আব্দুস সালাম (দিনাজপুর): হাতপাখা, কুলা, ডালি, ঝুড়ি কিংবা মাছ ধরার ডার্কি- একসময় গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ ছিল বাঁশের তৈরি এসব সামগ্রী। অথচ আধুনিকতার ছোঁয়া এবং সস্তা প্লাস্টিক পণ্যের দাপটে দিনাজপুরের ঐতিহ্যবাহী বাঁশশিল্প আজ বিলুপ্তির শেষ প্রান্তে। জেলার বিভিন্ন হাট ঘুরে দেখা গেছে, শ্রম ও সময়ের যথাযথ মূল্য না পেয়ে চরম হতাশার মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন এই কুটিরশিল্পের সঙ্গে জড়িত কারিগররা।
জেলার বোচাগঞ্জ উপজেলার ঐতিহ্যবাহী সেতাবগঞ্জ হাটে সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বাঁশের তৈরি পণ্যের বেচাকেনা আশঙ্কাজনক হারে কমে গেছে। কাঁচামাল হিসেবে বাঁশের আকাশচুম্বী দাম এবং বাজারজাতকরণের জটিলতায় উৎপাদন খরচই উঠছে না। ফলে জীবিকার তাগিদে এ শিল্পের সঙ্গে যুক্ত অনেকেই বাপ-দাদার পেশা ছেড়ে দিনমজুরি, ইজিবাইক চালানোসহ বিভিন্ন বিকল্প আয়ের পথ বেছে নিচ্ছেন।
প্রায় ৪০ বছর ধরে এ পেশার সঙ্গে যুক্ত অভিজ্ঞ কারিগর বিপ্লব পাল আক্ষেপ করে বলেন, আগে বাঁশের কাজ করে সংসার খুব ভালো চলত। এখন আর চলে না। ছেলে-মেয়েরাও এই কাজ শিখতে চায় না, সবাই অন্য কাজ খুঁজছে।
একই ধরনের হতাশার কথা জানান ৩০ বছর ধরে এ পেশায় থাকা মহেশচন্দ্র রায় এবং প্রবীণ কারিগর অনিল পাল। তারা বলেন, কেবল পূর্বপুরুষদের স্মৃতি ও ঐতিহ্য ধরে রাখার জন্যই নামমাত্র লাভে এখনও এ পেশা আঁকড়ে আছেন। কারিগর নিখিল সরকার জানান, অভাবের কারণে বড় ছেলেকে বাধ্য হয়ে অন্য পেশায় পাঠাতে হয়েছে।
তবে এই ঘোর অন্ধকারের মধ্যেও আশার আলো দেখাচ্ছেন শফিকুল ইসলামের মতো কিছু দূরদর্শী কারিগর। আধুনিক যুগের রুচির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বাঁশের তৈরি পণ্যে নতুন নকশা ও রঙের বৈচিত্র্য এনে তিনি সফলতা পাচ্ছেন।
কারিগর শফিকুল ইসলাম বলেন, নতুন প্রজন্মের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে এখন রঙিন ও আধুনিক নকশার পণ্য তৈরি করছি। এতে বিক্রি ভালো হচ্ছে, পাশাপাশি লাভও বাড়ছে।
তরুণ উদ্যোক্তা আরিফ হোসেন মনে করেন, বাঁশশিল্প শুধু একটি অর্থনৈতিক খাত নয়, এটি আমাদের সংস্কৃতি ও ঐতিহ্যেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তাই শিল্পটিকে টিকিয়ে রাখতে পরিকল্পিত উদ্যোগ, আধুনিক নকশা উদ্ভাবন এবং সরকারি পৃষ্ঠপোষকতা অত্যন্ত জরুরি।
কারিগর ও স্থানীয় অভিজ্ঞদের মতে, বাঁশশিল্পকে পুনরুজ্জীবিত করতে হলে জরুরি ভিত্তিতে কয়েকটি পদক্ষেপ নেওয়া প্রয়োজন। এর মধ্যে রয়েছে- যুগের চাহিদা অনুযায়ী আধুনিক নকশার মানসম্মত পণ্য তৈরির প্রশিক্ষণ, প্রান্তিক কারিগরদের জন্য সহজ শর্তে ঋণের ব্যবস্থা এবং পরিকল্পিতভাবে বাঁশের বাণিজ্যিক চাষে কৃষকদের উৎসাহিত করা।
এ বিষয়ে বাংলাদেশ ক্ষুদ্র ও কুটির শিল্প করপোরেশন (বিসিক), দিনাজপুরের উপমহাব্যবস্থাপক মো. জাহেদুল ইসলাম বলেন, বাঁশশিল্পকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের কোনো বিকল্প নেই। কারিগরদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য কমপক্ষে তিন মাস মেয়াদি প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা রয়েছে। পাশাপাশি আগ্রহী কারিগরদের ঋণ সহায়তা এবং নিয়মিত তদারকির মাধ্যমে এ শিল্পকে টেকসই করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে।
সংশ্লিষ্টদের মতে, সরকারি কার্যকর উদ্যোগ, আধুনিক প্রশিক্ষণ এবং বিসিকের নিবিড় তদারকির মাধ্যমে দিনাজপুরের বিলুপ্তপ্রায় বাঁশশিল্পে আবারও প্রাণ ফিরিয়ে আনা সম্ভব। অন্যথায়, শত বছরের এই ঐতিহ্যবাহী শিল্প খুব শিগগিরই ইতিহাসের পাতায় স্থান করে নেবে।

