বেলাল আহমদ, লামা (বান্দরবান): টানা কয়েক দিনের ভারী বর্ষণ ও পাহাড়ি ঢলে বান্দরবানের লামা উপজেলায় ভয়াবহ দুর্যোগপূর্ণ পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। একদিকে উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা প্লাবিত হয়ে লক্ষাধিক মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন, অন্যদিকে আজিজনগর ইউনিয়নে মর্মান্তিক পাহাড় ধসের ঘটনায় শিশুসহ একই পরিবারের ৩ জন এবং অন্য একটি পরিবারের ২ জনসহ মোট ৫ জনের মৃত্যু হয়েছে।
বেশ কয়েক দিন ধরে চলা টানা ভারী বর্ষণের কারণে আজিজনগর ইউনিয়নের ২ নম্বর ওয়ার্ডের মিশনপাড়া এলাকায় বৃহস্পতিবার (৯ জুলাই) গভীর রাতে ভয়াবহ পাহাড় ধসের ঘটনা ঘটে। পাহাড়ের একটি বিশাল অংশ ধসে নিচে থাকা একটি মাটির ঘরের ওপর পড়ে গেলে ঘরের বাসিন্দারা মাটিচাপা পড়েন।
সংবাদ পেয়ে দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছায় স্থানীয় বাসিন্দা, পুলিশ ও ফায়ার সার্ভিসের উদ্ধারকারী দল। তারা মাটিচাপা পড়া অবস্থায় একে একে ৫ জনের মরদেহ উদ্ধার করে।
নিহতরা হলেন— মিশনপাড়া এলাকার মৃত আদম আলীর ছেলে মো. ইউনুস (২৮), তাঁর স্ত্রী রানু আক্তার (২২), তাঁদের ৪ বছর বয়সী ছেলে মো. সোলেমান এবং একই এলাকার আলী হায়দারের ছেলে জুয়েল (৩৫) ও তাঁর স্ত্রী কুলছুমা আক্তার (২৫)। এ মর্মান্তিক ঘটনায় পুরো এলাকায় গভীর শোক ও আতঙ্ক নেমে এসেছে।
পাহাড় ধসের এই ট্র্যাজেডির পাশাপাশি পাহাড়ি ঢলের পানিতে লামা পৌরসভা, আজিজনগর, ফাঁসিয়াখালী, সরই, লামা সদর, ফাইতং ও রূপসীপাড়াসহ বিস্তীর্ণ এলাকার নিম্নাঞ্চল ভয়াবহ বন্যায় প্লাবিত হয়েছে। এছাড়া উপজেলার প্রায় ২০ থেকে ২৫টি স্থানে পাহাড় ধসের খবর পাওয়া গেছে।
হাজার হাজার বসতবাড়ি, দোকানপাট, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, স্থানীয় সড়ক এবং ফসলি জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে। অনেক পরিবারের ঘরে হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি ঢুকে পড়েছে। ঘরের মেঝে ছাড়িয়ে পানি ওঠায় মানুষ গবাদিপশু ও প্রয়োজনীয় আসবাবপত্র নিয়ে নিরাপদ আশ্রয়ের সন্ধানে ছুটছেন।
স্থানীয়রা জানান, গত কয়েক বছরের মধ্যে এমন ভয়াবহ ও আকস্মিক বন্যা তাঁরা দেখেননি। অনেক পরিবার ঘরে আটকা পড়ে খাদ্য, বিশুদ্ধ পানি ও প্রয়োজনীয় ওষুধের সংকটে পড়েছেন। বিশেষ করে শিশু, বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিদের নিয়ে চরম দুর্ভোগে রয়েছেন স্বজনরা। জলাবদ্ধতার কারণে ব্যবসা-বাণিজ্য ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা প্রায় অচল হয়ে পড়েছে। কর্মজীবী মানুষ কাজে যেতে পারছেন না। অনেক এলাকায় বিদ্যুৎ সংযোগ ও মোবাইল নেটওয়ার্কও বিচ্ছিন্ন রয়েছে।
ভয়াবহ এই দুর্যোগ মোকাবিলা এবং ক্ষতিগ্রস্তদের সহায়তায় বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের পক্ষ থেকে ইতোমধ্যে ৪০০ মেট্রিক টন চাল বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে।
লামা উপজেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সার্বিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ ও সমন্বয়ের জন্য একটি নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (কন্ট্রোল রুম) চালু করেছে। স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও প্রশাসনের কর্মকর্তারা ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলো পরিদর্শন করছেন।
তবে দুর্গত এলাকার মানুষের দাবি, পানিবন্দি মানুষের কাছে দ্রুত শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি ও জরুরি চিকিৎসাসেবা পৌঁছে দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে ভবিষ্যতে এ ধরনের দুর্ভোগ এড়াতে দীর্ঘমেয়াদে নদী-খাল পুনঃখনন এবং কার্যকর পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থার উদ্যোগ নেওয়ার জোর দাবি জানিয়েছেন স্থানীয়রা।
আবহাওয়া অফিস সূত্রে জানা গেছে, বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকলে বন্যা পরিস্থিতির আরও অবনতি হতে পারে। ফলে ঝুঁকিপূর্ণ পাহাড়ের পাদদেশে বসবাসকারী পরিবারগুলোকে দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরে যেতে প্রশাসন ও স্থানীয়দের পক্ষ থেকে মাইকিং করে সতর্ক করা হচ্ছে। লামাজুড়ে এখন কেবলই আতঙ্ক, উৎকণ্ঠা ও দুর্ভোগের চিত্র।
লামা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. মঈন উদ্দিন বলেন, পাহাড় ধসে প্রাণহানির ঘটনা এড়াতে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। উপজেলা প্রশাসন এ বিষয়ে তাৎক্ষণিক ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকাগুলো আগে থেকেই চিহ্নিত করা হয়েছে। সেখানে অবস্থানরত মানুষকে আশ্রয়কেন্দ্রে সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা করা হচ্ছে এবং এলাকায় এলাকায় মাইকিং করে সচেতনতা বৃদ্ধি করা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, “পরিস্থিতি মোকাবিলায় উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে ৮টি স্কুল ও মাদ্রাসাকে আশ্রয়কেন্দ্র হিসেবে প্রস্তুত করা হয়েছে। সেখানে আশ্রয় নেওয়া মানুষের জন্য পর্যাপ্ত খাবারের ব্যবস্থা রয়েছে। প্রশাসনের এই নির্দেশনা অমান্য করে যারা বৃষ্টির মধ্যে বিপজ্জনক পাহাড়ের নিচে অবস্থান করবে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”

