মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ): একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশের পরও টনক নড়েনি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের। কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের সরকারি জায়গা থেকে আবারও গাছ কেটে নেওয়ার গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। দিনের বেলায় প্রকাশ্যে একের পর এক মূল্যবান সরকারি গাছ কেটে নেওয়া হলেও তা প্রতিরোধে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় স্থানীয়দের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও উদ্বেগের সৃষ্টি হয়েছে।
স্থানীয়দের ভাষ্য, এর আগে বিভিন্ন জাতীয় দৈনিক, স্থানীয় পত্রিকা ও অনলাইন নিউজ পোর্টালে সরকারি গাছ কাটা ও দুর্নীতির বিষয়ে একাধিক সংবাদ প্রকাশিত হলেও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে কার্যকর কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি। প্রশাসনিক নজরদারি ও দৃশ্যমান পদক্ষেপের অভাবে অপরাধীরা বারবার পার পেয়ে যাচ্ছে এবং পুনরায় সরকারি গাছ কেটে লুটপাট করার সাহস পাচ্ছে।
অনুসন্ধানে জানা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি মাসের শুরুতে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি অফিসের প্রায় ১০০ গজ সামনে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর মৌজার ১ নম্বর খতিয়ানভুক্ত আরএস ১০৬৬৭ দাগের (শ্রেণি-হালট) সরকারি খাল ও রাস্তার পাশ থেকে প্রায় ২০ থেকে ২৫টি সরকারি গাছ কেটে বিক্রি করার অভিযোগ ওঠে গোবরিয়া আব্দুল্লাহপুর ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক মো. রুকন উদ্দিনের বিরুদ্ধে। আনুমানিক ১০ লাখ টাকা আত্মসাতের এই ঘটনাটি অভিনব কৌশলে ধামাচাপা দিতে গত ১৫ জানুয়ারি কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ১৮টি গাছ চুরির অভিযোগে একটি লিখিত আবেদন করেন নাছিমা আক্তার।
তবে স্থানীয়দের দাবি, থানায় দেওয়া সেই অভিযোগটি কোথাও জিডি বা এফআইআর হিসেবে নথিভুক্ত হয়নি। এমনকি অভিযোগটির কোনো তদন্তও হয়নি। অভিযোগপত্রে থানার একটি সিল ও রিসিভ কপি দেখিয়ে জনসাধারণের মুখ বন্ধ রাখার অপচেষ্টা চালানো হয়। এর কিছুদিন পর একইভাবে আরও তিনটি গাছ বিক্রি করে প্রায় ৮০ হাজার টাকা আত্মসাতের অভিযোগ ওঠে তাদের বিরুদ্ধে। গাছ কাটার সময় উপজেলা প্রশাসনকে অবহিত করার পর প্রথমে গাছ কাটা বন্ধ হলেও কয়েক দিন পর অদৃশ্য ক্ষমতার প্রভাবে গাছগুলো সরিয়ে নেওয়া হয়। রহস্যজনক কারণে তখনও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেয়নি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
সরকারি জায়গার গাছ বিক্রি করে লক্ষ লক্ষ টাকা আত্মসাৎ, ক্ষমতার অপব্যবহার, কাল্পনিকভাবে শ্রেণি পরিবর্তন করে অতিরিক্ত কর আদায়, লাখ লাখ টাকার ঘুষ বাণিজ্য এবং সরকারি বিধিমালা উপেক্ষা করে সাধারণ মানুষকে হয়রানি ও অর্থ আদায়ের অভিযোগে বিভিন্ন সংবাদমাধ্যমে “কুলিয়ারচরে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার ও অফিস সহায়ক রুকনের দুর্নীতির পাহাড়” শিরোনামে প্রতিবেদন প্রকাশিত হলে এলাকায় ব্যাপক চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়।
সংবাদ প্রকাশের সাত দিনের মাথায় গত ২৩ জুলাই কিশোরগঞ্জ জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের (রাজস্ব শাখা) এক অফিস আদেশে (স্মারক নং: ৩১.১২.৪৮০০.০০৭.১৬.০০১.(অংশ).১২-১২১৫) ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তারকে তাড়াইল উপজেলার ধলা ইউনিয়ন ভূমি অফিসে বদলি করা হয়। রেভিনিউ ডেপুটি কালেক্টর নিলুফা আক্তার রুপা স্বাক্ষরিত ওই আদেশে ২৭ জুলাইয়ের মধ্যে তাকে অবমুক্ত হওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয় এবং নির্দেশ অমান্য করলে তাৎক্ষণিকভাবে স্ট্যান্ড রিলিজ (Stand Release) হিসেবে গণ্য হবে বলে উল্লেখ করা হয়। তবে এ প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত নাছিমা আক্তার তার কর্মস্থল ত্যাগ করেননি; তিনি বহাল তবিয়তে দায়িত্ব পালন করে যাচ্ছেন।
বদলি আদেশ জারির পরদিন থেকে ২৪ থেকে ২৬ জুলাইয়ের মধ্যে তড়িঘড়ি করে একই স্থান থেকে আবারও তিনটি মূল্যবান সরকারি গাছ কেটে নেওয়া হয়। স্থানীয়রা গাছ কাটার ভিডিও উপজেলা প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্ট ভূমি সহকারী কর্মকর্তা এবং অফিস সহায়ক রুকন উদ্দিনের কাছে পাঠান। ভিডিওচিত্রে গাছ কাটা ও সরিয়ে নেওয়ার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের স্পষ্টভাবে শনাক্ত করা সম্ভব হলেও তাদের বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ বা মামলা দায়ের করা হয়নি। বরং ঘটনা ধামাচাপা দিতে অভিযুক্ত কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার গত ২৬ জুলাই বাদী হয়ে পুনরায় কুলিয়ারচর থানায় অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে একটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেন।
এলাকাবাসীর দাবি, প্রকৃত অপরাধীদের রক্ষা করতে এবং নিজের দায় এড়াতেই ভিডিওতে দেখা যাওয়া ব্যক্তিদের নাম বাদ দিয়ে অজ্ঞাতনামা আসামি উল্লেখ করা হয়েছে।
সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রশাসনিক এই উদাসীনতায় স্থানীয়দের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। সচেতন নাগরিকদের মতে, অভিযুক্ত নাছিমা আক্তারের বদলিই এ ঘটনার শেষ সমাধান হতে পারে না।
এলাকাবাসী ও স্থানীয় সচেতন মহল অবিলম্বে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করে ইউনিয়ন ভূমি সহকারী কর্মকর্তা নাছিমা আক্তার, অফিস সহায়ক রুকন উদ্দিনসহ সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের জন্য ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন।
পাশাপাশি, সরকারি জমি ও সম্পদ রক্ষায় স্থায়ী ও কার্যকর উদ্যোগ গ্রহণ এবং ঘটনার সঙ্গে জড়িত ব্যক্তিদের দ্রুত চিহ্নিত করে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ারও দাবি জানিয়েছেন সচেতন নাগরিক ও স্থানীয় বাসিন্দারা।
এ বিষয়ে অভিযুক্ত রুকন উদ্দিনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, আমার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা। গাছ কাটার বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে।
অভিযুক্ত নাছিমা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনিও তার বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ মিথ্যা দাবি করে বলেন, গাছ কাটার বিষয়ে কুলিয়ারচর থানায় দুটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করেছি। ভিডিওচিত্রে গাছ কাটার সঙ্গে জড়িতদের তথ্য-প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও অভিযোগে তাদের নাম উল্লেখ করা হয়নি কেন- এ প্রশ্ন করা হলে তিনি কোনো উত্তর দেননি।
এ বিষয়ে কুলিয়ারচর থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) কাজী আরিফ উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি নাছিমা আক্তারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার সত্যতা স্বীকার করে বলেন, অভিযোগে কারও নাম উল্লেখ করা হয়নি। বাদীকে অভিযুক্তদের নাম উল্লেখ করতে বলা হলেও তিনি কারও নাম দিতে রাজি হননি। তারপরও বিষয়টি তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

