আকতার হোসেন বকুল, পাঁচবিবি (জয়পুরহাট): জন্মের পর থেকেই যেন দুঃখ তার নিত্যসঙ্গী। বাবার স্নেহ পাননি, স্বামীর সংসারও টেকেনি। সুখ কী জিনিস, তা যেন কখনো জানার সুযোগই হয়নি। তবুও জীবনের কঠিন বাস্তবতায় ভেঙে না পড়ে কষ্ট ও অভাবকে সঙ্গী করে, পরিশ্রমকে পুঁজি বানিয়ে বৃদ্ধা মায়ের সংসারের হাল একাই টেনে নিয়ে যাচ্ছেন জয়পুরহাটের পাঁচবিবি পৌরসভার ৮ নম্বর ওয়ার্ডের বাসিন্দা সুরাইয়া সুলতানা সীমা।
সীমা মরহুম দেলোয়ার হোসেন দুলুর ছোট মেয়ে। তিন বোন ও এক ভাইয়ের মধ্যে তিনি সবার ছোট। সীমা জানান, ছোটবেলায় তাদের বাবা স্ত্রী ও চার সন্তানকে রেখে অন্যত্র বিয়ে করে চলে যান। এরপর কেটে গেছে ২০ বছরেরও বেশি সময়। বাবার সঙ্গে আর কোনো যোগাযোগ হয়নি।
তিনি বলেন, বাবা আমাদের ছেড়ে যাওয়ার পর দাদা রাগ করে বাবার অংশের সম্পত্তি মায়ের নামে লিখে দেন। সেই সম্পত্তিই বর্তমানে মা-মেয়ের বেঁচে থাকার শেষ সম্বল। তবে এ কারণে আত্মীয়স্বজনের নানা বিরূপ আচরণ ও চোখ রাঙানিও সহ্য করতে হয়েছে।
সময়ের সঙ্গে বড় দুই বোন ও ছোট ভাইয়ের বিয়ে হয়। কিন্তু ছোট ভাইয়ের সংসারও টেকেনি। সীমার ভাষ্য, এলাকার কিছু অসৎ মানুষের খপ্পরে পড়ে ভাই সর্বস্ব হারিয়ে দেনাগ্রস্ত হয়ে পড়েন। একপর্যায়ে স্ত্রীও তাকে ছেড়ে চলে যান। আগে তিনি পাঁচবিবি রেলস্টেশন এলাকায় পুরোনো কাপড়ের ব্যবসা করতেন। বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন।
নিজের জীবনেও সুখ দীর্ঘস্থায়ী হয়নি সীমার। ভালোবেসে বিয়ে করলেও বৃদ্ধা মাকে একা রেখে শ্বশুরবাড়িতে যেতে রাজি না হওয়ায় একসময় তার স্বামীও অন্যত্র বিয়ে করেন। ফলে মায়ের মতো তার দাম্পত্য জীবনও ভেঙে যায়।
তবে জীবনের এসব দুঃখ-কষ্টকে কখনো দুর্বলতা হিসেবে দেখেননি সীমা। বরং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে নিজের ও মায়ের জীবনযুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছেন। স্কুলজীবন থেকেই তিনি কাজ শুরু করেন। প্রথমে দর্জির কাজ শেখেন। পরে বড় বোনের সেলাই মেশিন নিয়ে বাড়িতেই মানুষের কাপড় সেলাইয়ের কাজ শুরু করেন।
দর্জির কাজের পাশাপাশি তিনি হাঁস-মুরগি, গরু ও ছাগল পালন করেন। বাড়ির ছোট একটি পুকুরে মাছ চাষও করেন। অবসর সময়ে এলাকার ছোট-বড়দের পবিত্র কোরআন শরিফ পড়ান। এসব আয় দিয়েই মা-মেয়ের সংসার চলে। সঞ্চিত কিছু টাকা দিয়ে একটি ছোট ঘরও নির্মাণ করেছেন।
সীমার দৃঢ় প্রত্যয়, শরীরে যতদিন শক্তি থাকবে, ততদিন কারও কাছে হাত পাতব না। নিজের পরিশ্রমে ডাল-ভাত খেয়ে বাঁচতে চাই।
পাঁচবিবির এই সংগ্রামী নারীর গল্প শুধু বেঁচে থাকার নয়, মাথা উঁচু করে বেঁচে থাকারও। সমাজ ও সংসার বারবার তাকে আঘাত করলেও তিনি থেমে যাননি। প্রতিদিন নতুন উদ্যমে জীবনযুদ্ধে লড়াই করে চলেছেন।
মায়ের মতো কষ্টের জীবন কাটাতে কষ্ট লাগে কি না- এমন প্রশ্নের জবাবে সীমা বলেন, অভাব আর কষ্টেই যাদের জীবন গড়া, তাদের আবার কষ্ট কিসের?
তবে তার একটি ছোট্ট প্রত্যাশা রয়েছে। তিনি বলেন, সরকার বা কোনো স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন যদি আমাকে একটি সেলাই মেশিন দিত, তাহলে বড় বোনের কাছ থেকে নেওয়া মেশিনটি তাকে ফিরিয়ে দিতে পারতাম। এতে আমার কাজও চলত, বোনেরও উপকার হতো।

