সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

কুলিয়ারচরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ; অপসারণের দাবি এলাকাবাসীর

কুলিয়ারচরে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে নানা অনিয়মের অভিযোগ; অপসারণের দাবি এলাকাবাসীর

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ, কুলিয়ারচর (কিশোরগঞ্জ):

কিশোরগঞ্জের কুলিয়ারচর উপজেলার ৪৩ নম্বর দড়িগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে নানা অনিয়ম, দুর্নীতি এবং এলাকাবাসীর সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করে নিজের পছন্দমতো স্কুল ম্যানেজিং কমিটি (এসএমসি) গঠনের চেষ্টার অভিযোগ উঠেছে। এর প্রতিবাদে এবং তাঁর অপসারণের দাবিতে এলাকায় একটি প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে।

রোববার (২৮ জুন) সকাল ১১টার দিকে বিদ্যালয় মাঠে অভিভাবক, গণ্যমান্য ব্যক্তি ও এলাকাবাসীর উদ্যোগে এ প্রতিবাদ সভা অনুষ্ঠিত হয়। বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি ও স্থানীয় ২ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক ইউপি সদস্য মহর উদ্দিনের সভাপতিত্বে সভায় বক্তব্য দেন সালুয়া ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য কামরুল হাসান, বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামান এবং এলাকাবাসীর পক্ষে মো. বাবুল মিয়া, মো. জসিম উদ্দিন, লিটন মিয়া, আইন উদ্দিন, আনোয়ার হোসেন, শামসু মিয়া ও কামরুজ্জামান মেরাজ।

প্রতিবাদ সভা শেষে দুপুরে এলাকাবাসীর পক্ষে ২০ জনের স্বাক্ষরসংবলিত দুটি লিখিত অভিযোগ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে জমা দেওয়া হয়। অভিযোগে মাহমুদা আক্তারকে অপসারণ করে একজন যোগ্য নতুন প্রধান শিক্ষক বা ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক পদায়নের দাবি জানানো হয়।

সভায় বক্তারা অভিযোগ করেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদ্যালয়টি সুনামের সঙ্গে পরিচালিত হলেও মাহমুদা আক্তার ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই বিভিন্ন ধরনের অনিয়ম শুরু হয়েছে। তাঁদের দাবি, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের প্রশাসনিক দুর্বলতার কারণে দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়ার দায়িত্ব পালনে অবহেলার ফলে প্রায় প্রতিদিন রাতে বিদ্যালয় চত্বরে মাদক ও জুয়ার আড্ডা বসে।

এলাকাবাসীর অভিযোগ, ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক স্লিপ (SLIP) প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ স্কুল ম্যানেজিং কমিটির (এসএমসি) অগোচরে ভুয়া ভাউচার ও জাল স্বাক্ষরের মাধ্যমে উত্তোলন করে আত্মসাৎ করেছেন। এছাড়া মা দিবস ও বিভিন্ন জাতীয় দিবস পালনের নামে নামমাত্র খরচ দেখিয়ে, এমনকি কোনো কোনো ক্ষেত্রে দিবস পালন না করেই ভুয়া ভাউচারের মাধ্যমে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগও তোলা হয়। অভিযোগে আরও বলা হয়, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে ‘ম্যানেজ’ করার কথা বলে বিভিন্ন সময় ব্যয়ের খাত দেখানো হয়েছে।

তাঁদের আরও অভিযোগ, সাবেক শিক্ষার্থীরা প্রত্যয়নপত্র নিতে গেলে তাদের কাছ থেকে অতিরিক্ত অর্থ নেওয়া হয়। এছাড়া ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক তাঁর নিজ বাড়িতে শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট বা কোচিং করতে বাধ্য করেন। কেউ রাজি না হলে পরীক্ষায় নম্বর কম দেওয়ার ভয় দেখানো হয় বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগে আরও বলা হয়, কোনো শিক্ষার্থীর জন্মনিবন্ধন বা অন্য কোনো প্রয়োজনে বিদ্যালয়ের প্রত্যয়নপত্র দরকার হলে ডুমরাকান্দা বাজারে অবস্থিত তাঁর স্বামীর কম্পিউটার ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে গিয়ে কাজ না করালে প্রত্যয়নপত্র দেওয়া হয় না। অভিভাবকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার এবং বিদ্যালয় চলাকালীন অফিসিয়াল কাজের অজুহাতে নিয়মিত বিদ্যালয় ত্যাগ করার অভিযোগও করেছেন এলাকাবাসী।

তাঁরা আরও জানান, গত ১৪ মে বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি গঠন নিয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এলাকাবাসীকে নিয়ে একটি সভা করেন। ওই সভায় অভিভাবক ও গণ্যমান্য ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে কোনো নির্বাচন ছাড়াই সর্বসম্মতিক্রমে বিদ্যালয় পরিচালনা পর্ষদের সাবেক সভাপতি মো. মনিরুজ্জামানকে পুনরায় সভাপতি মনোনীত করে একটি খসড়া কমিটি অনুমোদনের জন্য পাঠানোর সিদ্ধান্ত হয়।

কিন্তু ওই কমিটি নিজের পছন্দমতো না হওয়ায় পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই গত ২৫ জুন আবারও একটি সভা ডাকা হয় বলে অভিযোগ করেন এলাকাবাসী। তাঁদের দাবি, ওই সভায় কয়েকজন সদস্যের অনুপস্থিতির সুযোগ নিয়ে বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক তানিয়া বেগমের বাবা, অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা আনোয়ার হোসেনকে সভাপতি করার চেষ্টা করা হয়। একই সঙ্গে সর্বসম্মতিক্রমে মনোনীত স্থানীয় ইউপি সদস্য কামরুল হাসানের সদস্যপদ বাদ দিয়ে বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ উদ্দিনের মা এবং সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনাকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার চেষ্টা করা হলে কয়েকজন অভিভাবক সদস্য আপত্তি জানিয়ে সভা বয়কট করেন।

এলাকাবাসীর দাবি, মাহমুদা আক্তারের বিরুদ্ধে বিভিন্ন অনিয়মের অভিযোগে ২০২৪ সালের ৮ সেপ্টেম্বর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) ও উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে দুটি লিখিত অভিযোগ দাখিল করা হলেও দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও কোনো কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।

বর্তমানে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষকের কর্মকাণ্ডে এলাকাবাসীর মধ্যে তীব্র ক্ষোভ বিরাজ করছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে তাঁকে দ্রুত অপসারণ করে নতুন একজনকে দায়িত্ব দেওয়ার জন্য প্রশাসনের প্রতি জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।

এ বিষয়ে ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক মাহমুদা আক্তারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা সব অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন। তাঁর ভাষ্য, “সম্পূর্ণ নিয়ম মেনেই বিদ্যালয়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। সালুয়া ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২ ও ৩ নম্বর ওয়ার্ডের সংরক্ষিত মহিলা সদস্য মোছা. জামেনাকে কমিটিতে অন্তর্ভুক্ত করার জন্য ইউপি চেয়ারম্যান নিজেই মনোনয়ন দিয়ে চিঠি দিয়েছেন। বিদ্যালয়ের দাতা সদস্য মো. মনিরুজ্জামানকে মেসেঞ্জারে সভার বিষয়ে জানানো হলেও তিনি ২৫ জুনের সভায় উপস্থিত হননি। অপর এক অভিভাবক সদস্য মুক্তা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন হওয়ায় তিনিও উপস্থিত থাকতে পারেননি। তবে তিনি মোবাইল ফোনে সভাপতি নির্বাচনের বিষয়ে সম্মতি দেন। সভাপতি পদে অবসরপ্রাপ্ত ব্যাংক কর্মকর্তা মো. আনোয়ার হোসেন (আঙ্গুর) প্রার্থী হলে অন্য কেউ প্রতিদ্বন্দ্বিতা না করায় উপস্থিত সদস্যদের সর্বসম্মতিক্রমে তাঁকে সভাপতি নির্বাচিত করা হয়। এর প্রমাণ হিসেবে সভাপতি নির্বাচনের রেজুলেশনে উপস্থিত সদস্যদের স্বাক্ষর রয়েছে।”

তিনি আরও বলেন, “শিক্ষার মানোন্নয়নের জন্যই আমি শিক্ষার্থীদের বাড়িতে এনে প্রাইভেট পড়াই। আমার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়ে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটিত হোক।”

অন্যদিকে বিদ্যালয়ের দপ্তরি কাম নৈশপ্রহরী মো. এমাদ মিয়া তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগও সম্পূর্ণ মিথ্যা, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

এ বিষয়ে উপজেলা সহকারী প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা আনিসুর রহমান এলাকাবাসীর লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মাসুদুর রহমান জানান, বিষয়টি তাঁর জানা রয়েছে। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *