাংলাদেশের চা উৎপাদনে নতুন মাইলফলক সৃষ্টির সম্ভাবনাও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে।

