আতাউর রহমান কাজল (শ্রীমঙ্গল): শ্রীমঙ্গল উপজেলায় নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দিয়েছে বস্তাভিত্তিক আদা চাষ। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন জানিয়েছেন, এ পদ্ধতিতে পতিত জমি, বাড়ির ছাদ কিংবা উঠানকে উৎপাদনের আওতায় আনা সম্ভব। ফলে একদিকে যেমন চাষাবাদের খরচ কমে, অন্যদিকে রোগবালাইয়ের আক্রমণও তুলনামূলক কম হয়। এতে কৃষকরা স্বল্প ব্যয়ে ভালো ফলন পাচ্ছেন।
বাংলাদেশে মসলা জাতীয় ফসলের মধ্যে আদার রয়েছে বিশেষ চাহিদা। রান্নার অপরিহার্য উপকরণ হওয়ার পাশাপাশি ঔষধি গুণেও আদা সুপরিচিত। কিন্তু দেশে চাহিদার তুলনায় উৎপাদন কম হওয়ায় প্রতিবছর বিপুল পরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করে আদা আমদানি করতে হয়। এ অবস্থায় শ্রীমঙ্গলে কৃষকদের মধ্যে জনপ্রিয় হয়ে উঠছে বস্তায় আদা চাষ। কৃষি বিভাগের উদ্যোগে শুরু হওয়া এ পদ্ধতি ইতোমধ্যে কৃষকদের মাঝে আশার আলো জাগিয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কৃষিবিদ মো. আলাউদ্দিন বলেন, এ পদ্ধতিতে প্রথমে মাটি, জৈব সার ও বালি মিশিয়ে বস্তা ভর্তি করা হয়। পরে বস্তায় আদার কন্দ রোপণ করা হয়। সঠিক পরিচর্যা করলে ৮ থেকে ৯ মাসের মধ্যেই বস্তা থেকে আদা সংগ্রহ করা যায়। বর্তমানে উপজেলায় প্রায় ২৮ হাজার ৫৫০টি বস্তায় আদা চাষ করা হয়েছে। প্রতি বস্তায় গড়ে ৭৫০ গ্রাম আদা উৎপাদন হলে প্রায় ২৪ লাখ টাকার আদা বিক্রি সম্ভব হবে বলে কৃষি বিভাগ আশা করছে।
উপজেলার মোহাজিরাবাদ, খলিলপুর, আশীদ্রোন, পারেরটং, সিন্দুরখান, মাজদিহি ও রাধানগর গ্রামে বস্তাভিত্তিক আদা চাষ বেশি হচ্ছে। প্রায় ৩৫ থেকে ৪০ জন কৃষক এ উদ্যোগে অংশ নিয়েছেন। কৃষি বিভাগের তথ্য অনুযায়ী, হেক্টরপ্রতি গড় উৎপাদন হবে ৮ থেকে ৯ টন।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা সেলিম হোসেন বলেন, এই চাষপদ্ধতি কৃষকদের জন্য অত্যন্ত লাভজনক। কৃষকরা উৎসাহিত হলে শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষ আরও ব্যাপক আকারে ছড়িয়ে পড়বে। তিনি জানান, এবার শ্রীমঙ্গলে ৩০টি প্রদর্শনী প্লট স্থাপন করা হয়েছে। এসব প্লটে কৃষি অফিস থেকে বস্তা, রাসায়নিক সার, জৈব সার, মাইক্রোনিউট্রিয়েন্ট ও বীজ বিনামূল্যে সরবরাহ করা হয়েছে।
উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা মো. মাসুকুর রহমান জানান, বস্তায় আদা চাষ শুধু গ্রামীণ পর্যায়েই নয়, শহরাঞ্চলেও জনপ্রিয় হতে পারে। কারণ এতে ছাদ বা ছোট পরিসরের অব্যবহৃত জায়গা ব্যবহার করে বাড়তি আয় করা সম্ভব। এতে স্থানীয় বাজারে আদার চাহিদা পূরণের পাশাপাশি জাতীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক অবদান রাখা যাবে।
তিনি আরও জানান, এবার শ্রীমঙ্গল উপজেলায় ২৮ হাজার ৫৫০টি বস্তায় আদা চাষ হয়েছে। এসব বস্তা থেকে প্রায় ১৯ হাজার ৯৮৫ কেজি আদা উৎপাদিত হবে, যার বাজারমূল্য প্রায় ২৩ লাখ ৯৮ হাজার ২০০ টাকা।
কৃষি বিভাগ সূত্রে জানা যায়, বাংলাদেশে প্রতিবছর প্রায় ৪ থেকে ৫ লাখ মেট্রিক টন আদার চাহিদা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদন চাহিদার তুলনায় অনেক কম। ফলে প্রতিবছর ভারত, চীনসহ বিভিন্ন দেশ থেকে আদা আমদানি করতে হয়। কৃষি কর্মকর্তাদের মতে, বস্তাভিত্তিক আদা চাষ সারা দেশে সম্প্রসারণ করা গেলে আমদানিনির্ভরতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. আলাউদ্দিন বলেন, আমরা কৃষকদের উৎসাহিত করছি যাতে তারা পতিত জমি বা ছোট জায়গা উৎপাদনের আওতায় আনেন। বস্তায় আদা চাষের মাধ্যমে কৃষকরা যেমন লাভবান হবেন, তেমনি জাতীয় অর্থনীতিতেও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়বে।
তিনি আরও বলেন, শ্রীমঙ্গলে বস্তায় আদা চাষ ইতোমধ্যে একটি সফল মডেল হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। কৃষি অফিসের পরিকল্পিত উদ্যোগ, কৃষকদের পরিশ্রম এবং সরকারি সহায়তার সমন্বয়ে এ সাফল্য অর্জিত হয়েছে। আগামী দিনে এ মডেল দেশের অন্যান্য অঞ্চলেও ছড়িয়ে পড়লে বাংলাদেশ আদা উৎপাদনে স্বনির্ভর হতে পারবে বলে আশা করছেন কৃষি বিশেষজ্ঞরা।

