বেলাল আহমদ, লামা (বান্দরবান): “লামার ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়ন যেন আরেক সলিমপুর: যেখানে পুলিশ যেতে ভয় পায়” শিরোনামে ২৫ মে সংবাদ প্রকাশের পর অবশেষে টনক নড়েছে প্রশাসনের। বান্দরবানের লামা উপজেলার ৩নং ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের কুমারী এলাকায়, যা দীর্ঘদিন ধরে অপরাধের স্বর্গরাজ্য ও অবিকল ‘সলিমপুর’ হিসেবে পরিচিতি পাচ্ছিল, সেখানে অভিযান পরিচালনা করেছে লামা উপজেলা প্রশাসন ও পুলিশ।
২৫ মে (সোমবার) দুপুর ২টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৫টা ৩০ মিনিট পর্যন্ত ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের পেতাইন্যাছড়া এলাকার বিভিন্ন বালুর পয়েন্টে এই যৌথ অভিযান চালানো হয়। অভিযানে নেতৃত্ব দেন লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মঈন উদ্দিন। কুমারী পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ এসআই (নিঃ) জামিল আহমেদ সঙ্গীয় অফিসার ও ফোর্সসহ অভিযানে সহযোগিতা করেন।
সরেজমিনে জানা যায়, কুমারী পুলিশ ফাঁড়ির ঠিক পেছনেই অবস্থিত পেতাইন্যাছড়া এলাকায় স্থানীয় একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে আইনের শাসনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে আসছিল। প্রভাব খাটিয়ে সেখানে অবাধে চলছিল অবৈধ বালু উত্তোলন ও পাচারের মহোৎসব। যার ফলে সাধারণ মানুষের বসতভিটা ও চাষের জমি চরম ঝুঁকিতে পড়েছিল। অপরাধীদের দাপটে সেখানে একসময় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রবেশেও স্থবিরতা দেখা দিয়েছিল।
অভিযান সূত্রে জানা যায়, সোমবার দুপুরে নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে টাস্কফোর্স এলাকায় প্রবেশ করলে অভিযানের খবর টের পেয়ে অবৈধ বালু উত্তোলনের সঙ্গে জড়িতরা কৌশলে পালিয়ে যায়। তবে ঘটনাস্থল থেকে বালু উত্তোলনে ব্যবহৃত ২টি বড় ডিজেলচালিত মেশিন এবং ৩টি ছোট ডিজেলচালিত মেশিনসহ মোট ৫টি ড্রেজার মেশিন জব্দ করা হয়। একই সঙ্গে অবৈধভাবে উত্তোলন করে রাখা আনুমানিক ১ লাখ ঘনফুট বালু জব্দ তালিকামূলে জব্দ করা হয়।
পরবর্তীতে জব্দকৃত ১ লাখ ঘনফুট বালু স্থানীয় ৩নং ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের ৪নং ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. ওমর ফারুকের জিম্মায় প্রদান করা হয়েছে। এছাড়া জব্দকৃত ৫টি মেশিন লামা উপজেলা পরিষদে নিয়ে আসা হয়।
অভিযানের বিষয়ে জানতে চাইলে লামা উপজেলা নির্বাহী অফিসার ও এক্সিকিউটিভ ম্যাজিস্ট্রেট মো. মঈন উদ্দিন জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন এবং পরিবেশ ধ্বংসকারীদের বিরুদ্ধে প্রশাসন সর্বদা কঠোর অবস্থানে রয়েছে। কুমারী এলাকার অবৈধ বালুর পয়েন্টে অভিযান চালিয়ে বিপুল পরিমাণ বালু ও মেশিন জব্দ করা হয়েছে। পলাতক আসামিদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণের প্রক্রিয়া চলমান রয়েছে।
এই অভিযানের পর দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ কুমারী ও পেতাইন্যাছড়া এলাকার সাধারণ মানুষের মনে স্বস্তি ফিরে এসেছে। স্থানীয়রা এই সাহসী অভিযানের জন্য প্রশাসন ও গণমাধ্যমকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন।
ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সাবেক যুবদল সভাপতি গিয়াস উদ্দিন, স্বেচ্ছাসেবক দল সভাপতি সরওয়ার আলম, শ্রমিক দল সভাপতি নাজিম উদ্দিন, কুমারী এলাকার বিএনপি নেতা আবুল হোসেন এবং কুমারী তৃণমূল যুবদল নেতা নজরুল ইসলামের নেতৃত্বে এই অবৈধ বালুর ব্যবসা পরিচালিত হচ্ছে বলে জানা যায়। দলীয় প্রভাব খাটিয়ে এই চক্রটি দীর্ঘদিন ধরে ছড়া ও ফসলি জমির বুক চিরে বালু লুটে নিচ্ছে বলেও অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে এই সিন্ডিকেটের মূল হোতাদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।

