‘বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তর টিনের চশমা দিয়ে ঘুমাচ্ছে, উপজেলা প্রশাসন অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু নিলামে দিয়ে বৈধতা দিতে ব্যস্ত’
বেলাল আহমদ, লামা (বান্দরবান): বান্দরবানের লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার সীমান্তবর্তী এলাকায় অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে। বালুখেকো চক্রের বেপরোয়া তৎপরতায় জনজীবন ও প্রাকৃতিক পরিবেশ বিপর্যয়ের মুখে পড়েছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। পাহাড় ও ছড়াবেষ্টিত এ অঞ্চলের নদী-নালার স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হচ্ছে। ড্রেজার ও সেলো মেশিনের মাধ্যমে ছড়ার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলনের কারণে পরিবেশের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ছে বলে দাবি স্থানীয়দের।
স্থানীয়দের অভিযোগ, প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তা ও পরিবেশ অধিদপ্তরের উদাসীনতার সুযোগে প্রভাবশালী একটি সিন্ডিকেট লাইল্যারমার পাড়া স্কুলের মতো স্পর্শকাতর এলাকার দুপাশে একাধিক শ্যালো মেশিন বসিয়ে অবৈধভাবে বালু উত্তোলন অব্যাহত রেখেছে। এতে কৃষিজমি, রাস্তাঘাট, নদীর পাড়, সেতু ও কালভার্ট ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে গিয়ে স্থানীয়দের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, লাইল্যারমার পাড়া স্কুলের দুই পাশে খুটাখালী ছড়া থেকে প্রায় নয়টি শক্তিশালী সেলো ও ড্রেজার মেশিন বসানো হয়েছে। এসব মেশিনের মাধ্যমে দিন-রাত ছড়ার তলদেশ থেকে বালু উত্তোলন করা হচ্ছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। উত্তোলিত বালু দীর্ঘ পাইপলাইনের মাধ্যমে আশপাশের কৃষিজমি ও পাড়ে স্থানান্তর করা হচ্ছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, এ কর্মকাণ্ডের পেছনে কাগজিখোলা এলাকার মৃত মোজাম্মেল হকের ছেলে মুবিনুল হক ও আজিজুল হক এবং ১ নম্বর ওয়ার্ডের আবুল বশরের ছেলে রিয়াদসহ আরও কয়েকটি প্রভাবশালী গোষ্ঠী জড়িত। এ ছাড়া ফকিরাখোলা ও অংসাঝিরি এলাকায় ইজারা ছাড়াই অবৈধভাবে বালু উত্তোলনের অভিযোগ উঠেছে ইসমাইল, শাহজাহান, মুমিন, রাসেল, আবু, আরমান, হুমায়ুন, শুক্কুর, ধলা মিয়া ও সাইফুল মিস্ত্রীসহ কয়েকজনের বিরুদ্ধে। তবে এসব অভিযোগের স্বাধীনভাবে সত্যতা যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
স্থানীয়দের দাবি, অনিয়ন্ত্রিতভাবে ড্রেজার মেশিন দিয়ে ছড়ার তলদেশ থেকে অতিরিক্ত বালু উত্তোলনের ফলে ওই অঞ্চলের প্রাকৃতিক ভারসাম্য নষ্ট হচ্ছে। ছড়ার তলদেশ অতিরিক্ত গভীর হয়ে যাওয়ায় এবং দুই পাড়ের মাটি ধসে পড়ায় ছড়াতীরবর্তী কৃষিজমি ও বসতবাড়ি ঝুঁকিতে পড়েছে।
লাইল্যারমার পাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আশপাশে বালু উত্তোলনের মেশিন চলায় বিকট শব্দে শিক্ষার্থীদের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম ব্যাহত হচ্ছে বলেও অভিযোগ স্থানীয়দের। এ ছাড়া বালু ও কাদা আশপাশের ফসলি জমিতে জমা হয়ে মাটির উর্বরতা নষ্ট করছে। এতে কৃষকরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন বলে জানান তাঁরা।
অন্যদিকে, বালু বহনে ব্যবহৃত ভারী যানবাহন চলাচলের কারণে নির্মাণাধীন রাস্তা, গ্রামীণ সড়ক, কালভার্ট ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, লামা উপজেলা প্রশাসন অবৈধভাবে উত্তোলিত বালু জব্দ দেখিয়ে পরবর্তী সময়ে নিলামের মাধ্যমে বিক্রি করছে। তাঁদের দাবি, এভাবে নিলামে বিক্রি করার কারণে অবৈধভাবে বালু উত্তোলনকারীরা পরোক্ষভাবে উৎসাহিত হচ্ছেন। তবে নিলাম-সংক্রান্ত অভিযোগের বিষয়ে প্রশাসনের বক্তব্য জানা যায়নি।
স্থানীয়দের অভিযোগ, শুধু বাইশারী বা লাইল্যারমার পাড়া নয়, পুরো লামা উপজেলায় প্রায় দুই শতাধিক অবৈধ বালু উত্তোলন পয়েন্ট সক্রিয় রয়েছে।
এ পরিস্থিতিতে বাইশারী ও ফাঁসিয়াখালী ইউনিয়নের সাধারণ মানুষ ও সচেতন মহল খুটাখালী ছড়াসহ আশপাশের সব বালু উত্তোলন পয়েন্টে দ্রুত যৌথ অভিযান পরিচালনা, ড্রেজার ও সেলো মেশিন জব্দ এবং প্রচলিত আইন অনুযায়ী জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
তাঁরা বান্দরবান জেলা প্রশাসক, লামা ও নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলা প্রশাসন এবং পরিবেশ অধিদপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের দ্রুত হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন।
এ বিষয়ে বান্দরবান পরিবেশ অধিদপ্তরের উপপরিচালক নুরুল হাসান সজীবের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তিনি ফোন রিসিভ না করায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।

