সর্বশেষ :
20 Oct 2026, Tue

সাব-রেজিস্ট্রার বদলি: আসিফ নজরুলের শতকোটি টাকা দুর্নীতির নেপথ্যে রমজান-মাইকেল

সাব-রেজিস্ট্রার বদলি: আসিফ নজরুলের শতকোটি টাকা দুর্নীতির নেপথ্যে রমজান-মাইকেল

নিজস্ব প্রতিবেদক: সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতে আসিফ নজরুলের শতকোটি টাকা দুর্নীতির নেপথ্যে রমজান খান ও মাইকেল মহিউদ্দিনের চক্র। সরকার পতনের পর তাদের নেতৃত্বে ২০২৪ সালের ২৭ আগস্ট নিজেদের সম্পদ বিবরণী জমা দেওয়ার বিরুদ্ধে সচিবালয়ে বিক্ষোভের মাধ্যমে কর্মকর্তাদের ওপর চাপ প্রয়োগ করে নিজেদের আধিপত্যের জানান দেন। এর পরে নির্বাচন না দিয়ে, আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে আধিপত্য বিস্তারকারী রমজান কমিটির সিনিয়র সহসভাপতি, আওয়ামী লীগ সরকারের সুবিধাভোগী চক্রের সদস্য নিজের এলাকা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মাইকেল মহিউদ্দিনকে সামনে নিয়ে আসেন।

কমিটির মেয়াদ পূরণের আগেই ১২ জানুয়ারি নতুন কমিটি ঘোষণা করা হয়, যেখানে নামমাত্র পুতুল সভাপতি করা হয় খন্দকার জামিলুর রহমানকে, যিনি চট্টগ্রাম জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। আর সকল সাব-রেজিস্ট্রারকে একক নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নতুন করে বদলি বাণিজ্য শুরু করেন, নিজেই মহাসচিবের দায়িত্ব নেওয়া মাইকেল মহিউদ্দিন আব্দুল্লাহ।

বিগত সরকারের সময়ে নানা বিতর্কে দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত হয়ে সংবাদ শিরোনাম হওয়া মাইকেল, সে সময় লোভনীয় পদায়ন নিয়েছেন- ঢাকার সাভার, নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ, টঙ্গী, মুন্সিগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন জায়গায়। সাব-রেজিস্ট্রারদের ভাষ্য অনুযায়ী, এসব পদায়ন নিতে অন্তত চার-পাঁচ কোটি টাকা খরচ করতে হয়, যা অনায়াসেই গ্রহণ করেছেন মাইকেল।

এসব জায়গায় দায়িত্ব পালনের সময় নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কারণে নিয়মিত পত্রিকার শিরোনাম হলেও তাকে সরানোর সাহস কারও ছিল না। কারণ, তার সঙ্গে ছিলেন তৎকালীন ‘বদলি সম্রাট’ হিসেবে পরিচিত রমজান খান।

সরকার পতনের পর আন্দোলনের ভয় দেখিয়ে পরে শতকোটি টাকা লেনদেনের মাধ্যমে আইন মন্ত্রণালয়ের উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সঙ্গে সম্পর্ক তৈরি করা হয়। রমজান থেকে মাইকেলের হাতে সিন্ডিকেটের ক্ষমতা গেলেও নিয়ন্ত্রণে ছিলেন রমজানই, যার ফলে নিজেও সুবিধা নিয়েছেন তিনি।

তিনি মুন্সিগঞ্জের সিরাজদিখানের সাব-রেজিস্ট্রার থেকে জেলা রেজিস্ট্রার পদে পদায়নের সময়, বদলিতে ‘সি’ গ্রেড অফিস পাওয়ার রেওয়াজ থাকলেও ‘এ’ গ্রেডের পোস্টিং নিয়েছেন মুন্সিগঞ্জ জেলা রেজিস্ট্রার হিসেবে। আর মুন্সিগঞ্জ সদরের সাব-রেজিস্ট্রারের দায়িত্বে থাকা মাইকেল নিয়েছেন ঢাকার লোভনীয় খিলগাঁওয়ের সাব-রেজিস্ট্রারের পদ।

মাইকেলকে দিয়ে সাব-রেজিস্ট্রার বদলির নতুন সিন্ডিকেটের ‘বস’ হয়ে ওঠা রমজান নতুন কমিটিতে যাদের রেখেছেন, তাদের কাছ থেকে কমপক্ষে ২ থেকে ৫ কোটি টাকা করে নিয়ে মাইকেলের হাতে তুলে দেন। সেই টাকার একটি অংশ যায় আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের কাছে। যার ফলে কমিটির সদস্যরা পূর্ণ মেয়াদ তো দূরের কথা, নিয়ম অনুযায়ী দুই বছর থাকার পরিবর্তে এক মাসের মাথায় নতুন পদায়ন নিতে দেখা যায়।

এভাবেই চলতে থাকে আসিফ নজরুল-রমজান- মাইকেল চক্রের বদলি বাণিজ্য।

ঢাকার গুলশানের গ্লোরিয়া জিন্স রেস্তোরাঁসহ বিভিন্ন নামিদামি হোটেলে চলত এই বদলি বাণিজ্যের আলাপ-আলোচনা। দিন শেষে টাকার বড় অংশ চলে যেত আসিফ নজরুলের কাছে।

সারা দেশের সাব-রেজিস্ট্রারদের নিয়ন্ত্রণকারী হয়ে ওঠেন মাইকেল। এমনকি বদলির পর পদ ধরে রাখতে নিয়মিত মাসোহারা দিতে হয় তাকে। মাসিক ১০ থেকে ৩০ লাখ টাকা না দিলে পদায়ন টিকবে না- এমন হুমকিও দেওয়া হয় সাব-রেজিস্ট্রারদের। কয়েকজন সাব-রেজিস্ট্রারের সঙ্গে কথা বলে এমন চাঞ্চল্যকর তথ্যের অডিও রেকর্ড পেয়েছে এই প্রতিবেদক।

এছাড়া কমিটির যুগ্ম মহাসচিব গোলাম মোস্তফা কমিটিতে প্রবেশ করেই চুয়াডাঙ্গা থেকে বদলি হয়ে চলে আসেন নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লায়। যুগ্ম মহাসচিব জাহাঙ্গীর আলম শেরপুরে মাত্র কয়েক মাস থাকার পর কমিটিতে পদ পেয়ে দেশের অন্যতম লোভনীয় পোস্টিং বাড্ডায় বদলি হন, যেখানে বদলি হতে পাঁচ কোটির বেশি টাকা লাগে।

সাংগঠনিক সম্পাদক মামুন বাবর মিরোজ মানিকগঞ্জের সিঙ্গাইর থেকে ঢাকার কেরানীগঞ্জে সাব-রেজিস্ট্রার হিসেবে আসেন। আরেক সাংগঠনিক সম্পাদক মো. আব্দুল বাতেন পূর্ণ মেয়াদ শেষ না করেই ঢাকার নবাবগঞ্জ থেকে গাজীপুর সদরে লোভনীয় পদায়ন নেন।

সাংস্কৃতিক সম্পাদক আদনান নোমানও লোভনীয় বদলি নেন। যুগ্ম সাংস্কৃতিক সম্পাদক মো. সাজ্জাদ হোসেন সিলেটের গোলাপগঞ্জের ‘সি’ গ্রেড পোস্টিং থেকে নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে ‘এ’ গ্রেড পোস্টিং পান। ক্রীড়া সম্পাদক খায়রুল বাসার তিন মাসে তিনবার বদলি হয়ে ঢাকার আশুলিয়ায় আসেন।

তার পদায়নের পেছনে রয়েছে বিপুল টাকার লেনদেন। বিভিন্ন জায়গায় অনৈতিক কর্মকাণ্ড করে নিজের পছন্দমতো বদলি নিয়েছেন তিনি- টাঙ্গাইলের কালিহাতি থেকে নেত্রকোনার কেন্দুয়া, সেখান থেকে ঢাকার আশুলিয়া।

দলিল স্বাক্ষরের জন্য অতিরিক্ত টাকা নেওয়ার অভিযোগে দলিল লেখকদের একাধিক লিখিত অভিযোগ ও কলম বিরতির পরও বহাল রয়েছেন খায়রুল বাসার। অথচ আশুলিয়ায় তার স্থলাভিষিক্ত হন খালেদা বেগম। কিন্তু সেখানে থাকতে বিপুল অর্থ দিতে রাজি না হওয়ায় তাকে দুই মাসের মাথায় হবিগঞ্জের চুনারুঘাটে বদলি করা হয়।

যুগ্ম সম্পাদক খিদমতের দায়িত্বে থাকা মো. জাহিদুর রহমান গাজীপুরের কালীগঞ্জের ‘সি’ গ্রেড পোস্টিং থেকে কক্সবাজার সদরে সাব-রেজিস্ট্রার হন। এছাড়া কমিটির বাকি সদস্যরাও এই রমজান-মাইকেল সিন্ডিকেটের মাধ্যমে লোভনীয় পদায়ন পেয়েছেন।

গোপন সূত্রে জানা যায়, এই চক্রের ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব গড়ে তুলতে গাজীপুর সদরের সাব-রেজিস্ট্রার ও কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক আব্দুল বাতেনের মাধ্যমে সব লেনদেন সম্পন্ন করা হয়।

গেল বুধবার দুদকের কার্যালয়ে সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ব্যারিস্টার এম সারোয়ার হোসেন এ বিষয়ে আবেদন দাখিল করেন।

আবেদনে ‘৮ মাসে ঘুষ লেনদেন শতকোটি’ শিরোনামে পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন সংযুক্ত করা হয়েছে।

ওই প্রতিবেদনে বলা হয়, অন্তর্বর্তী সরকারের আমলের আট মাসে আইন মন্ত্রণালয়ে শুধু সাব-রেজিস্ট্রার বদলিতেই শতকোটি টাকার ঘুষ লেনদেন হয়েছে। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুলের সময়ে কোনো নীতিমালা অনুসরণ করা হয়নি।

ঘুষের টাকা পরিশোধ না করায় বদলির আদেশ স্থগিত করার প্রমাণও পাওয়া গেছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয়-সাত মাসে তিন- চারবার বদলি করা হয়েছে।

অক্টোবর ২০২৪ থেকে এপ্রিল ২০২৫ পর্যন্ত আট মাসে নিবন্ধন অধিদপ্তরের ৪০৩ জন সাব-রেজিস্ট্রারের মধ্যে কমপক্ষে ২৮২ জনকে বদলি করা হয়েছে। এর মধ্যে অন্তত ২০০ জন ঘুষের মাধ্যমে পছন্দের অফিসে বদলি হয়েছেন। জনপ্রতি ৫০ থেকে ৬০ লাখ টাকার বিনিময়ে এসব বদলি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

অতীতে এত অল্প সময়ে এত বিপুলসংখ্যক বদলির ঘটনা ঘটেনি।

বদলির নীতিমালা অনুযায়ী ‘এ’, ‘বি’ ও ‘সি’ গ্রেড অফিসে একই গ্রেডের কর্মকর্তাদের পদায়নের বিধান থাকলেও গত আট মাসে তা মানা হয়নি।

By barta24

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *