সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

পলাশবাড়ীর মেরীরহাটে নির্মাণাধীন মসজিদের জমির ত্রিমুখী মালিকানা দাবি

পলাশবাড়ীর মেরীরহাটে নির্মাণাধীন মসজিদের জমির ত্রিমুখী মালিকানা দাবি

বায়েজিদ, পলাশবাড়ী (গাইবান্ধা): গাইবান্ধার পলাশবাড়ী উপজেলার হোসেনপুর ইউনিয়নের মেরীরহাট বাজারে নির্মাণাধীন ‘মেরীরহাট বাইতুল আমান জামে মসজিদ’-এর জমির মালিকানা নিয়ে ত্রিমুখী বিরোধের সৃষ্টি হয়েছে। একই জমির ওপর তিনটি ভিন্ন পক্ষ নিজেদের আইনি, সামাজিক ও ধর্মীয় অধিকার এবং মালিকানা দাবি করছে।

প্রথম পক্ষ, এলাকার ধর্মপ্রাণ সাধারণ মানুষ ও মসজিদ নির্মাণ কমিটির দাবি, যে জমির ওপর মসজিদ নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে, সেটি একটি ঐতিহাসিক পীরোত্তর সম্পত্তি। এই সম্পত্তি মুসলিম সম্প্রদায়ের ধর্মীয় কাজে ব্যবহারের জন্য উৎসর্গ করা হয়েছিল। সেই ধারাবাহিকতায় স্থানীয় ধর্মপ্রাণ মানুষের উদ্যোগে সেখানে একটি বহুতল আধুনিক মসজিদ নির্মাণের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। বর্তমানে সেখানে মসজিদের সাইনবোর্ড টাঙিয়ে মাটি খননসহ প্রাথমিক নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে।

দ্বিতীয় পক্ষ, পলাশবাড়ী উপজেলা খাদ্য বিভাগ কর্তৃপক্ষের দাবি, মেরীরহাট বাজারের ওই ২০ শতক জমি সরকারি সম্পত্তি এবং বর্তমানে তা তাদের নামে বিআরএস (BRS) রেকর্ডভুক্ত। তাদের ভাষ্য, বহু বছর ধরে সেখানে সরকারি খাদ্যগুদাম নির্মাণ করে ধান-চাল ক্রয় ও সংরক্ষণের কাজ পরিচালিত হয়ে আসছিল। সময়ের ব্যবধানে গুদামটি ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রকের দাবি, জমিটি খাদ্য বিভাগের একচ্ছত্র সরকারি সম্পত্তি।

তৃতীয় পক্ষ, পীরোত্তর সম্পত্তির মোতোয়াল্লির ওয়ারিশদের দাবি, জমিটি শতবর্ষী পীরোত্তর সম্পত্তি, যার মূল উৎসর্গকারী ছিলেন পীর সাহেব ওলী মেহের আলী (রহ.)। সে সময় সাধারণ মুসলমানদের পক্ষে মুহাম্মদ রণ মামুদ হাজীকে মোতোয়াল্লি হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হয়। পরবর্তীতে সিএস (CS) ও এসএ (SA) জরিপে রণ মামুদ হাজী ও তাঁর ওয়ারিশদের নামে জমিটি আইনগতভাবে রেকর্ডভুক্ত হয়।

ওয়ারিশরা আরও জানান, দীর্ঘদিন জমিটি ফাঁকা পড়ে থাকায় খাদ্য বিভাগ সেখানে গুদাম নির্মাণ করে কার্যক্রম পরিচালনা করছিল। পরবর্তীতে বিআরএস জরিপের সময় জমিটি সরকারি খাদ্য বিভাগের নামে রেকর্ড হয়ে যায়। তবে তাদের দাবি, যেহেতু এটি ওয়াকফ বা পীরোত্তর সম্পত্তি, তাই এটি কোনো ব্যক্তি বা সরকারি-বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের নিজস্ব সম্পত্তি হতে পারে না। এটি মহান আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত জনকল্যাণমূলক ধর্মীয় সম্পত্তি। ভুল রেকর্ড সংশোধনের জন্য ইতোমধ্যে আদালতে মামলা চলমান রয়েছে।

মসজিদ নির্মাণ কমিটির সভাপতি শিক্ষক জামসেদ মো. আমিরুজ্জামান বলেন, এক একর ৮৫ শতক জমি শত বছরের পুরোনো পীরোত্তর ধর্মীয় সম্পত্তি। সিএস ও এসএ রেকর্ডেও এটি ধর্মীয় সম্পত্তি হিসেবে নথিভুক্ত রয়েছে। ওই জমিতে দুটি বিদ্যালয় ও একটি কলেজ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সেখানে একটি বহুতল মসজিদ নির্মাণ এলাকাবাসীর দীর্ঘদিনের দাবি ছিল। তাই এলাকার ধর্মপ্রাণ সর্বস্তরের মানুষকে সঙ্গে নিয়ে আমরা আল্লাহর ঘর নির্মাণের কাজ শুরু করেছি। আশা করি, সরকারি বা সামাজিক কোনো বাধা ছাড়াই এই বরকতময় কাজ সম্পন্ন হবে।

এদিকে উপজেলা ভারপ্রাপ্ত খাদ্য নিয়ন্ত্রক বলেন, মেরীরহাট বাজারের সংশ্লিষ্ট ২০ শতক জমি সরকারের শতভাগ আইনি প্রক্রিয়ায় বিআরএস রেকর্ডভুক্ত। খাদ্য বিভাগ দীর্ঘদিন সেখানে খাদ্যগুদাম পরিচালনা করেছে। অবকাঠামো ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ায় কার্যক্রম বন্ধ করা হয়। পরে পরিত্যক্ত ভবনের ইট-রড কে বা কারা নিয়ে যায়। সরকারি জমিতে অনধিকার প্রবেশ করে স্থাপনা বা মসজিদ নির্মাণের চেষ্টা সম্পূর্ণ বেআইনি। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা হয়েছে এবং সরকারি সম্পত্তি রক্ষায় প্রয়োজনীয় আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে।

অপরদিকে, পীরোত্তর সম্পত্তির মোতোয়াল্লির ওয়ারিশ এবং পলাশবাড়ী পৌর যুবদলের আহ্বায়ক আব্দুল লতিফ সরকার বলেন, আমাদের পূর্বপুরুষ মরহুম রণ মামুদ হাজী এই পীরোত্তর সম্পত্তির চিরস্থায়ী মোতোয়াল্লি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন, যা সিএস ও এসএ খতিয়ানে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে। পরবর্তীতে খাদ্য বিভাগ সাময়িকভাবে জমিটি ব্যবহার করার সুযোগে বিআরএস রেকর্ডে নিজেদের নাম অন্তর্ভুক্ত করে। ওয়াকফকৃত পীরোত্তর সম্পত্তি কোনো দিন ব্যক্তিমালিকানাধীন বা সরকারি খাসজমি হতে পারে না। এটি আল্লাহর নামে উৎসর্গকৃত সম্পত্তি। রেকর্ড সংশোধনের জন্য আমরা আদালতে মামলা করেছি। আশা করি আদালত থেকে ন্যায়বিচার পাব এবং ধর্মীয় কাজের জন্যই জমিটি বহাল থাকবে।

অতীতের উদাহরণ টেনে তিনি আরও বলেন, আমার নানা মরহুম রণ মামুদ হাজী মোতোয়াল্লি হিসেবে পীরোত্তর এক একর ৮৫ শতক জমির মধ্যে থেকে দানকৃত ৪৭ শতক জমির ওপর মেরীরহাট ফাজিল (ডিগ্রি) মাদ্রাসা, মেরীরহাট উচ্চ বিদ্যালয় এবং মেরীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেন। নানার মৃত্যুর পর আমার মামা আব্দুর রহিম মেরীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। চাকরি থেকে অবসর গ্রহণের পর তিনি দাতা সদস্য হিসেবে বিদ্যালয়গুলোর সভাপতি হিসেবেও আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করেন। বর্তমানে তাঁর ছেলে শফিকুল ইসলাম দাতা সদস্য হিসেবে মেরীরহাট সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছেন।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *