সর্বশেষ :
19 Oct 2026, Mon

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিধবাকে হত্যার হুমকি, থানায় অভিযোগের পরও মিলছে না প্রতিকার

কুপ্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় বিধবাকে হত্যার হুমকি, থানায় অভিযোগের পরও মিলছে না প্রতিকার

মুহাম্মদ কাইসার হামিদ : কিশোরগঞ্জের কটিয়াদী উপজেলার জালালপুর ইউনিয়নের দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া গ্রামে এক অসহায় বিধবা নারীকে কুপ্রস্তাব দেওয়া, মানসিক নির্যাতন, উত্যক্ত করা এবং সর্বশেষ ধারালো অস্ত্র উঁচিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে এক চিহ্নিত মাদকসেবী ও মাদক কারবারির বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় কটিয়াদী মডেল থানায় লিখিত অভিযোগ দায়েরের ছয় সপ্তাহ পার হলেও মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ করা হয়নি বলে অভিযোগ উঠেছে। বরং অভিযুক্তের পক্ষ নিয়ে পুলিশ ভুক্তভোগী পরিবারকে আপস-মীমাংসার জন্য চাপ দিচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাদী। থানায় অভিযোগ করেও কোনো প্রতিকার না পেয়ে তিন কন্যাসন্তান ও বৃদ্ধা মাকে নিয়ে চরম আতঙ্ক ও নিরাপত্তাহীনতায় দিন কাটাচ্ছেন ভুক্তভোগী পরিবার।

ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার (৩৫) দক্ষিণ চরপুক্ষিয়া গ্রামের মৃত রিপন মিয়ার স্ত্রী। অভিযুক্ত শাহজাহান (৪২) একই গ্রামের মৃত শামসুদ্দিন সামুর ছেলে। এলাকায় তিনি চিহ্নিত মাদক কারবারি ও মাদকসেবী হিসেবে পরিচিত বলে জানা গেছে।

অভিযোগ সূত্রে জানা যায়, প্রায় দুই বছর আগে স্বামী মারা যাওয়ার পর থেকে তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে অন্যের বাড়িতে কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করছেন নার্গিস আক্তার। স্বামীর মৃত্যুর পর থেকেই তার ওপর কুদৃষ্টি পড়ে প্রতিবেশী শাহজাহানের। তিনি বিভিন্ন সময়ে নার্গিস আক্তারকে কুপ্রস্তাব দিয়ে আসছিলেন। এসব অনৈতিক প্রস্তাবে রাজি না হওয়ায় তার ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠেন শাহজাহান।

অভিযোগে আরও বলা হয়, নার্গিস আক্তারের চলাচলের পথে ওত পেতে থাকা, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা লঙ্ঘন করে টয়লেট ও গোসলখানার আশপাশে অবস্থান করা, অশ্লীল ইঙ্গিত দেওয়া এবং কুপ্রস্তাব দেওয়ার মতো কর্মকাণ্ড চালিয়ে আসছিলেন শাহজাহান। এসব ঘটনায় ওই নারী চরম বিব্রতকর ও ভীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হন। প্রতিবাদ করলে তাকে ধারালো ছুরি দেখিয়ে প্রাণনাশের হুমকি দেওয়া হয়। এছাড়া রাতের আঁধারে ঘরের দরজায় এসে জোরপূর্বক দরজা খোলার জন্য চাপ সৃষ্টি করা এবং দরজা না খুললে হত্যার হুমকি ও অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করারও অভিযোগ রয়েছে। বিষয়টি একাধিকবার স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের জানানো হলেও কোনো সমাধান হয়নি।

ঘটনার ধারাবাহিকতায় গত ২৯ এপ্রিল সকালে নার্গিস আক্তার কাজের উদ্দেশ্যে পাশের একটি মুরগির খামারে যান। তার অনুপস্থিতিতে শাহজাহান ধারালো ছুরি হাতে তার বাড়িতে গিয়ে চড়াও হন। নার্গিস আক্তারকে না পেয়ে তার বৃদ্ধা মাকে উদ্দেশ করে অশ্রাব্য ভাষায় গালিগালাজ করতে থাকেন এবং অভিযোগ করেন যে, মায়ের কারণেই নার্গিস তার কথায় রাজি হচ্ছেন না।

এ সময় বৃদ্ধা মা তাকে গালিগালাজ করতে নিষেধ করলে শাহজাহান আরও ক্ষিপ্ত হয়ে হাতে থাকা ছুরি নিয়ে তাকে হত্যার উদ্দেশ্যে তেড়ে যান। প্রাণভয়ে বৃদ্ধা পাশের বাড়িতে আশ্রয় নিয়ে রক্ষা পান। উপস্থিত লোকজন ঘটনাটি প্রত্যক্ষ করেন। এ সময় শাহজাহান প্রকাশ্যে হুমকি দেন, নার্গিস আক্তার তার কথায় রাজি না হলে মা ও মেয়েকে হত্যা করা হবে। পরে এলাকাবাসী তার কাছ থেকে ছুরিটি উদ্ধার করে এবং তাকে সেখান থেকে চলে যেতে বলেন।

ঘটনার পরদিন নয়, ওইদিনই ২৯ এপ্রিল বিকেলে ভুক্তভোগী নার্গিস আক্তার বাদী হয়ে কটিয়াদী মডেল থানায় একটি লিখিত অভিযোগ (নম্বর- R-845/26) দায়ের করেন। তবে অভিযোগ দায়েরের প্রায় দেড় মাস পার হলেও দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ রয়েছে।

নার্গিস আক্তার অভিযোগ করেন, গত ৮ জুন রাতে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আক্তার হোসেন তাদের থানায় ডেকে নেন এবং অভিযুক্তের সঙ্গে আপসের জন্য চাপ দেন। এমনকি অভিযুক্ত শাহজাহানের কাছ থেকে উদ্ধার করা ধারালো ছুরিটি ৯ জুন দুপুর ১২টার মধ্যে থানায় জমা দিতে বলেন।

এর আগে এসআই আক্তার হোসেন বাদীর বাড়িতে গিয়ে বলেন, আমরা আসামিকে গ্রেপ্তার করে জেলে পাঠালে কী লাভ হবে? কয়েকদিন পর জামিনে বের হয়ে আবার তোমাকে অত্যাচার করবে। আমরা কি সবসময় তোমাদের পাহারা দিতে পারব? বরং বিষয়টি আপস-মীমাংসা করে ফেলো।

ভুক্তভোগী পরিবারের ধারণা, অভিযুক্তের কাছ থেকে মোটা অঙ্কের অর্থ নিয়ে পুলিশ মামলাটি এফআইআর হিসেবে গ্রহণ না করে আপস করানোর চেষ্টা করছে।

গত ৫ জুন কটিয়াদীতে গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের পাট ও বস্ত্র মন্ত্রণালয়ের প্রতিমন্ত্রী মো. শরীফুল আলম এমপির উপস্থিতিতে একটি মাদকবিরোধী সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। সেখানে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মোকসেদুর রহমান ঘোষণা দেন, কোনো মাদক কারবারি পার পাবে না; তাদের সাত হাত পানির নিচ থেকেও খুঁজে বের করে আইনের আওতায় আনা হবে। তিনি মাদকের বিরুদ্ধে ‘জিরো টলারেন্স’ নীতির কথাও বলেন।

তবে স্থানীয় সচেতন মহল ও ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, ওসির বক্তব্যের সঙ্গে বাস্তবতার মিল নেই। একজন চিহ্নিত মাদক কারবারির বিরুদ্ধে গুরুতর অভিযোগ থাকা সত্ত্বেও পুলিশি নিষ্ক্রিয়তা এবং উল্টো আপসের চাপ দেওয়ার ঘটনা সেই বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করেছে।

বর্তমানে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগতে থাকা নার্গিস আক্তার ও তার পরিবার ন্যায়বিচারের আশায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন মহলের জরুরি হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।

এ বিষয়ে মঙ্গলবার দুপুরে তদন্তকারী কর্মকর্তা এসআই মো. আক্তার হোসেনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আসামি আর কখনো বাদিনীকে বিরক্ত করবে না। যদি বিরক্ত করে, তাহলে তাকে বেঁধে রাখার জন্য বলা হয়েছে।

অপরদিকে কটিয়াদী মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) মোহাম্মদ মোকসেদুর রহমান নার্গিস আক্তারের লিখিত অভিযোগ পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করে বলেন, আসামি শাহজাহান বাদিনীকে বিয়ে করতে চায়। তদন্তকারী কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের বিষয়টি আমার জানা নেই। যদি তিনি এমন আচরণ করে থাকেন, তাহলে তাকে ডেকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে। এছাড়া অভিযোগটি তদন্তসাপেক্ষে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *