আতাউর রহমান কাজল, শ্রীমঙ্গল (মৌলভীবাজার): শ্রীমঙ্গলের কথা বললেই চোখে ভাসে সবুজে মোড়া চা-বাগান, নিবিড় বন আর পাহাড়ঘেরা রূপকথার মতো প্রকৃতি| তবে এই সবুজ রাজ্যে আরেকটি স্বাদ ও অর্থনীতির রত্ন আছে, যার নাম আনারস| প্রাকৃতিক বৈচিত্র্য ও উর্বর ভূমির এক অনন্য মেলবন্ধন এ আনারসকে দিয়েছে স্বকীয়তা, স্বাদ আর সুবাসে অনন্যতা|
শ্রীমঙ্গলের আনারস মূলত: গায়ে সোনালি হলুদ রঙ, গন্ধে মিষ্টি তীব্রতা এবং স্বাদে রসে ভরপুর ও কোমলতা| আকারে মাঝারি হলেও খোসার নিচে যে স্বাদ লুকিয়ে থাকে, তা একবার চেখে দেখলেই বোঝা যায় কেন শ্রীমঙ্গলের আনারসের এত খ্যাতি|
কৃষি সম্প্রসারন কর্মকর্তা উজ্জ্বল সুত্রধর জানান, চাষের সময় মে থেকে আগস্ট| তবে জুন-জুলাইতে আনারসের মৌসুম যেন প্রকৃতির উৎসব হয়ে ওঠে| শ্রীমঙ্গলের পাহাড়ি অঞ্চলসহ বিস্তৃর্ণ জমিতে আনারস চাষ হয়ে থাকে| বর্তমানে শ্রীমঙ্গলের ৪২৫ হেক্টর জমিতে আনারস চাষ হয়| এরমধ্যে ৩৪৫ হেক্টর জমিতে হানিকুইন এবং ৭৫ হেক্টর জমিতে জায়েন্ট কিউ জাতের চাষ হয়| এছাড়াও ফিলিপাইন থেকে আমদানীকৃত এমডি-২ চারা দিয়ে ৫ হেক্টর জমিতে আনারসের চাষ হচ্ছে| পরিক্ষামুলক আনারসের এ চাষও সফল হয়েছে| শ্রীমঙ্গলে উৎপাদিত হাজার হাজার টন আনারস এখান থেকে দেশের বিভিন্ন স্থানে সরবরাহ করা হয়| শ্রীমঙ্গলে আনারসের উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা এ বছর ৬ হাজার ৬৪০ মেট্রিক টন| কিন্তু লক্ষ্যমাত্রা ছাড়িয়ে উৎপাদন হয়েছে ৬ হাজার ৮২১ টন| যার গড় বাজারমূল্য সাড়ে ১২ কোটি টাকা|
শ্রীমঙ্গলের আনারস শুধু স্বাদেই নয়, অর্থনৈতিক দিক থেকেও গুরুত্ব বহন করে| স্থানীয় কৃষকেরা মৌসুমে বড় আকারের আনারস চাষ করে থাকেন| এগুলো সিলেট, ঢাকা, চট্টগ্রামসহ দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সরবরাহ করা হয়| অনেকে আবার স্থানীয় পর্যটকদের কাছেও বিক্রি করে আয় করেন|
টিলায় টিলায় সোনালী আনারসের সারি পর্যটকদের মুগ্ধ করে| অনেক পর্যটক সরাসরি বাগান থেকে আনারস কিনে খাওয়ার অভিজ্ঞতা নিতে আসেন| ফলে এটি গ্রামীণ পর্যটন উন্নয়নে ভুমিকা রাখছে|
শ্রীমঙ্গলের পর্যটনের সঙ্গে আনারস বাগান ঘনিষ্ঠভাবে জড়িত হতে পারে| অনেক পর্যটকই এখন চা-বাগান ছাড়াও আনারস বাগান ঘুরে দেখতে চান, যেখানে প্রকৃতির রূপ আর কৃষির ঘ্রাণ মিলে তৈরি হয় এক ভিন্ন অভিজ্ঞতা| চাইলেই এখানে আয়োজন করা যায় ‘আনারস উৎসব’, যেখানে থাকবে স্থানীয় কৃষকদের স্টল, আনারস দিয়ে তৈরি খাবার, ও কৃষিভিত্তিক পর্যটন|
এছাড়া ভবিষ্যতে জিআই পণ্য হিসেবে স্বীকৃতি পেলে শ্রীমঙ্গলের আনারস আন্তর্জাতিক বাজারেও পরিচিত হতে পারে| এছাড়া সরকারি বা বেসরকারি উদ্যোগে পৃষ্টপোষকতা পেলে শ্রীমঙ্গলের আনারস ‘প্রিমিয়ার ফ্রুট’ হিসেবে পরিচিতি পেতে পারে|
তবে এই সম্ভাবনার পথ একেবারেই মসৃণ নয়| চ্যালেঞ্জ আছে| সংরক্ষণের ব্যবস্থা দুর্বল, প্রক্রিয়াজাতকরনের অভাব, উৎপাদনের সময় দাম পড়ে যাওয়া, আর কিছু এলাকায় এখনো আধুনিক চাষপদ্ধতি ব্যবহার হয় না| প্রশিক্ষণ, উন্নত জাতের চারা, সরকারি সহায়তা এবং স্থানীয় উদ্যোক্তাদের যুক্ত করা গেলে এই সমস্যাগুলো সহজেই মোকাবেলা করা সম্ভব|
এটি শুধু একটি ফল নয়, বরং একটি সম্ভাবনা| এটি এখানকার সংস্কৃতি, কৃষি, পর্যটন, অর্থনীতি ও পরিচয়ের অংশ| সঠিক পরিকল্পনা আর পৃষ্ঠপোষকতায় এটি হয়ে উঠতে পারে দেশের অন্যতম ব্র্যান্ড পণ্য| তাছাড়া জিআই পণ্য হিসেবে নিবন্ধন, আনারসভিত্তিক খাদ্য প্রক্রিয়াজাত শিল্প, এগ্রো-ট্যুরিজম ও রপ্তানির সম্ভাবনা রয়েছে| যথাযথ পৃষ্টপোষকতা ও বিপননের মাধ্যমে শ্রীমঙ্গলের আনারস আন্তর্জাতিক বাজারেও একটি পরিচিত ব্রাণ্ডে রূপ নিতে পারে|

